হুদুড় দুর্গা ও দাসাঁই পরব: সাঁওতাল ঐতিহ্যে এক শোকের ও প্রতিরোধের আখ্যান

হুদুড় দুর্গা ও দাসাঁই পরব এদেশের সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর কাছে এক শোকের আখ্যান। হুদুড় দুর্গাকে একজন প্রাচীন মানবনেতা ও শহীদ রাজা হিসেবে শ্রদ্ধা করে।

হুদুড় দুর্গা

পার্বত্য ও অরণ্যঘেরা বাংলায় যখন শরতের কাশফুল ফোটে, যখন ঢাকের কাঠি ও আলোকসজ্জায় সেজে ওঠে চারপাশ, ঠিক সেই সময়েই আমাদের সমাজের একটি প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী অংশ নিমজ্জিত হয় গভীর শোকে। বহুত্ববাদী ভারতের সংস্কৃতি কোনো একক ধারায় প্রবাহিত নয়। যখন মূলধারার মানুষ উৎসবে মেতে ওঠেন, তখন সাঁওতাল (বা খেরওয়াল) জনগোষ্ঠীর মানুষ পালন করেন ‘দাসাঁই পরব’ (Dasai Festival)—যা কোনো আনন্দের উদযাপন নয়, বরং হারানো বীর ও আবাসভূমি স্মরণ করার এক বিষাদময় শোক উৎসব।

নতুন প্রজন্মের জন্য আমাদের ভূখণ্ডের ইতিহাস ও বহুসংস্কৃতিবাদকে গভীরভাবে বোঝার একটি জরুরি মাধ্যম হল এই দাসাঁই পরব এবং সাঁওতাল লোকগাথার নায়ক ‘হুদুড় দুর্গা’ (Hudur Durga)-র কাহিনী।

১. সাঁওতাল লোকগাথা: হুদুড় দুর্গা কে?

মূলধারার পৌরাণিক আখ্যানে যাকে ‘মহিষাসুর’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, সাঁওতাল বা খেরওয়াল লোককথায় তিনি একজন অত্যাচারী অসুর নন; বরং তাঁদের পরম শ্রদ্ধেয় প্রাচীন রাজা ও নায়ক—হুদুড় দুর্গা। সাঁওতালি ভাষায় ‘হুদুড়’ শব্দের অর্থ হল বজ্র বা প্রবল ঝড়, এবং ‘দুর্গা’ শব্দের অর্থ রক্ষক বা যিনি রক্ষা করেন।

লোকগাথা অনুযায়ী, প্রাচীনকালে চাইচম্পা (Chaichampa) নামক এক সমৃদ্ধ ও শান্তিময় ভূখণ্ডে রাজত্ব করতেন সাঁওতালদের এই অসমসাহসী রাজা। সাঁওতাল সমাজ ছিল অত্যন্ত ন্যায়পরায়ণ এবং নারীশ্রদ্ধায় বিশ্বাসী। তাঁদের নীতি অনুসারে, কোনো সাঁওতাল পুরুষ কখনো কোনো নারীর ওপর অস্ত্র তুলে নিত না।

ঐতিহাসিক ও নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে এটি মূলত দুটি ভিন্ন সংস্কৃতি ও জনজাতির ভূখণ্ডগত সংঘাতের গল্প। লোককথা বলে, বাইরে থেকে আসা শত্রুরা যখন সরাসরি যুদ্ধে রাজা হুদুড় দুর্গাকে পরাস্ত করতে ব্যর্থ হয়, তখন তারা তাঁর এই নীতি ও দুর্বলতাকে কাজে লাগায়। ছলনাবশত এক নারীকে পাঠায় তাঁর রাজ্যে। অবশেষে প্রতারণার মাধ্যমে হত্যা করা হয় সাঁওতালদের এই অসীম সাহসী বীরকে।

নৃতাত্ত্বিক নোট: সাঁওতাল জনগোষ্ঠী হুদুড় দুর্গাকে কোনো ঈশ্বর বা অপদেবতা হিসেবে পূজা করে না; বরং তাঁকে একজন প্রাচীন মানবনেতা ও শহীদ রাজা (‘হোঁড়’ বা ‘HNorh’) হিসেবে শ্রদ্ধা করে।

আরও পড়ুন – পুরুলিয়া কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের অংশ হলো? জানুন একটি গৌরবময় সংগ্রামের ইতিহাস

২. দাসাঁই পরব: বিষাদের সুর ও নারীবেশে আত্মগোপন

দাসাঁই পরব
Photo courtesy

আশ্বিন মাসের শারদোৎসবের দিনগুলোতে সাঁওতাল পুরুষেরা গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরে ঘুরে যে বিশেষ নৃত্য ও গান পরিবেশন করেন, তাকেই বলা হয় ‘দাসাঁই এনেচ’ (Dasai Enjech) বা দাসাঁই নৃত্য।

নারীবেশ ধারণের ঐতিহাসিক কারণ

দাসাঁই নৃত্যে সাঁওতাল পুরুষেরা শাড়ি ও ময়ূরের পালক পরিধান করেন এবং কপালে সিঁদুরের টিপ পরেন। এর পেছনে রয়েছে এক করুণ ঐতিহাসিক পটভূমি:

  • শত্রুর চোখ এড়ানো: প্রিয় রাজা হুদুড় দুর্গার পতনের পর সাঁওতালদের মূল আবাসভূমি চাইচম্পা ধ্বংস হয়ে যায়। শত্রুরা সাঁওতাল পুরুষদের নির্বিচারে হত্যা করতে শুরু করলে নিজেদের পরিচয় লুকাতে সাঁওতাল পুরুষেরা নারীদের পোশাক ধারণ করে আত্মগোপন করেন।
  • সন্ধান অভিযান: নারীবেশে তাঁরা গ্রামে গ্রামে ঘুরে আপনজন ও হারানো নেতাদের সন্ধান করতেন। এই স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই আজও দাসাঁই উৎসবে সাঁওতাল পুরুষেরা শাড়ি ও অলংকার পরে নাচেন।

‘ভুয়াং’ বাদ্যযন্ত্র ও ‘হায় হায়’ ধ্বনি

ভুয়াং - Bhooaang
ভুয়াংPhoto courtesy

দাসাঁই নাচের অন্যতম প্রধান অঙ্গ হল ‘ভুয়াং’ (Bhooaang) নামক বাদ্যযন্ত্র, যা লাউয়ের খোল ও ধনুকের ছিলা দিয়ে তৈরি। এই বাদ্যযন্ত্রের গভীর টঙ্কার যেন সাঁওতালদের হারানো রাজ্য ও প্রিয় নেতার জন্য দীর্ঘশ্বাসের প্রতিনিধিত্ব করে।

দাসাঁই গানের প্রতিটি চরণে উঠে আসে এক গভীর বিষাদময় সুর:

“হাইরে হাইরে… চেতে লেগে দো বোন দাসাঁইয়েনা?”
(হায়রে! কিসের জন্য আমাদের এই শোক ও দাসাঁই যাত্রা?)

আরও পড়ুন :- বাংলার কাদা-মাটির বুকে এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের পদাবলী, মইছাড়া উৎসব

৩. হুদুড় দুর্গা ও মূলধারার পূজার তুলনা

একটি তথ্যবহুল সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি পেতে আমরা পৌরাণিক আখ্যান এবং সাঁওতালদের নিজস্ব লোকগাথার পার্থক্যের দিকে নজর দিতে পারি:

মূল্যায়নের দিকমূলধারার পৌরাণিক দৃষ্টিভঙ্গিসাঁওতাল (খেরওয়াল) লোকগাথার দৃষ্টিভঙ্গি
চরিত্রের নামমহিষাসুর (অসুর বা দানব)হুদুড় দুর্গা বা মায়সা (শহীদ রাজা)
উৎসের এলাকাবৈদিক বা পৌরাণিক শাস্ত্রচাইচম্পা (প্রাচীন খেরওয়াল আবাসভূমি)
উদযাপনের প্রকৃতিআনন্দ ও অশুভের বিনাশ হিসেবে চিহ্নিত উৎসবগভীর শোক, স্মৃতিচারণ ও স্মারক যাত্রা (দাসাঁই)
নৃত্যের ধরনঢাক ও ধুনুচি নাচ (বিজয়ের উল্লাস)দাসাঁই নাচ (নারীবেশে করুণ আর্তনাদ ও অনুসূচনা)

৪. নতুন প্রজন্মের জন্য কেন এই ইতিহাস জানা জরুরি?

আজকের বিশ্বায়ন ও তথ্যপ্রযুক্তির যুগে তরুণ প্রজন্মের কাছে ভারতীয় মহাদেশের সাংস্কৃতিক বহুত্ববাদ বা Cultural Pluralism বোঝা অত্যন্ত জরুরি।

  1. একই ঘটনার ভিন্ন দৃষ্টিকোণ (Alternative Narratives): ইতিহাস বা পৌরাণিক কাহিনী সর্বদা একমুখী হয় না। বিজয়ীর দৃষ্টিভঙ্গির পাশাপাশি বিজিতের নিজস্ব ইতিহাস ও লোককথাও সমভাবে গুরুত্বপূর্ণ ও শ্রদ্ধেয়।
  2. উপজাতীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণ: ভারতে আদিবাসী জনজাতির অবদান এবং তাঁদের সমৃদ্ধ মৌখিক সাহিত্য (Oral Traditions) বিলুপ্তির পথে। দাসাঁই পরব আমাদের শেখায় কীভাবে শত শত বছর ধরে লিখিত নথির অনুপস্থিতিতেও একটি সমাজ তাদের ইতিহাস রক্ষা করে এসেছে।
  3. সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা: যখন আমরা জানতে পারি যে আমাদের আনন্দের সময়েই পাশাপাশি বসবাসকারী অন্য একটি জনগোষ্ঠী শোক পালন করছে, তখন তা আমাদের সামাজিক সংবেদনশীলতা ও সহমর্মিতাকে বাড়িয়ে তোলে।

উপসংহার

‘হুদুড় দুর্গা’ এবং ‘দাসাঁই পরব’ কেবল কোনো অতীত কাহিনী নয়, এটি আদিবাসী সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় ও সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের এক জীবন্ত ঐতিহ্য। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, ভারতের সংস্কৃতি একটি সুবিশাল নদীর মতো—যেখানে নানা ছোট-বড় নদী ও স্রোত এসে মিশেছে। আসুন, আমরা অন্যান্য সম্প্রদায়ের উৎসব ও আনন্দকে যেমন উদযাপন করি, তেমনি আমাদের দেশের প্রাচীনতম আদিবাসীদের ঐতিহ্য, শোক ও ইতিহাসকেও সমান সম্মানের চোখে দেখি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top