চীনের লোককথা অত্যন্ত সমৃদ্ধ এবং রসবোধ ও বুদ্ধিমত্তায় পরিপূর্ণ। চৈনিক লোকসাহিত্য থেকে এখানে তিনটি জনপ্রিয় মজার ও নীতিশিক্ষার গল্প পরিবেশিত হল।

তোমাদের কি কখনো মনে হয়েছে, দূর দূরান্তের দেশগুলোর মানুষ হাজার বছর আগে ঠিক কোন বিষয়গুলো নিয়ে হাসাহাসি করত? আজ আমরা সাহিত্য সফরের ঝুলি নিয়ে পাড়ি দেবো প্রাচ্যের প্রাচীন দেশ চীনে। চীনের লোককথা ও গল্পের ভাণ্ডার কিন্তু বেশ সমৃদ্ধ—সেখানে বুদ্ধিমত্তা, রসবোধ আর জীবনের বড় বড় শিক্ষা মিশে থাকে এক দারুণ স্বাদে।
আজকের এই ব্লগে আমি তোমাদের জন্য চয়ন করেছি চীনের তিনটি বিখ্যাত মজার লোককথা। গল্পগুলো কেবল তোমাদের বিনোদনই দেবে না, বরং মানুষের স্বভাবজাত ভুলভুলানি আর চালাকির এক চমত্কার ঝিলিক তুলে ধরবে। চলো, দেরি না করে সরাসরি ঢোকা যাক গল্পের মায়াবী জগতে!
১. কান ঢেকে ঘণ্টা চুরি: এক বুদ্ধিমান চোরের গল্প

কান ঢেকে ঘণ্টা চুরি:- প্রাচীন চীনের জিন রাজত্বের এক শান্ত গাঁয়ের গল্প। গ্রামটিতে এক প্রভাবশালী ধনাঢ্য ব্যক্তি থাকতেন। তিনি সম্প্রতি মারা যান, আর তাঁর বিশালাকার বাড়িটিতে পাহারা দেওয়ার মতো কেউ রইল না। গ্রামের অন্য প্রান্তেই থাকত এক চোর, নাম তার ‘ফ্যান’। ফ্যান বহু দিন ধরে ওত পেতে ছিল কখন সেই বাড়িতে একটু ঢোকা যায়।
একদিন সুযোগ বুঝে অন্ধকারে ফ্যান নিঃশব্দে সেই ধনীর উঠোনে গিয়ে ঢুকল। উদ্দেশ্য—যে কোনো দামি জিনিস যা হাত পড়ে, তা হাতানো। উঠোনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এক বিরাট ব্রোঞ্জের ঘণ্টা দেখে ফ্যানের চক্ষু চড়কগাছ! এত সুন্দর কাজ করা ব্রোঞ্জের ঘণ্টা সে জীবনে দেখেনি। এটি বাজারে বেচতে পারলে সারা জীবনের রুজি-রুটির চিন্তা শেষ।
ফ্যান তখনই ঠিক করল—এই ঘণ্টাই সে চুরি করবে। কিন্তু সমস্যা দাঁড়িয়ে গেল ঘণ্টার বিশালাকার ওজন নিয়ে। ফ্যান ঘণ্টার এক পাশ ধরে নামানোর জন্য হেঁচকা টান দিল, কিন্তু ঘণ্টা নড়লও না। ফ্যান গায়ের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে ঠেলা দিল—ব্যর্থ। ঘণ্টা তার জায়গায় পাহাড়ের মতো অটল।
অগত্যা ফ্যান চিন্তা করল, “আস্ত ঘণ্টা যখন বওয়া সম্ভব নয়, তখন এটাকে টুকরো টুকরো করে ভেঙেই নিয়ে যাই।”
বাড়ির এক কোণ থেকে ফ্যান খুঁজে আনল এক বিশাল বড় হাতুড়ি। হাতুড়ি উঁচিয়ে সে যেই না ঘণ্টার গায়ে সজোরে এক-ঘা দিল —“ঢংংংংং!”
সেই শব্দ যেন এক প্রচণ্ড বজ্রপাত! শান্ত নিঃশব্দ রাতে ঘণ্টার সেই গমগমে আওয়াজ পুরো গ্রামে ছড়িয়ে পড়ল। ফ্যান ভয়ে চার হাত লাফিয়ে উঠল। সে হাতুড়ি ফেলে দুই কান চেপে ধরে পিলপিল করে কাঁপতে লাগল। সে ভাবল, “মাগো! এত জোরে শব্দ হলে তো সারা গ্রামের মানুষ জেগে যাবে! পুলিশ আর দারোয়ানরা ছুটে এসে আমায় তো জ্যান্ত পুঁতে ফেলবে!”
খানিকক্ষণ পর যখন ঘণ্টার প্রতিধ্বনি মিলিয়ে গেল, ফ্যান ভয়ে ভয়ে কান থেকে হাত সরাল। চারপাশ আবার নিঝুম। ফ্যান গভীর শ্বাস নিল। সে একটু গম্ভীর হয়ে চিন্তা করতে বসল।
“হুমমম… সমস্যাটা কোথায়?” ফ্যান নিজের দাড়ি চুলকাতে চুলকাতে ভাবল। “সমস্যাটা হলো ঘণ্টার শব্দে। হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করলেই কানফাটা শব্দ বের হচ্ছে, আর সেই শব্দ শুনে লোকজন চলে আসবে। তার মানে, শব্দটাই আসল শত্রু!”
এরপরই ফ্যানের মাথায় এক মহাজাগতিক ও অলৌকিক ‘বুদ্ধি’ খেলে গেল। সে হাততালি দিয়ে বলে উঠল, “আরে! আমি কত বড় গাধা! শব্দ শুনতে পাই বলেই তো ভয় পাই। যদি শব্দটাই শোনা না যায়, তবে তো ভয়েরও কিছু নেই!”
সে পকেট থেকে দুটো তুলোর দলা বের করল। তারপর খুব কায়দা করে তুলো দুটো নিজের দুই কানের ভেতরে শক্ত করে গুঁজে দিল। কান দুটো পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সে সন্তুষ্ট হয়ে হাসল। এবার তার কানে আর বাইরের কোনো আওয়াজ আসছে না। সম্পূর্ণ নীরবতা!
ফ্যান বেশ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আবার হাতুড়িটা উঁচিয়ে ধরল। পুরো শক্তিতে ঘণ্টার গায়ে মারল—“ঢংংংংংংংং!”
যেহেতু ফ্যানের কান বন্ধ ছিল, সে নিজের কানে কোনো শব্দ শুনতে পেল না। সে মৃদু হেসে মনে মনে ভাবল, “আহা! কী চমৎকার বুদ্ধি আমার! এবার একটুও শব্দ হচ্ছে না! কান বন্ধ করাতেই পুরো ব্যাপারটা কেমন অলৌকিকভাবে শান্ত হয়ে গেল!”
সে পরম আনন্দে একের পর এক হাতুড়ি চালিয়ে যেতে লাগল—”ঢং! ঢং! ঢং!”
এদিকে পুরো গ্রামের মানুষ সেই বিকট শব্দে ঘুম থেকে উঠে পড়েছে। তারা লাঠিসোটা নিয়ে দৌড়ে এল সেই ধনীর বাড়ির দিকে। এসে তারা দেখে, এক লোক কানের মধ্যে তুলো গুঁজে পরম শান্তিতে এক মনে হাতুড়ি দিয়ে ঘণ্টা পিটিয়ে চলেছে! লোকগুলোর উপস্থিতি ফ্যান ঘুণাক্ষরেও টের পেল না, কারণ সে তো নিজের তৈরি ‘নীরব জগতে’ বাস করছিল।
গ্রামের চৌকিদার পেছনে গিয়ে ফ্যানের কাঁধে একটা আলতো চাপ দিল। ফ্যান কান থেকে তুলোটা বের করে পেছনে ফিরে তাকাল। সামনে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছে জনা তিরিশেক ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী।
ফ্যান অবাক হয়ে বলল, “তোমরা সবাই জেনে গেলে কী করে? আমি তো এক ফোঁটা শব্দও হতে দিইনি!”
গ্রামের চৌকিদার মাথা চেপে ধরে বলল, “ওরে বুদ্ধিমান চোর, তুই কান ঢেকেছিলি বলে তুই শুনতে পাচ্ছিলি না, কিন্তু সারা দেশ তো ঠিকই শুনছিল!”
এই বলে গ্রামবাসী তাকে বেঁধে থানায় নিয়ে গেল। সেই থেকে চীনে এই প্রবাদটি তৈরি হয়—’কান ঢেকে ঘণ্টা চুরি’ (Chǎnɡ bèi ěr tōu zhōnɡ)—যার অর্থ হলো নিজেকে প্রবোদ্ধ দিয়ে বা সত্যকে উপেক্ষা করে মনে করা যে বিশ্ববাসীও বোকা হয়ে গেছে।
আরও পড়ুন :- শিয়েং মিয়েং লাওসের বুদ্ধিমান Trickster-এর গল্প
২. পণ্ডিতের জুতো কেনা: চীনের লোককথা

আমাদের পরবর্তী গল্প পণ্ডিতের জুতো কেনা:- এক পরম জ্ঞানী কিন্তু বেজায় অদ্ভুত স্বভাবের মানুষকে নিয়ে। প্রাচীন চীনের জেং (Zheng) রাজ্যের এক ছোট শহরে বাস করতেন এক পণ্ডিত। নাম তাঁর মিং-সু। মিং-সু দিনরাত বইপত্র পড়তেন, দর্শনচর্চা করতেন এবং জগতের সমস্ত নিয়মকানুন খাতায় লিখে রাখতেন। তবে তাঁর একটা বড় সমস্যা ছিল—তিনি দৈনন্দিন জীবনকেও বইয়ের গাণিতিক নিয়মে চালাতে গিয়ে গোলমাল পাকিয়ে ফেলতেন।
এক দিন সকালে উঠে মিং-সু দেখলেন, তাঁর একমাত্র জুতো জোড়া একেবারে ছিঁড়ে গেছে। তালি দেওয়ারও আর জো নেই। অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলেন, আজ বাজারে গিয়ে নতুন একজোড়া চামড়ার জুতো কিনে আনবেন।
কিন্তু পণ্ডিত মানুষ তো, কোনো কাজ কি সাধারণ মানুষের মতো অত সোজাভাবে করা যায়? মিং-সু একটি দীর্ঘ ঘাস ছিঁড়ে আনলেন। তারপর নিজের পায়ের মাপ নিলেন পরম যত্নে। গোড়ালি থেকে বুড়ো আঙুল পর্যন্ত ঘাসের ফিতা মেপে খাতায় লিখলেন: “দৈর্ঘ্য: নয় ইঞ্চি দুই সূতা।” এরপর সেই মাপা ঘাসের টুকরোটি তিনি নিজের একটি কাগজে সাবধানে পেঁচিয়ে পকেটে পুরে নিলেন।
তিনি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাজার অভিমুখে রওনা দিলেন। হাটে গিয়ে জুতো বিক্রির এক বড় দোকানে প্রবেশ করলেন। দোকানদার বেশ খাতির করে তাঁকে রেশমি ও চামড়ার বিভিন্ন জুতো দেখাতে লাগল।
অনেক জুতোর মধ্যে থেকে একটা চমৎকার কালো রঙের জুতো মিং-সু-এর বেশ পছন্দ হয়ে গেল। চামড়াটি নরম, সেলাইগুলো বেশ নিখুঁত।
দোকানদার হেসে বলল, “মহাশয়, এই জুতোটি আপনার পায়ে একেবারে খাপ খেয়ে যাবে। আপনি দয়া করে একটু পায়ে দিয়ে পরীক্ষা করে দেখুন।”
মিং-সু পকেটে হাত দিলেন। কিন্তু এ কী! পকেট তো খালি! তাড়াহুড়ো করে বের হতে গিয়ে সেই যে জুতোর মাপ লেখা কাগজ আর ঘাসের ফিতাটি পড়ার ঘরের টেবিলে ফেলে এসেছিলেন, তা তো আর সঙ্গে আনা হয়নি!
পণ্ডিত মিং-সু সাথে সাথে জুতোর জোড়াটি টেবিলে নামিয়ে রেখে গম্ভীর মুখে বললেন, “আহা! মহা অনর্থ ঘটেছে! আমি তো জুতোর মাপের মানপত্রটি বাড়িতে ফেলে এসেছি। মাপ ছাড়া জুতো কেনা কোনোভাবেই শাস্ত্রসম্মত বা যুক্তিযুক্ত নয়।”
দোকানদার তো অবাক! সে হাঁ করে তাকিয়ে থেকে বলল, “মহাশয়, কাগজ-পত্রের কী দরকার? আপনার পা তো আপনার সাথেই আছে! আপনি জুতোটা পায়ে গলিয়ে দেখলেই তো বোঝা যায় মাপে হচ্ছে কি না!”
মিং-সু রেগে গিয়ে ভ্রূ কুঁচকে বললেন, “অর্বাচীন দোকানদার! তুমি জুতোর মাপের বিজ্ঞান বোঝো না। চোখের দেখা আর অনুমানের ওপর বিশ্বাস করা মূর্খতা। মানুষের পা কখনো ফোলে, কখনো কম থাকে। কিন্তু কাগজে লেখা জ্যামিতিক মাপ হলো পরম সত্য। আমি নিজের চোখের চেয়ে আমার লিখিত সূত্রের ওপর বেশি বিশ্বাস করি।”
দোকানদার অনেক বোঝানোর চেষ্টা করল, “পণ্ডিত মশাই, জুতো তো পরা হয় পায়ে, কাগজে নয়! এক বার পায়ে দিয়ে দেখুন না!”
কিন্তু মিং-সু নাছোড়বান্দা। তিনি দোকানদারের কোনো যুক্তিই শুনলেন না। তিনি হন্তদন্ত হয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে দ্রুত বাড়ির দিকে ছুটলেন জুতোর সেই মাপের কাগজটি আনতে।
বাড়ি পৌঁছাতে পৌঁছাতে দুপুর গড়িয়ে গেল। নিজের বইয়ের ঘর ঘেঁটে অবশেষে সেই ঘাসের ফিতা ও মাপের কাগজটি উদ্ধার করলেন মিং-সু। পরম আনন্দে সেটি পকেটে নিয়ে তিনি আবার বাজারের দিকে দৌড়ালেন।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বাজারে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য ডুবে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বিক্রেতারা সব দোকানপাট গুটিয়ে যে যার মতো বাড়ি চলে গেছে। সেই জুতোর দোকানটিও বন্ধ হয়ে গেছে, চারপাশ নিঝুম।
মিং-সু বন্ধ দোকানের সামনে হতাশ হয়ে হাত গুটিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। পায়ের ছেঁড়া জুতো থেকে বুড়ো আঙুলটি যেন তাঁকে ভেংচি কাটছিল।
এমন সময় পাশের এক দোকানদার থলি গুছিয়ে বাড়ি ফিরছিল। পণ্ডিতকে এমন বিষণ্ণ মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বলল, “কী পণ্ডিত মশাই? জুতো কেনা হলো না?”
মিং-সু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “না হে ভাই। সকালে মাপের কাগজটি বাড়িতে ফেলে এসেছিলাম। বিকেলে যখন কাগজটি নিয়ে এলাম, তখন দেখি দোকান বন্ধ হয়ে গেছে।”
লোকটি অবাক হয়ে বলল, “কিন্তু আপনার পা তো সকাল থেকেই আপনার সাথেই ছিল! নিজের পায়ে না দিয়ে কাগজের মাপের জন্য কেন জুতো কিনতে পারলেন না?”
মিং-সু বেশ দেমাগ নিয়ে উত্তর দিলেন, “তোমরা সাধারণ মানুষ বুঝবে না। আমি পা-কে বিশ্বাস করতে পারি, কিন্তু কাগজের মাপ হলো লিখিত লিখিত প্রমাণ। প্রমাণের চেয়ে শরীরের ওপর ভরসা করা কোনো বুদ্ধিমানের কাজ হতে পারে না!”
লোকটি কপালে হাত দিয়ে হেসে উঠল এবং হেঁটে চলে গেল। আর আমাদের মহাপণ্ডিত মিং-সু সেই কনকনে ঠাণ্ডায় নগ্ন পায়ে হেঁটে হেঁটে বাড়ি ফিরলেন— এভাবেই পণ্ডিতের জুতো কেনা সম্পন্ন হল!
আরও পড়ুন :- হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি, সুকুমার রায়ের ব্যঙ্গাত্মক ও কল্পবিজ্ঞান রচনা
৩. দম্পতির পিঠা ভাগ: বোবা হয়ে থাকার প্রতিযোগিতা

আমাদের শেষ গল্পটি ‘দম্পতির পিঠা ভাগ‘ প্রাচীন চীনের এক একঘেয়ে অথচ হাসিখুশি দম্পতিকে নিয়ে। স্বামীর নাম ছিল ‘চাও’ আর স্ত্রীর নাম ‘মেই’। তারা দুজনেই ছিল বেশ আলসে এবং প্রচণ্ড একগুঁয়ে। কেউ কারো কাছে এক চুল নতি স্বীকার করতে চাইত না।
একদিন শীতের সন্ধ্যায় চাও ও মেই রান্নাঘরে বসে গম ও চালের গুঁড়ো দিয়ে বিশেষ এক ধরনের সুস্বাদু গরম গরম পিঠা তৈরি করল। সেই পিঠা দিয়ে এত সুন্দর সুবাস বের হচ্ছিল যে দুজনেরই জিভে জল এসে গেল। কিন্তু একটা বড় গোলমাল দেখা দিল।
সবগুলো পিঠা সমানভাগে ভাগ করার পর থালায় তিনটি পিঠা উদ্বৃত্ত রয়ে গেল।
চাও বলল, “দেখো মেই, আমি সারা দিন মাঠে কাজ করেছি। তাই দুই নম্বর পিঠাটা পাওয়ার পর শেষ তিনটা পিঠার মধ্যে দুটো আমার পাওয়া উচিত, আর একটা তোমার।”
মেই হাত নাচিয়ে বলে উঠল, “কখনোই নয়! আমি কাঠের আগুনে এই হাড়কাঁপানো শীতে ঘাম ঝরিয়ে পিঠা ভেজেছি। দুটো পিঠা আমি খাব, তুমি পাবে একটা!”
চাও আর মেই-এর মধ্যে তর্ক শুরু হয়ে গেল। এক ঘণ্টা পার হয়ে গেল, কিন্তু সমাধান এল না। পিঠাগুলোও আস্তে আস্তে ঠান্ডা হয়ে শক্ত হতে লাগল।
অবশেষে চাও এক অভূতপূর্ব প্রস্তাব দিল। সে বলল, “দেখা যাচ্ছে তর্কে এর কোনো ফয়সালা হবে না। তার চেয়ে এসো, আমরা একটা খেলা খেলি।”
মেই চোখ ছোট ছোট করে বলল, “কীসের খেলা?”
চাও বলল, “আমরা এখন থেকে দুজনেই একদম চুপ হয়ে যাব। কেউ একটা শব্দও করব না, কোনো কথা বলব না। যে আগে কথা বলবে, সে পাবে মাত্র একটা পিঠা! আর যে শেষ পর্যন্ত চুপ থাকতে পারবে, সে অতিরিক্ত দুটো পিঠাই একাই খাবে!”
মেই রাজি হয়ে গেল। সে ভাবল, “কথা না বলে থাকা আর এমন কী কঠিন! দুটো লোভনীয় পিঠার জন্য আমি সারা রাত চুপ থাকতে পারি।”
চুক্তি হয়ে গেল। দুজন পাশাপাশি বসে রইল। চারপাশ নিঝুম। ঘরজুড়ে শুধু ঘড়ির টিকটিক আওয়াজ।
এক ঘণ্টা গেল, দুই ঘণ্টা গেল। চাও মেই-এর দিকে তাকায়, মেই চাও-এর দিকে তাকায়। দুজনেরই পেটে ছুঁচো ডলছে, অথচ কেউ মুখ খুলছে না। মুখ খুললেই তো দুটো পিঠা হাতছাড়া!
রাত তখন প্রায় দুপুর। হঠাৎ তাদের বাড়ির বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। এক সিধেল চোর সন্তর্পণে তাদের ঘরের দরজায় টোকা দিয়ে দেখল দরজার খিল খোলাই আছে। চোরটি চোরের মতো পা ফেলে ঘরে প্রবেশ করল।
চোর তো ঘরে ঢুকে তাজ্জব! দেখে, ঘরের মাঝখানে মোমবাতির ঝাপসা আলোয় দুজন মানুষ কাঠের পুতুলের মতো মুখোমুখি বসে আছে। তাদের চোখ খোলা, কিন্তু কোনো সাড়াশব্দ নেই।
চোর প্রথমে একটু ভয় পেল। সে তাদের চোখের সামনে হাত নেড়ে দেখল—কেউ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে না, পলকও ফেলছে না। চোর বুঝতে পারল এরা হয়তো কোনো অদ্ভুত কারণে কথা বলছে না বা বলতে পারছে না।
চোর তখন নিজের কাজ শুরু করল। সে ঘরের কোণে থাকা দামি পিতলের বাসনপত্র থলিতে ভরতে লাগল।
চাও মনে মনে ফুটছিল। সে চোখ বড় বড় করে স্ত্রীর দিকে তাকাতে লাগল, যার অর্থ: “আরে বোকা মেয়ে, দ্যাখো! চোর সব চুরি করে নিয়ে যাচ্ছে! কিছু একটা বলো!”
মেই-ও চোখের ইশারায় জবাব দিল, “আমি কেন বলব? তুমি আগে বলো! বললেই তুমি হেরে যাবে আর দুটো পিঠা আমার হবে!”
দুই একগুঁয়ে দম্পতি নিঃশব্দে চোখের কোণ দিয়ে চোরের কাণ্ড কারখানা দেখতে লাগল, কিন্তু কেউ টু শব্দটিও করল না।
চোর উৎসাহ পেয়ে গেল। সে ঘরের আলমারি খুলে মেই-এর সোনার গয়না আর জমানো সব টাকা-পয়সা বের করে ফেলল। তবুও চাও আর মেই কাঠ হয়ে বসে রইল। চোর এবার ভাবল, “এ তো বেশ মজার ব্যাপার! এরা কি সত্যিই জ্যান্ত?”
লোভ বেড়ে যাওয়ায় চোর এবার মেই-এর গায়ের রেশমি চাদরটি ধরে টান দিল।
এবার আর সহ্য করতে পারল না চাও। মেই-এর গায়ে হাত দিতেই চাও লাফিয়ে উঠে টেবিল চাপড়ে চেঁচিয়ে উঠল, “রে অসভ্য চোর! তোর এত বড় সাহস! আমার সামনেই আমার স্ত্রীর গায়ে হাত দিস, আর ঘরের সব জিনিস চুরি করিস!”
চাও কথা বলা মাত্রই মেই আনন্দে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠল। সে চোরের দিকে খেয়ালই করল না! মেই চিৎকার করে বলে উঠল, “হা হা হা! চাও! তুমি হেরে গেছ! তুমি আগে কথা বলেছ! এবার শেষ দুটো পিঠাই আমার! আমি জিতে গেছি!”
চোর তো পুরো দৃশ্য দেখে আকাশ থেকে পড়ল! সে ভাবল, এরা নিশ্চয়ই পাগলদের রাজত্ব থেকে এসেছে!
চোর কালবিলম্ব না করে সোনা-দানা আর বাসনের থলিটা নিয়ে এক লাফে ঘর থেকে বেরিয়ে অন্ধকারে চম্পট দিল।
আর ঘরে পড়ে রইল চাও ও মেই। পুরো ঘরের সর্বস্ব চুরি হয়ে গেছে, কিন্তু মেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে সেই দুটি ঠান্ডা হয়ে যাওয়া পিঠা একা একা চিবোচ্ছে। এভাবেই শেষ হল এই দম্পতির পিঠা ভাগ আর বেচারা চাও মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে!
শেষ কথা
এই তিনটি গল্প আমাদের হাসায় ঠিকই, কিন্তু আড়ালে একটা চমৎকার কথা মনে করিয়ে দেয়। কখনো কখনো আমরা নিজেদের অতি চালাক মনে করে এমন কিছু মূর্খামি করি, যা বাইরের মানুষের কাছে হাসির খোরাক হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যানের মতো কান ঢেকে কাজ করা, মিং-সু পণ্ডিতের মতো বাস্তবকে ছেড়ে পুঁথিকে আঁকড়ে থাকা, কিংবা চাও-মেই দম্পতির মতো অহংকারের খাতিরে আসল মূল্যবান জিনিস হারিয়ে ফেলা—এ সবই আমাদের বাস্তব জীবনেরই ছোট ছোট শিক্ষা।
আশা করি বিশ্বসাহিত্যের এই চীনের লোককথার সফর তোমাদের ভালো লেগেছে। ভবিষ্যতে অন্য কোনো দেশের রূপকথা বা রসালো গল্প নিয়ে আবার হাজির হব তোমাদের এই প্রিয় ব্লগে।
তোমাদের সবচেয়ে মজার লোককথা কোনটি লাগল, কমেন্ট করে জানাতে ভুলো না কিন্তু!


