আহিরীটোলা —পুরনো কলকাতার আঁতুড়ঘর

পুরনো কলকাতার আঁতুড়ঘর আহিরীটোলা, যেখানে অতীত ও বর্তমান একসাথে চলে। কলকাতার এই ঐতিহ্যকে ভালোবাসাই হোক নতুন প্রজন্মের অঙ্গীকার।

পুরনো কলকাতার আঁতুড়ঘর - আহিরীটোলা

কলকাতাকে জানতে চাইলে শুধু ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল দেখলেই হবে না

কলকাতাকে আমরা অনেক সময় কয়েকটি পরিচিত ছবির মধ্যে বন্দি করে ফেলি—ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়ালের সাদা গম্বুজ, হাওড়া ব্রিজের ইস্পাত, কলেজ স্ট্রিটের বই, কফি হাউসের আড্ডা কিংবা দুর্গাপুজোর আলো। কিন্তু কলকাতার আসল ইতিহাস অনেক সময় লুকিয়ে আছে এমন সব পাড়ায়, যেগুলির নাম আমরা প্রতিদিন উচ্চারণ করি অথচ তাদের গল্প জানি না।

আহিরীটোলা সেইরকমই একটি পাড়া।

উত্তর কলকাতার এই পুরনো অঞ্চলকে তাই শুধু একটি neighbourhood বা একটি ঘাটের ঠিকানা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। আহিরীটোলা আসলে কলকাতার নগর-সভ্যতার একটি জীবন্ত দলিল—যেখানে নদী, ধর্ম, শিক্ষা, মুদ্রণশিল্প, থিয়েটার, ব্যবসা, জনজীবন এবং নানা সামাজিক স্তরের মানুষের সহাবস্থান একসঙ্গে শহরের চরিত্র তৈরি করেছে। ঐতিহাসিক সূত্রে আহিরীটোলা কলকাতার প্রাচীনতম পাড়াগুলির অন্যতম; আহিরীটোলা স্ট্রিটের অস্তিত্ব ১৭৮৪ সালের Mark Wood-এর কলকাতার মানচিত্রেও পাওয়া যায়।

এই কারণেই “পুরনো কলকাতার আঁতুড়ঘর” কথাটি আহিরীটোলার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক রূপক হিসেবে অত্যন্ত অর্থবহ। এটি কোনও সরকারি উপাধি নয়; বরং সেই পুরনো নগরজীবনের প্রতীক, যার ভিতের উপর আধুনিক কলকাতা গড়ে উঠেছে।

আর আজকের প্রজন্মের কাছে আহিরীটোলার সবচেয়ে বড় শিক্ষা হল—একটি শহরের ইতিহাস শুধু রাজা, জমিদার বা বড় বড় প্রাসাদের ইতিহাস নয়; সাধারণ মানুষের জীবনও শহরের ইতিহাস তৈরি করে।

আহিরীটোলা নামের অর্থ কী?

“আহিরীটোলা” নামটির মধ্যেই এই পাড়ার সামাজিক ইতিহাসের একটি সূত্র লুকিয়ে আছে। ঐতিহাসিক গবেষণা ও পুরনো নথির ভিত্তিতে জানা যায়, ‘আহির’ সম্প্রদায়ের দুধ বিক্রেতা বা গোয়ালা সম্প্রদায়ের বসতির সঙ্গে এই এলাকার নামের যোগ রয়েছে। ‘তোলা’ বলতে কোনও নির্দিষ্ট পাড়া বা বসতি বোঝানো হত। প্রজন্মের পর প্রজন্ম এই সম্প্রদায়ের মানুষ এখানে বসবাস করায় অঞ্চলটির নাম হয় আহিরীটোলা।

তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখা দরকার। আহিরীটোলা কখনও শুধুমাত্র দুধওয়ালাদের পাড়া ছিল না। পুরনো নথি ও গবেষণায় দেখা যায়, এখানে বসতি এবং বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি গড়ে উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে থিয়েটার, মুদ্রণ ও প্রকাশনা, নানা ব্যবসা এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর মানুষের উপস্থিতি এই অঞ্চলকে একটি বহুমাত্রিক নগরপাড়ায় পরিণত করে। অর্থাৎ, কলকাতার পরিচয় কোনও একক সম্প্রদায়ের হাতে তৈরি হয়নি। এ শহর তৈরি হয়েছে বহু মানুষের মিলিত শ্রমে।

আরও পড়ুন :- মেঘনাদ সাহা, নক্ষত্রলোকের আলো ও এক অপরাজিত বিজ্ঞানী

১৭৮৪ সালের মানচিত্রে আহিরীটোলা: কলকাতার শহর হয়ে ওঠার আগের গল্প

আহিরীটোলার ইতিহাস বুঝতে হলে সেই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠা নগরটির কথা মনে রাখতে হবে। ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, আহিরীটোলা স্ট্রিট ১৭৮৪ সালের Mark Wood-এর কলকাতার মানচিত্রে নথিভুক্ত ছিল। সেখানে নামটি কিছুটা পরিবর্তিত ও ইংরেজিকৃত হয়ে “Areetollah Street” হিসেবে দেখা যায়।

এই একটি তথ্যই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এর অর্থ হল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কলকাতার পরবর্তী সুপরিকল্পিত রাস্তা, প্রশাসনিক অঞ্চল বা বড় বড় স্থাপত্যের অনেক আগেই উত্তর কলকাতার এই অঞ্চল নগরজীবনের অংশ হয়ে উঠেছিল। আজকের সরু আহিরীটোলা স্ট্রিট যেন সেই পুরনো কলকাতার স্মৃতি বহন করে চলেছে। রাস্তা সরু। বাড়িগুলি কাছাকাছি। গলিগুলি যেন হঠাৎ অন্য সময়ে নিয়ে যায়। আর কোথাও কোথাও পুরনো বাড়ির দেওয়াল, দরজা, কারুকাজ কিংবা রাস্তার বিন্যাস দেখে মনে হয়—শহরটি আসলে আমাদের চোখের সামনে নয়, আমাদের পায়ের নিচে তৈরি হয়েছে।

গঙ্গার সঙ্গে আহিরীটোলার সম্পর্ক: নদীই ছিল শহরের প্রথম মহাসড়ক

আহিরীটোলা ঘাট

আহিরীটোলার ইতিহাসের কেন্দ্রে রয়েছে হুগলি নদী। আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে নদী হয়তো একটি সুন্দর দৃশ্য, sunset-এর জায়গা কিংবা ছবি তোলার backdrop। কিন্তু পুরনো কলকাতায় নদী ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি কিছু। নদী ছিল যোগাযোগের পথ। বাণিজ্যের পথ। মানুষের চলাচলের পথ। ধর্মীয় যাত্রার পথ। আহিরীটোলা ঘাট সেই নদীকেন্দ্রিক কলকাতার একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের সঙ্গে আহিরীটোলা ও আশপাশের এলাকার সম্পর্কের কথাও ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। তাঁর বহু ভক্ত বাগবাজার, শ্যামপুকুর ও আহিরীটোলা অঞ্চলে বাস করতেন। ফলে দক্ষিণেশ্বর থেকে নৌকায় হুগলি পেরিয়ে এই অঞ্চলে তাঁর আসা-যাওয়া ছিল সম্ভবপর।

অর্থাৎ, আহিরীটোলা ঘাটকে শুধু একটি bathing ghat হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত তাৎপর্য বোঝা যাবে না। এটি ছিল মানুষের সঙ্গে মানুষের, শহরের সঙ্গে নদীর এবং ধর্মীয় জীবনের সঙ্গে নাগরিক জীবনের সংযোগস্থল।

আহিরীটোলা ঘাট ও রানি রাসমণির স্মৃতি

আহিরীটোলা ঘাটের ইতিহাসে রানি রাসমণির নামও গুরুত্বপূর্ণ। স্বামী-জমিদার রাজচন্দ্র দাসের মৃত্যুর পর রানি রাসমণি তাঁর জমিদারি পরিচালনা করেন এবং বাংলায় একাধিক জনহিতকর নির্মাণ ও উদ্যোগে অর্থ ব্যয় করেন। ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে যে তাঁর উদ্যোগের মধ্যে হুগলি নদীর তীরে তিনটি ঘাট নির্মাণের কথাও রয়েছে—বাবুঘাট, আহিরীটোলা ঘাট এবং নিমতলা ঘাট।

এখানে একটি বৃহত্তর সামাজিক ইতিহাস রয়েছে। ঔপনিবেশিক কলকাতায় ঘাট শুধু ধর্মীয় স্নানের জায়গা ছিল না। ঘাট ছিল জনজীবনের অবকাঠামো। মানুষ নদীর কাছে আসত, নৌকায় উঠত, পণ্য ও মানুষ নদীপথে যাতায়াত করত, ধর্মীয় অনুষ্ঠান করত।

তাই আহিরীটোলা ঘাট আসলে কলকাতার নদীকেন্দ্রিক সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ জানালা। আজকের প্রজন্ম যদি এই ঘাটের সিঁড়িতে বসে একবার ভাবে—“এই নদী দিয়েই কত শত বছর ধরে মানুষ চলেছে”—তাহলে আহিরীটোলাকে নতুন চোখে দেখা শুরু হবে।

আরও পড়ুন :- প্যারীচাঁদ মিত্র বাংলা ভাষায় প্রথম ঔপন্যাসিক ও ভাষাবিদ

আহিরীটোলা: বাংলার মুদ্রণ ও বইয়ের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়

আহিরীটোলার সবচেয়ে চমকপ্রদ পরিচয়গুলির একটি হল এর সঙ্গে পুরনো কলকাতার মুদ্রণ ও প্রকাশনা জগতের সম্পর্ক। উনিশ শতকের কলকাতায় উত্তর কলকাতার Chitpur, Garanhata, Ahiritola এবং আশপাশের অঞ্চল জনপ্রিয় মুদ্রণ ও প্রকাশনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে ওঠে। একটি গবেষণামূলক সংকলনে উল্লেখ আছে, ১৮২০-১৮৩০-এর দশকে কলকাতায় বহু printing press গড়ে উঠেছিল এবং Chitpur Road-কে কেন্দ্র করে Ahiritola-সহ উত্তর কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় প্রকাশনা শিল্পের প্রসার ঘটে।

আরও চমকপ্রদ তথ্য হল—১৮৫৭ সালে আহিরীটোলা, গড়ানহাটা, চিৎপুর ও আশপাশের অঞ্চলে অন্তত ৪৬টি প্রেস ছিল বলে Michael F. Suarez-এর The Book: A Global History-এর সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব প্রেসে পঞ্জিকা, পৌরাণিক সাহিত্য, প্রহসন, গান, চিকিৎসা-সংক্রান্ত লেখা-সহ নানা ধরনের বই ছাপা হত।

ভাবুন তো— আজকের social media, e-book বা online publishing-এর বহু আগে এই সরু গলিগুলিতেই বাংলা ভাষার printed culture সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছচ্ছিল। এটাই কলকাতার intellectual history-এর এক অসাধারণ দিক।

বই শুধু শিক্ষিত অভিজাতের জন্য নয়—সস্তা মুদ্রিত বইয়ের মাধ্যমে পড়া, গল্প, ধর্মীয় সাহিত্য, গান, রসিকতা এবং নানা ধরনের জ্ঞান বৃহত্তর মানুষের কাছে পৌঁছতে শুরু করেছিল। এই প্রক্রিয়া বাংলা সমাজের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অর্থাৎ আহিরীটোলার গলি একসময় ছিল বাংলার early mass publishing-এরও একটি অংশ।

“বটতলা” সংস্কৃতির সঙ্গে আহিরীটোলার যোগ

পুরনো কলকাতার কথা উঠলে “বটতলা” শব্দটি অবশ্যই আসে। বটতলা শুধু একটি ভৌগোলিক স্থান ছিল না; এটি ছিল সস্তা মুদ্রিত বইয়ের এক জনপ্রিয় সাংস্কৃতিক জগত। গবেষণায় দেখা যায়, বটতলা-সংলগ্ন বৃহত্তর অঞ্চল কুমারটুলি, আহিরীটোলা, শিমলা ও বাগবাজার পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই অঞ্চলের cheap print culture বাংলার মৌখিক সংস্কৃতিকে ক্রমশ মুদ্রিত সাহিত্যের জগতে নিয়ে যেতে সাহায্য করেছিল।

এখানে নতুন প্রজন্মের জন্য একটি বড় শিক্ষা রয়েছে। সংস্কৃতি শুধু “উচ্চ সংস্কৃতি” নয়। মানুষ যে বই কিনত, যে গান পড়ত, যে পঞ্জিকা ব্যবহার করত, যে গল্প নিয়ে আড্ডা দিত—সেই জনপ্রিয় সংস্কৃতিও ইতিহাসের অংশ। আহিরীটোলা সেই গণসংস্কৃতির বিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড।

আহিরীটোলার গলি - পুতুলবাড়ি
Photo courtesy

থিয়েটার, বিনোদন এবং শহরের বহুমাত্রিক জীবন

আহিরীটোলার ইতিহাসকে যদি শুধু ধর্ম, ঘাট ও বইয়ের ইতিহাস ভাবেন, তাহলেও ছবিটি অসম্পূর্ণ থাকবে। ঐতিহাসিক গবেষণা অনুযায়ী, এই অঞ্চল কলকাতার থিয়েটার-জগতের সঙ্গেও বহু দশক যুক্ত ছিল। একই সঙ্গে উনিশ ও বিংশ শতকের গোড়ার কলকাতার মতো এখানেও নানা ধরনের সামাজিক ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড পাশাপাশি চলত।

এই তথ্যটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ পুরনো কলকাতাকে আমরা প্রায়ই অতিরিক্ত romanticise করি। কিন্তু ইতিহাসের আসল সৌন্দর্য হল তার জটিলতা। একটি পাড়ায় একই সঙ্গে ধর্মীয় স্থান, স্কুল, ব্যবসা, ছাপাখানা, থিয়েটার, শ্রমজীবী মানুষ, মধ্যবিত্ত পরিবার এবং নানা সামাজিক বাস্তবতা থাকতে পারে। আহিরীটোলা সেই জটিল, বহুস্তরীয় কলকাতারই প্রতিচ্ছবি।

কেন আহিরীটোলাকে “পুরনো কলকাতার আঁতুড়ঘর” বলা যায়?

“আঁতুড়ঘর” শব্দটি এখানে ইতিহাসের ভাষায় একটি রূপক। কারণ আহিরীটোলায় আমরা পুরনো কলকাতার বহু মৌলিক উপাদান একসঙ্গে দেখতে পাই—

  • নদীকেন্দ্রিক যোগাযোগ ও জনজীবন
  • প্রাচীন ঘাট ও ধর্মীয় সংস্কৃতি
  • দুধ ব্যবসায়ীসহ সাধারণ মানুষের বসতি
  • মুদ্রণ ও প্রকাশনা শিল্প
  • জনপ্রিয় সাহিত্য ও বটতলা সংস্কৃতি
  • থিয়েটার ও বিনোদন
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠান
  • পুরনো বাজার ও বাণিজ্য
  • বিভিন্ন সামাজিক স্তরের মানুষের সহাবস্থান
  • উত্তর কলকাতার গলি, বাড়ি ও নগর-স্থাপত্যের ধারাবাহিকতা

কলকাতার ইতিহাস যদি একটি বিশাল বই হয়, তাহলে আহিরীটোলা সেই বইয়ের একটি অধ্যায় নয়—বরং বহু অধ্যায়ের সংযোগস্থল।

আহিরীটোলার heritage শুধু স্মৃতিতে নয়, সরকারি নথিতেও

আহিরীটোলার ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলার সময় আবেগের পাশাপাশি নথির কথাও বলা দরকার।

কলকাতা পুরসভার heritage তালিকায় আহিরীটোলা ঘাট Grade I heritage structure হিসেবে তালিকাভুক্ত। একই heritage documentation-এ আহিরীটোলা স্ট্রিটের ১১ নম্বরের প্রাক্তন আহিরীটোলা বাজারের gateway-ও Grade I হিসেবে নথিভুক্ত হয়েছে।

আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয়ও KMC-এর heritage তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। আশপাশে আরও বেশ কিছু ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে, যার মধ্যে Durgeshwar Shiva Temple এবং Niyamatullah Ghat Mosque-এর মতো স্থাপনাও রয়েছে।

এই তালিকা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য শেখায়—

ঐতিহ্য মানে শুধু “পুরনো” নয়; ঐতিহ্য মানে এমন কিছু যা একটি সমাজের স্মৃতি, পরিচয় ও ইতিহাস বহন করে।

কলকাতা পুরসভার heritage conservation ব্যবস্থায় Grade I, Grade IIA এবং Grade IIB-এর মতো শ্রেণিবিভাগের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলিকে সংরক্ষণের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে।

শেষ কথা: কলকাতাকে ভালোবাসার নতুন ভাষা হোক heritage

একদিন হয়তো আহিরীটোলার কোনও গলিতে দাঁড়িয়ে একজন তরুণ তার বন্ধুকে বলবে— “জানিস, এই রাস্তার ইতিহাস ১৭৮৪ সালের মানচিত্র পর্যন্ত পৌঁছে যায়।”

বন্ধু হয়তো অবাক হবে। তারপর তারা নদীর ঘাটে যাবে। কেউ ছবি তুলবে। কেউ পুরনো বাড়ির দরজার নকশা দেখবে। কেউ আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয়ের ইতিহাস খুঁজবে। কেউ হয়তো বাড়ি ফিরে কলকাতার পুরনো মানচিত্র নিয়ে পড়াশোনা করবে। সেখানেই heritage জীবন্ত হয়ে ওঠে।

কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় কাজ আমাদের অতীতে আটকে রাখা নয়। ইতিহাস আমাদের শেখায়—আমরা কোথা থেকে এসেছি, তাই বুঝলে আমরা কোথায় যেতে চাই তা আরও স্পষ্ট হয়।

আহিরীটোলা তাই কেবল উত্তর কলকাতার একটি পুরনো পাড়া নয়। এটি সেই কলকাতা, যেখানে নদী শহরকে পথ দেখিয়েছে; সাধারণ মানুষের পেশা পাড়ার নাম দিয়েছে; ছাপাখানা জ্ঞানকে মানুষের ঘরে পৌঁছে দিয়েছে; স্কুল শিক্ষার আলো জ্বেলেছে; ধর্মীয় ও সামাজিক জীবন পাশাপাশি চলেছে; আর শতাব্দীর পরিবর্তনের মধ্যেও গলি ও ঘাটগুলি শহরের স্মৃতি ধরে রেখেছে।

নতুন কলকাতা যদি ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যায়, আহিরীটোলা তাকে বারবার মনে করিয়ে দেয়—ভবিষ্যৎ যত আধুনিকই হোক, তার শিকড়কে ভুলে গেলে শহর তার আত্মপরিচয়ের একটি বড় অংশ হারায়।

তাই আহিরীটোলাকে শুধু “old Kolkata” বলে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। একবার হাঁটুন – দেখুন – পড়ুন – শুনুন। আর তারপর গর্ব করে বলুন – “এই কলকাতা শুধু আমার থাকার শহর নয়; এই কলকাতা আমার উত্তরাধিকার।”

দ্রুত তথ্য: আহিরীটোলা এক নজরে

অবস্থান: উত্তর কলকাতা, হুগলি নদীর পূর্ব তীরবর্তী ঐতিহাসিক অঞ্চল।
নামের উৎস: ‘আহির’ সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত বসতি এবং ‘তোলা’ অর্থাৎ পাড়া/বসতি—এমন ব্যাখ্যা ঐতিহাসিক সূত্রে পাওয়া যায়।
প্রাচীন মানচিত্রে উল্লেখ: ১৭৮৪ সালের Mark Wood-এর কলকাতার মানচিত্রে আহিরীটোলা স্ট্রিটের উল্লেখ পাওয়া যায়।
আহিরীটোলা ঘাট: কলকাতা পুরসভার heritage documentation-এ Grade I heritage structure।
আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয়: ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত; পুরনো নাম ছিল “Jadu Pandit-er Pathshala”।
মুদ্রণ ও প্রকাশনা: উনিশ শতকে Chitpur–Garanhata–Ahiritola অঞ্চল কলকাতার গুরুত্বপূর্ণ printing ও popular publishing belt-এর অংশ ছিল।
রামকৃষ্ণের সঙ্গে সম্পর্ক: আহিরীটোলা ও আশপাশের অঞ্চলে তাঁর বহু ভক্ত বাস করতেন; নদীপথে দক্ষিণেশ্বর থেকে এই অঞ্চলে যাতায়াতের উল্লেখ ঐতিহাসিক সূত্রে রয়েছে।
রানি রাসমণির সঙ্গে সম্পর্ক: আহিরীটোলা ঘাট তাঁর জনহিতকর ঘাট নির্মাণ উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ আছে।

FAQ: আহিরীটোলা সম্পর্কে সাধারণ প্রশ্ন

আহিরীটোলা কোথায়?

আহিরীটোলা উত্তর কলকাতার একটি ঐতিহাসিক পাড়া, যার পশ্চিমে হুগলি নদী এবং যার ঐতিহাসিক নগর-পরিসর চিৎপুর, বাগবাজার, জোড়াবাগান ও নিমতলা অঞ্চলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।

আহিরীটোলা নামটি কেন?

ঐতিহাসিক সূত্র অনুযায়ী, ‘আহির’ সম্প্রদায়ের দুধ বিক্রেতাদের বসতির সঙ্গে নামটির সম্পর্ক রয়েছে। ‘তোলা’ বলতে পাড়া বা নির্দিষ্ট বসতি বোঝানো হত।

আহিরীটোলা কি কলকাতার সবচেয়ে পুরনো পাড়া?

এমন নির্দিষ্ট ranking ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। তবে আহিরীটোলা কলকাতার প্রাচীনতম পাড়াগুলির অন্যতম, এবং ১৭৮৪ সালের মানচিত্রে আহিরীটোলা স্ট্রিটের উল্লেখ রয়েছে।

আহিরীটোলা ঘাট কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এটি পুরনো কলকাতার নদীকেন্দ্রিক জীবন, ধর্মীয় আচার, যাতায়াত ও সামাজিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। কলকাতা পুরসভার heritage documentation-এ এটি Grade I হিসেবে তালিকাভুক্ত।

আহিরীটোলা কি মুদ্রণশিল্পের সঙ্গে যুক্ত ছিল?

হ্যাঁ। উনিশ শতকে আহিরীটোলা-সহ চিৎপুর ও গড়ানহাটা অঞ্চল কলকাতার printing ও popular publishing-এর গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল।

আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয় কবে প্রতিষ্ঠিত হয়?

আহিরীটোলা বঙ্গ বিদ্যালয় ১৮৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এর পুরনো নাম ছিল “Jadu Pandit-er Pathshala”; স্কুলের আর্কাইভে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সক্রিয় পৃষ্ঠপোষকতার কথাও উল্লেখ রয়েছে।

নতুন প্রজন্মের আহিরীটোলার ইতিহাস জানা উচিত কেন?

কারণ আহিরীটোলার ইতিহাসের মধ্যে কলকাতার নদী, শিক্ষা, মুদ্রণসংস্কৃতি, ধর্মীয় জীবন, ব্যবসা, জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং সাধারণ মানুষের নগরজীবন—সবকিছুর যোগসূত্র দেখা যায়। এটি কলকাতাকে শুধু একটি আধুনিক মহানগর নয়, একটি দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা হিসেবে বুঝতে সাহায্য করে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top