Xieng Mieng লাওসের লোককথার জনপ্রিয় trickster -এর মজার গল্প, রাজাকে বুদ্ধিতে হারানোর কৌশল, শব্দের খেলা এবং আজকের প্রজন্মের জন্য তাঁর গল্পের শিক্ষা।

হাসি, বুদ্ধি আর শব্দের খেলায় রাজাকেও হার মানাতেন যে লোকনায়ক
Xieng Mieng কে? লাওসের লোককথায় Xieng Mieng বা শিয়েং মিয়েং একজন জনপ্রিয় trickster চরিত্র—যিনি শক্তি, সম্পদ বা রাজকীয় ক্ষমতার বদলে উপস্থিত বুদ্ধি, শব্দের খেলা, কৌশল এবং রসবোধ ব্যবহার করে কঠিন পরিস্থিতি সামলান। তাঁর গল্পে রাজা, সন্ন্যাসী, ধনী ব্যক্তি ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে নানা মজার সংঘাত দেখা যায়।
বাংলা লোককথার গোপাল ভাঁড়, দক্ষিণ ভারতের টেনালি রামন, উত্তর ভারতের বীরবল কিংবা মোল্লা নাসিরুদ্দিনের গল্পের মতো Xieng Mieng-এর কাহিনিগুলিও শুধু হাসানোর জন্য নয়। এগুলির মধ্যে রয়েছে সমাজ, ক্ষমতা, বুদ্ধি, ভাষা এবং মানুষের স্বভাব নিয়ে সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ।
আজকের প্রজন্মের কাছে তাই লাওসের এই লোকনায়ককে পরিচয় করিয়ে দেওয়া মানে শুধু একটি বিদেশি গল্প বলা নয়। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন সংস্কৃতিতে মানুষের কল্পনা ও হাস্যরসের আশ্চর্য মিলগুলি আবিষ্কার করা।
এক নজরে: Xieng Mieng সম্পর্কে
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| চরিত্র | Xieng Mieng / শিয়েং মিয়েং |
| দেশ | লাওস |
| সাহিত্যিক ধরন | লোককথা |
| চরিত্রের ধরন | Trickster / কৌশলী লোকনায়ক |
| প্রধান অস্ত্র | বুদ্ধি, ভাষা, রসবোধ ও উপস্থিত বুদ্ধি |
| গল্পের গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র | রাজা, সন্ন্যাসী, ব্যবসায়ী, সাধারণ মানুষ |
| প্রধান বৈশিষ্ট্য | ক্ষমতাবানকে বুদ্ধির খেলায় হারানো |
| গল্পের মূল আকর্ষণ | হাস্যরস, শব্দের খেলা ও অপ্রত্যাশিত পরিণতি |
Xieng Mieng-এর কাহিনির একাধিক সংস্করণ রয়েছে। মৌখিক লোকসাহিত্যের স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী গল্প বলার মানুষ, অঞ্চল ও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাহিনির বিবরণেও পরিবর্তন ঘটেছে। তাই তাঁর কোনও একটি গল্পকে একমাত্র “মূল সংস্করণ” হিসেবে দেখার পরিবর্তে এগুলিকে একটি বৃহত্তর লোককথা-পরম্পরার অংশ হিসেবে দেখা বেশি যুক্তিযুক্ত।
Trickster চরিত্র আসলে কী?
“Trickster” শব্দটির সরাসরি বাংলা প্রতিশব্দ খুঁজে পাওয়া কঠিন।
তাঁকে শুধু “ধূর্ত” বললে তাঁর বুদ্ধিমত্তা ও হাস্যরসের দিকটি হারিয়ে যায়। আবার শুধু “বুদ্ধিমান” বললেও তাঁর দুষ্টুমি এবং নিয়ম ভাঙার প্রবণতা বোঝা যায় না। লোকসাহিত্যের trickster সাধারণত এমন চরিত্র, যিনি প্রচলিত ক্ষমতার কাঠামোর বাইরে দাঁড়িয়ে নিজের বুদ্ধি দিয়ে পরিস্থিতি বদলে দেন।
তিনি সবসময় নৈতিক আদর্শ নায়ক নন। কখনও তিনি ধোঁকা দেন, কখনও নিয়মকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করেন, কখনও প্রতিপক্ষের কথাকেই তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করেন।
Xieng Mieng-এর মধ্যেও এই বৈশিষ্ট্যগুলি দেখা যায়। স্পষ্টভাবেই trickster চরিত্র হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁর কাহিনিতে রাজা ও ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের বুদ্ধির সংঘাত একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
আরও পড়ুন :- হাল ছেড়ে দাও বন্ধু! – সত্যই কি? আগে গল্পটি পড়ে দেখতে হবে
শিয়েং মিয়েং-এর গল্প কেন এত মজার?
তাঁর গল্পের হাসি সাধারণত তিনটি জায়গা থেকে আসে।
১. কথার আক্ষরিক অর্থ
একজন একটি কথা বললেন একটি অর্থে। শিয়েং মিয়েং সেটির অন্য অর্থ ধরলেন। তারপর সেই “ভুল বোঝা”-কেই নিজের অস্ত্র বানালেন।
২. মানুষের কৌতূহল
কেউ রহস্যময় কিছু বললে আমরা স্বাভাবিকভাবেই তার অর্থ জানতে চাই। শিয়েং মিয়েং মানুষের এই স্বাভাবিক কৌতূহলকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগান।
৩. ক্ষমতাবান মানুষের আত্মবিশ্বাস
রাজা বা ধনী ব্যক্তি মনে করেন, তাঁর ক্ষমতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে। শিয়েং মিয়েং সেই আত্মবিশ্বাসের জায়গাতেই আঘাত করেন। তাঁর অস্ত্র কোনও তলোয়ার নয়। একটি বাক্যই যথেষ্ট।
গল্প ১: রাজাকে অনুসরণ করার কৌশল
Xieng Mieng-এর পরিচিত কাহিনিগুলির মধ্যে একটি হল রাজাকে অনুসরণ করার গল্প।
রাজা শিয়েং মিয়েংকে এমন একটি নির্দেশ দেন যার সারকথা—রাজা যা করবেন, শিয়েং মিয়েংকেও তাই করতে হবে। শুনতে খুব সহজ। কিন্তু শিয়েং মিয়েং বুঝলেন, এই নির্দেশের মধ্যেই বিপদের সম্ভাবনা রয়েছে।
রাজা এগোলেন। শিয়েং মিয়েংও এগোলেন। রাজা যা করলেন, শিয়েং মিয়েংও তা-ই করলেন। রাজা হয়তো ভেবেছিলেন, তিনি একজন সাধারণ মানুষকে নিজের নির্দেশের অধীন করে ফেলেছেন।
কিন্তু আসলে উল্টোটা ঘটল। শিয়েং মিয়েং নিজের কোনও নতুন নিয়ম তৈরি করেননি। তিনি শুধু রাজার নির্দেশকে এতটাই আক্ষরিকভাবে পালন করলেন যে শেষ পর্যন্ত রাজাই নিজের নির্দেশের ফাঁদে পড়লেন।
গল্পটির হাস্যরস এখানেই। কেউ যখন বলে, “আমি যা করব, তুমিও তা করবে”—তখন কথাটি শুনতে যতটা সরল, বাস্তবে ততটা নয়। শিয়েং মিয়েং সেই ফাঁকটি দেখতে পান।
আজকের দিনের শিক্ষা
কোনও নির্দেশ পেলেই সেটি যান্ত্রিকভাবে অনুসরণ করার আগে তার অর্থ বোঝা দরকার। আজকের পৃথিবীতে এই শিক্ষা আরও গুরুত্বপূর্ণ।
কোনও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, ই-মেইল, বিজ্ঞাপন কিংবা AI-generated তথ্য দেখেই বিশ্বাস না করে প্রশ্ন করা দরকার— “এখানে আসলে কী বলা হচ্ছে?”
গল্প ২: “দুই চাঁদ”-এর অদ্ভুত হিসাব
শিয়েং মিয়েং-এর গল্পে শব্দের খেলার একটি সুন্দর উদাহরণ হল “দুই চাঁদ”-এর কাহিনি।
এক ব্যক্তি শিয়েং মিয়েং-এর কাছে টাকা ধার দিলেন। শিয়েং মিয়েং প্রতিশ্রুতি দিলেন— “দুই চাঁদের মধ্যে টাকা ফেরত দেব।”
ঋণদাতা বুঝলেন—দুই মাসের মধ্যে টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। কিন্তু দুই মাস পরে যখন তিনি টাকা চাইতে এলেন, শিয়েং মিয়েং আকাশের দিকে তাকালেন। “কোথায় দুই চাঁদ?”
ঋণদাতা অবাক। “দুই মাস তো হয়ে গেছে!”
শিয়েং মিয়েং বললেন, “আমি তো দুই চাঁদের কথা বলেছিলাম।”
তারপর তিনি তাঁকে জলের কাছে নিয়ে গেলেন। আকাশে একটি চাঁদ।
জলে তার প্রতিবিম্ব—আর একটি। “এই তো,” বললেন শিয়েং মিয়েং, “দুই চাঁদ!”
লোককথার বিভিন্ন পুনর্কথনে এই ধরনের শব্দ-খেলা দেখা যায়। গল্পের মজাটা শিশুরাও বুঝতে পারে।
কিন্তু একটু গভীরে গেলে বোঝা যায়—এটি ভাষার অস্পষ্টতা নিয়ে একটি চমৎকার লোকরস। একটি বাক্য কীভাবে দুইভাবে ব্যাখ্যা করা যায়, শিয়েং মিয়েং তারই সুবিধা নেন।
গল্প ৩: বাঁশের নলের রহস্য
লাওসের লোকজ জীবনে বাঁশের ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই পরিচিত বস্তুই Xieng Mieng-এর একটি গল্পে হয়ে ওঠে রহস্যের কেন্দ্র।
গল্পটির বিভিন্ন সংস্করণে একটি বাঁশের নলকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যাতে অন্য চরিত্ররা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে নলের ভিতরে নিশ্চয়ই বিশেষ কিছু আছে। কিন্তু আসল বিষয়টি বস্তুটির মধ্যে যতটা নয়, মানুষের কৌতূহলের মধ্যে ততটাই। মানুষ যখন কোনও রহস্যের উত্তর জানে না, তখন সে নিজের মতো করে উত্তর তৈরি করতে শুরু করে।
শিয়েং মিয়েং এই মনস্তত্ত্ব খুব ভালোভাবে বোঝেন। তিনি তাই খুব বেশি কিছু বলেন না। বরং অন্যদের নিজেদের কল্পনা করতে দেন।
এই গল্পের শিশুতোষ সংস্করণও প্রকাশিত হয়েছে। লাওসের শিশুদের জন্য কাজ করা Big Brother Mouse-এর Xieng Mieng সংকলনে “What Is in the Bamboo Tube?”-সহ একাধিক গল্প রয়েছে।
এই গল্পের আধুনিক শিক্ষা
কৌতূহল অবশ্যই ভালো। কিন্তু কৌতূহল এবং বিশ্বাস এক জিনিস নয়। কেউ বলল, “এর ভিতরে আশ্চর্য কিছু আছে”—সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করার দরকার নেই।
আগে জানতে হবে— “প্রমাণ কোথায়?”
গল্প ৪: রাজাকে নিজের পুকুরে নামানোর বুদ্ধি
আরেকটি পরিচিত Xieng Mieng কাহিনিতে তিনি এমন একটি দাবি করেন যে তিনি রাজাকে তাঁর নিজের পুকুরে নামাতে পারবেন। রাজা স্বাভাবিকভাবেই বিশ্বাস করেন না।
রাজাকে তাঁর নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোথাও নিয়ে যাওয়া সহজ নয়।
কিন্তু শিয়েং মিয়েং জোর করেন না। তিনি রাজাকে কোনওভাবে টেনে নিয়ে যান না। তিনি শুধু কথার এমন একটি পথ তৈরি করেন যাতে শেষ পর্যন্ত রাজাই নিজের সিদ্ধান্তে পুকুরে নেমে পড়েন।
এখানেই trickster-এর আসল শক্তি। তিনি অন্যকে নিজের হাতে নিয়ন্ত্রণ করেন না। তিনি এমন পরিস্থিতি তৈরি করেন যাতে অন্য মানুষ নিজেই সেই সিদ্ধান্ত নেয়, যেটি শিয়েং মিয়েং চেয়েছিলেন।
Xieng Mieng-এর বিভিন্ন গল্পে এই ধরনের কৌশল বারবার দেখা যায়—ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ না করে কথার মাধ্যমে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া।
আরও পড়ুন :- হেঁসোরাম হুঁশিয়ারের ডায়েরি, সুকুমার রায়ের ব্যঙ্গাত্মক ও কল্পবিজ্ঞান রচনা
Xieng Mieng-এর গল্পে রাজা কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
এখানে লুকিয়ে রয়েছে লোককথার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিক।
রাজা হলেন ক্ষমতার প্রতীক। আর শিয়েং মিয়েং সাধারণ মানুষের বুদ্ধির প্রতিনিধি। তাই তাঁদের সংঘাত শুধু ব্যক্তিগত হাসির বিষয় নয়। গল্পের ভিতরে একটি সামাজিক কল্পনাও কাজ করে—
রাজা শক্তিশালী হতে পারেন, কিন্তু সাধারণ মানুষের বুদ্ধিকে তিনি নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।
এই কারণেই trickster গল্প সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় হয়। বাস্তব জীবনে যে মানুষটি রাজা বা ক্ষমতাবান ব্যক্তির সামনে সরাসরি কথা বলতে পারে না, গল্পের জগতে সে শিয়েং মিয়েং-এর মাধ্যমে নিজের জয় দেখতে পায়। এটি লোকসাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি।
শিয়েং মিয়েং বনাম গোপাল ভাঁড়: মিল আছে, কিন্তু এক নয়
একজন বাঙালি পাঠকের কাছে Xieng Mieng-কে পরিচিত করে তুলতে গোপাল ভাঁড়ের উদাহরণ স্বাভাবিকভাবেই মনে আসতে পারে।
দুজনের মধ্যেই রয়েছে—
- উপস্থিত বুদ্ধি
- হাস্যরস
- শব্দের খেলা
- ক্ষমতাবান ব্যক্তিকে বুদ্ধিতে পরাস্ত করা
- অপ্রত্যাশিত সমাধান
- সাধারণ মানুষের দৃষ্টিকোণ
কিন্তু তাঁদের এক করে ফেলা ঠিক হবে না।
গোপাল ভাঁড় বাংলা লোকসাহিত্যের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসরের চরিত্র। Xieng Mieng লাও লোককথার নিজস্ব ঐতিহ্যের অংশ।
একই ধরনের মানবিক অভিজ্ঞতা থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন সমাজে একই ধরনের গল্পের কাঠামো তৈরি হতে পারে।
এটাই লোকসাহিত্যের সৌন্দর্য।
সংস্কৃতি আলাদা, কিন্তু মানুষের হাসি অনেক সময় একই রকম।
Xieng Mieng-এর গল্পে বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ
লাওসের লোকসংস্কৃতিকে বোঝার ক্ষেত্রে বৌদ্ধ সাংস্কৃতিক পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। Xieng Mieng-এর কাহিনিতেও সন্ন্যাসী ও ধর্মীয় জীবনের উল্লেখ পাওয়া যায়। তবে তাঁর গল্পগুলিকে ধর্মীয় শিক্ষার সরল উদাহরণ হিসেবে দেখলে ভুল হবে।
এগুলি মূলত লোককাহিনি—যেখানে হাসি, দুষ্টুমি, সামাজিক পর্যবেক্ষণ এবং বুদ্ধির খেলা পাশাপাশি চলে। কখনও ধর্মীয় চরিত্রও তাঁর বুদ্ধির খেলায় জড়িয়ে পড়েন।
এতে লোককথার আরেকটি বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায়—গল্পের জগতে কোনও সামাজিক অবস্থানই হাস্যরসের ঊর্ধ্বে নয়। রাজা যেমন হাসির চরিত্র হতে পারেন, তেমনই অন্য ক্ষমতাবান বা সম্মানিত ব্যক্তিও হতে পারেন।
Xieng Mieng কি সত্যিই ঐতিহাসিক ব্যক্তি?
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা প্রয়োজন। Xieng Mieng-এর গল্পকে ঐতিহাসিক জীবনী হিসেবে পড়া উচিত নয়।
লোককথা বহু প্রজন্ম ধরে মুখে মুখে প্রচলিত হয়। গল্প বলার সময় নতুন ঘটনা যুক্ত হয়, কোনও ঘটনা বাদ পড়ে, চরিত্রের বৈশিষ্ট্য বদলায় এবং একই কাহিনির একাধিক সংস্করণ তৈরি হয়।
Xieng Mieng-এর ক্ষেত্রেও এমন বিভিন্ন সংস্করণ পাওয়া যায়।
তাঁকে নিয়ে লিখিত ও মৌখিক ঐতিহ্যের কথা Lao folk-literature বিষয়ক গবেষণামূলক উপকরণে আলোচিত হয়েছে। তাঁর গল্পের গদ্য ও পদ্যধর্মী রূপ এবং পামপাতার পাণ্ডুলিপিতে সংরক্ষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
তাই তাঁর গল্পের সবচেয়ে বড় সত্য হল ঐতিহাসিক তথ্য নয়। এগুলি লাও সমাজের লোককল্পনা, হাস্যরস ও সাংস্কৃতিক স্মৃতির দলিল।
Trickster গল্প মানেই কি প্রতারণা শেখানো?
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। Xieng Mieng-এর কিছু কাজ বাস্তব জীবনের নৈতিক মানদণ্ডে অনুসরণযোগ্য নয়।
তিনি প্রতারণা করেন। কখনও অন্যের সরলতার সুযোগ নেন।
তাই তাঁর গল্পকে “যে কোনও উপায়ে জিততে হবে”—এই শিক্ষা হিসেবে পড়া ঠিক নয়। বরং গল্পগুলি পড়ার সময় শিশুদের সঙ্গে আলোচনা করা যায়—
“শিয়েং মিয়েং বুদ্ধিমান ছিল, কিন্তু তার সব কাজ কি ঠিক ছিল?”
এই প্রশ্নই গল্পকে আরও মূল্যবান করে। কারণ ভালো লোককথা সবসময় সরাসরি উপদেশ দেয় না। কখনও গল্প আমাদের নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করতে শেখায়।
পৃথিবীর লোককথার এক বিশাল পরিবার
শিয়েং মিয়েংকে বুঝতে গেলে পৃথিবীর অন্যান্য trickster চরিত্রের কথাও মনে পড়ে।
বাংলায় গোপাল ভাঁড়।
দক্ষিণ ভারতে তেনালি রামন।
মধ্যপ্রাচ্য ও মধ্য এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে নাসিরুদ্দিনের কাহিনি।
আফ্রিকার বিভিন্ন সংস্কৃতিতে Anansi -এর মতো trickster।
ইউরোপের বিভিন্ন লোককথায়ও বুদ্ধিমান ও দুষ্টু চরিত্র দেখা যায়। এদের গল্প এক নয়। তাদের সংস্কৃতিও এক নয়।
কিন্তু একটা জায়গায় আশ্চর্য মিল— দুর্বল মানুষ গল্পের জগতে শক্তিশালী মানুষের সমান হয়ে ওঠে।
কখনও সে তাকে হারায়। কখনও বোকা বানায়। কখনও শুধু হাসির পাত্র বানিয়ে দেয়। এই কল্পনার স্বাধীনতাই trickster গল্পকে এত জনপ্রিয় করে রেখেছে।
নতুন প্রজন্মের জন্য Xieng Mieng-এর পাঁচটি শিক্ষা
১. প্রশ্ন করতে শেখো
কোনও কথা শুনেই মেনে নেওয়ার প্রয়োজন নেই।
২. ভাষাকে গুরুত্ব দাও
একটি শব্দের একাধিক অর্থ থাকতে পারে।
৩. পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করো
শিয়েং মিয়েং-এর সবচেয়ে বড় শক্তি তাঁর পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা।
৪. হাস্যরসকে ছোট করে দেখো না
হাসি অনেক সময় কঠিন সামাজিক সত্যকে সহজ করে প্রকাশ করতে পারে।
৫. নিজের বিচারবুদ্ধি ব্যবহার করো
শিয়েং মিয়েং-এর মতো বুদ্ধিমান হওয়া মানে কাউকে ঠকানো নয়।
বরং অর্থ বোঝা, প্রশ্ন করা এবং নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়া।
লাওসের একটি গল্প থেকে বিশ্বকে চেনা
আজ আমরা পৃথিবীকে আগের যেকোনও সময়ের তুলনায় সহজে দেখতে পারি। কিন্তু বিশ্বের সংস্কৃতিকে জানা মানে শুধু বিখ্যাত শহর, পর্যটনকেন্দ্র বা খাবারের তালিকা জানা নয়। একটি দেশের লোককথা সেই দেশের মানুষের হাসি, ভয়, কল্পনা, সামাজিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ধারণা সম্পর্কে অনেক কিছু বলে।
তাই Xieng Mieng-এর গল্প পড়া মানে শুধু একজন দুষ্টু মানুষের কীর্তি পড়া নয়। এটি লাওসের একটি সাংস্কৃতিক জানালা খুলে দেয়। আর সেই জানালা দিয়ে আমরা দেখতে পাই—
মেকং নদীর তীরের সমাজেও মানুষ হাসে। তারাও ক্ষমতাবান মানুষকে নিয়ে মজা করে। তারাও বুদ্ধিমান সাধারণ মানুষের গল্প বলতে ভালোবাসে।
আর তারাও বিশ্বাস করে— মাথার বুদ্ধি কখনও কখনও রাজদণ্ডের চেয়েও শক্তিশালী।
শেষ কথা: শিয়েং মিয়েংকে মনে রাখার কারণ
শিয়েং মিয়েং নিখুঁত নায়ক নন। তিনি কোনও আদর্শ চরিত্রও নন।
তিনি দুষ্টু।
তিনি কৌশলী।
কখনও তিনি সুবিধাবাদী।
কিন্তু ঠিক সেই কারণেই তিনি জীবন্ত। তিনি আমাদের শেখান না যে সবসময় তাঁকে অনুসরণ করতে হবে।
বরং তাঁর গল্প আমাদের সামনে প্রশ্ন রাখে— “তুমি হলে কী করতে?”
একজন রাজা যদি এমন নির্দেশ দেন যার মধ্যে ফাঁদ আছে? একটি কথার দুটি অর্থ হলে? কেউ রহস্যের কথা বলে তোমাকে প্রভাবিত করতে চাইলে? তখন তুমি কী করবে?
এই প্রশ্নগুলিই Xieng Mieng-এর গল্পকে আজও প্রাসঙ্গিক করে।
বাংলার শিশু যদি গোপাল ভাঁড়ের গল্প শুনে হাসে, তবে তার লাওসের এক শিশুর হাসিও জানা উচিত। সে জানুক—পৃথিবীর অন্য প্রান্তেও একজন দুষ্টু লোকনায়ক আছে, যে রাজাকে বুদ্ধিতে হারায়, কথার ফাঁক খুঁজে নেয় এবং অসম্ভব পরিস্থিতিকে হাসির গল্পে পরিণত করে।
তার নাম—
Xieng Mieng।
আর তাঁর গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়—
ক্ষমতা মানুষকে বড় করতে পারে, কিন্তু বুদ্ধি মানুষকে স্বাধীন করে।
এই কারণেই পৃথিবীর লোককথার ভাণ্ডারে শিয়েং মিয়েং-এর মতো চরিত্রের জায়গা আজও অমূল্য।

