হিন্দি-উর্দু সাহিত্যের দিকপাল মুন্সি প্রেমচাঁদের জীবনী, ‘গোদান’-সহ কালজয়ী রচনা, স্বাধীনতা সংগ্রামে ভূমিকা ও সমাজে গভীর প্রভাব জানুন এই নিবন্ধে।

আজকের প্রজন্ম যখন স্ক্রিনের আলোয় ডুবে থাকে, তখন এক শতাব্দী আগের এক লেখকের কথা মনে করিয়ে দেওয়া জরুরি—যাঁর লেখা আজও ভারতীয় সমাজের আয়না। তিনি মুন্সি প্রেমচাঁদ। হিন্দি ও উর্দু সাহিত্যের এই দিকপাল কৃষক, নারী, দলিত ও প্রান্তিক মানুষের জীবনকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন। রাজা-রাজড়ার কাহিনি বা কল্পনার রঙিন জগৎ নয়, তিনি লিখেছিলেন মাটির মানুষের ঘাম, ক্ষুধা, শোষণ আর প্রতিরোধের গল্প। এই কারণেই তাঁকে বলা হয় “উপন্যাস সম্রাট”। এই নিবন্ধে আমরা জানব তাঁর জীবন, সাহিত্যকর্ম এবং সমাজে তাঁর গভীর প্রভাবের কথা।
জন্ম ও শৈশবের সংগ্রাম
মুন্সি প্রেমচাঁদের প্রকৃত নাম ছিল ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। তিনি ১৮৮০ সালের ৩১শে জুলাই উত্তরপ্রদেশের বারাণসীর কাছে লামহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আজায়েব রায় ছিলেন ডাকঘরের একজন কেরানি এবং মায়ের নাম আনন্দী দেবী। শৈশব থেকেই দারিদ্র্য ও দুঃখ ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী।
মাত্র সাত বছর বয়সে তিনি মাকে হারান। এরপর বাবা দ্বিতীয় বিবাহ করেন, কিন্তু সৎমায়ের সঙ্গে ছোট্ট ধনপতের সম্পর্ক কখনও সহজ হয়নি। মাত্র চোদ্দো বছর বয়সে, তখনও তিনি ছাত্র, বাবাও পরলোকগমন করেন। এই বয়সেই সৎমা ও সৎ ভাইবোনদের দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর কাঁধে। জীবনের এই প্রথম পাঠই তাঁকে শিখিয়েছিল সাধারণ মানুষের কষ্ট কী জিনিস—আর সেই অভিজ্ঞতাই পরবর্তীকালে তাঁর সাহিত্যের প্রাণ হয়ে উঠেছিল।
আর্থিক টানাপোড়েনের কারণে তিনি নিয়মিত পড়াশোনা বেশিদূর চালিয়ে যেতে পারেননি। তবু অদম্য চেষ্টায় তিনি পড়াশোনা করেন, উর্দু ও ফারসি ভাষা শেখেন লালপুরের এক মাদ্রাসায়। পরে তিনি শিক্ষকতার চাকরি নেন এবং ধীরে ধীরে সরকারি শিক্ষা বিভাগে যোগ দেন।
আরও পড়ুন :- অহল্যাবাই হোলকার এক অনন্যা শাসক, সমাজ সংস্কারক ও চিরন্তন অনুপ্রেরণা
নাম যেভাবে হল “প্রেমচাঁদ”
প্রথম জীবনে তিনি উর্দুতে লিখতেন “নবাব রায়” ছদ্মনামে। কিন্তু এক ঐতিহাসিক ঘটনা তাঁর লেখক-পরিচয় বদলে দেয়। ১৯০৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ছোটগল্প সংকলন “সোজ়-এ-ওয়াতন” (দেশের বেদনা)। ব্রিটিশ সরকার এই সংকলনকে রাষ্ট্রদ্রোহমূলক বলে চিহ্নিত করে এবং জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে তিরস্কার করে বইয়ের সমস্ত কপি পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ দেন। এরপর “নবাব রায়” নামে লেখা আর নিরাপদ ছিল না। তখন থেকেই তিনি গ্রহণ করেন সেই নাম, যে নামে আজ সারা বিশ্ব তাঁকে চেনে—প্রেমচাঁদ।
সাহিত্যিক যাত্রা ও রচনাসম্ভার
প্রেমচাঁদ প্রথমে উর্দুর একজন খ্যাতনামা লেখক হিসেবে পরিচিতি পান, পরে হিন্দিতে লিখতে শুরু করেন এবং হিন্দি কথাসাহিত্যকে এক নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন। তাঁকে হিন্দি সাহিত্যে বাস্তববাদের প্রবর্তক বলা হয়। কল্পনার আশ্রয় ছেড়ে তিনি সমাজের রূঢ় বাস্তবকে সাহিত্যে তুলে ধরেন।
তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য হিন্দি উপন্যাস “সেবাসদন” প্রকাশিত হয় ১৯১৯ সালে। উপন্যাসটি মূলত উর্দুতে “বাজ়ার-এ-হুস্ন” নামে লেখা হয়েছিল, কিন্তু হিন্দিতেই প্রথম প্রকাশিত হয়। একটি কলকাতাভিত্তিক প্রকাশক এই রচনার জন্য তাঁকে ৪৫০ টাকা দিয়েছিলেন। এরপর একে একে বেরোতে থাকে “রঙ্গভূমি”, “প্রতিজ্ঞা”, “নির্মলা”, “গবন”, “কর্মভূমি”-র মতো কালজয়ী উপন্যাস।
তাঁর সাহিত্যকর্মের বিশালতা বিস্ময়কর। সারা জীবনে তিনি লিখেছেন প্রায় ১৪টি উপন্যাস এবং প্রায় ৩০০টি ছোটগল্প, সেই সঙ্গে অসংখ্য প্রবন্ধ, শিশুসাহিত্য, নাটক ও অনুবাদ। তাঁর ছোটগল্পগুলি নানা সংকলনে প্রকাশিত হয়েছে, যার মধ্যে আট খণ্ডের “মানসরোবর” সবচেয়ে জনপ্রিয় বলে বিবেচিত।
মুন্সি প্রেমচাঁদের শ্রেষ্ঠ কীর্তি: “গোদান”

প্রেমচাঁদের সাহিত্যজীবনের মুকুটমণি হল উপন্যাস “গোদান” (গরুদান)। এটি তাঁর শেষ সম্পূর্ণ উপন্যাস এবং ভারতীয় সাহিত্যের এক অমর সৃষ্টি। এই উপন্যাসের কেন্দ্রে আছে হোরি নামের এক দরিদ্র কৃষক, যাঁর সারা জীবনের একমাত্র স্বপ্ন—একটি নিজের গরু। কিন্তু সামন্ততান্ত্রিক শোষণ, মহাজনের ঋণ, জাতপাতের বেড়াজাল আর সামাজিক অবিচারের চাপে সেই সামান্য স্বপ্নটুকুও অধরা থেকে যায়। হোরির মৃত্যু পর্যন্ত সেই স্বপ্ন পূরণ হয় না।
“গোদান” শুধু একটি উপন্যাস নয়, এটি ভারতীয় গ্রামজীবনের এক নির্মম দলিল। এতে ফুটে উঠেছে কৃষকের অসহায়তা, ঋণের ফাঁদ, এবং একটি অন্যায় ব্যবস্থার নিষ্ঠুরতা—যা আজও প্রাসঙ্গিক।
অন্যান্য অবিস্মরণীয় গল্প
প্রেমচাঁদের ছোটগল্পগুলিও সমান শক্তিশালী। “ঈদগাহ” গল্পে ছোট্ট হামিদ মেলায় গিয়ে নিজের জন্য খেলনা বা মিষ্টি না কিনে দাদির জন্য চিমটে কেনে, যাতে রুটি বানাতে গিয়ে দাদির হাত না পোড়ে—এই গল্প শিশুমনের ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের এক অনবদ্য চিত্র। “কফন”, “পূস কি রাত”, “শতরঞ্জ কে খিলাড়ি”-র মতো গল্পে সমাজের নানা স্তরের বাস্তবতা অসাধারণ দক্ষতায় ধরা পড়েছে। সত্যজিৎ রায় ১৯৭৭ সালে “শতরঞ্জ কে খিলাড়ি” গল্প অবলম্বনে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন, যা প্রেমচাঁদের সাহিত্যের ব্যাপ্তি ও গভীরতার প্রমাণ।
আরও পড়ুন :- ‘চিকিৎসা সঙ্কট’ পরশুরাম অর্থাৎ রাজশেখর বসুর বিখ্যাত রম্যরচনা
স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রেমচাঁদ
প্রেমচাঁদ শুধু কলমের যোদ্ধা ছিলেন না, তিনি দেশের স্বাধীনতা আন্দোলনেও সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিলেন। ১৯২১ সালে গোরক্ষপুরে মহাত্মা গান্ধীর এক সভায় যোগ দেওয়ার পর তিনি অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দেন। গান্ধীজি যখন মানুষকে সরকারি চাকরি ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান, তখন প্রেমচাঁদ শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও এবং সংসারের আর্থিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও তাঁর সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন।
এরপর তিনি বারাণসীতে ফিরে এসে পুরোপুরি সাহিত্যচর্চা ও প্রকাশনায় মন দেন। ১৯২৩ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “সরস্বতী প্রেস”। পরে তিনি “হংস” ও “মর্যাদা”-র মতো পত্রিকার সম্পাদনার দায়িত্বও নেন। ১৯৩৬ সালে, মৃত্যুর কয়েক মাস আগে, লখনউতে তিনি “প্রগতিশীল লেখক সংঘ”-এর প্রথম সভাপতি নির্বাচিত হন—যা তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার এক বড় স্বীকৃতি।
তাঁর সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য
প্রেমচাঁদের লেখার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল তার সরলতা ও সততা। তিনি জটিল ভাষার আড়ম্বরে না গিয়ে সাধারণ মানুষের মুখের ভাষায় লিখতেন, যাতে তাঁর লেখা পৌঁছে যায় সমাজের সব স্তরে। তাঁর সাহিত্যের কয়েকটি প্রধান বৈশিষ্ট্য:
সামাজিক বাস্তববাদ: তিনি সমাজের প্রকৃত সমস্যা—দারিদ্র্য, জাতপাত, সামন্ততন্ত্র, নারীর দুর্দশা—কে সাহিত্যের বিষয় করেছিলেন।
প্রান্তিক মানুষের কণ্ঠস্বর: কৃষক, শ্রমিক, দলিত ও শোষিত মানুষ, যাঁরা এতদিন সাহিত্যে উপেক্ষিত ছিলেন, তাঁরাই হয়ে উঠলেন প্রেমচাঁদের নায়ক।
নারীর মর্যাদা: “নির্মলা” উপন্যাসে অসম বিবাহ ও বাল্যবৈধব্যের মতো সামাজিক ব্যাধিকে তিনি সাহসের সঙ্গে তুলে ধরেছিলেন।
সংস্কারের আহ্বান: তাঁর প্রতিটি রচনার পিছনে ছিল সমাজ বদলানোর এক গভীর তাগিদ।
সমাজে প্রভাব ও উত্তরাধিকার
প্রেমচাঁদের প্রভাব শুধু সাহিত্যের সীমানায় আবদ্ধ থাকেনি, তা সমাজের গভীরে প্রোথিত হয়েছে। তিনিই প্রথম ভারতীয় সাহিত্যে সাধারণ মানুষকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছিলেন। তাঁর লেখা পড়ে অগণিত মানুষ সামাজিক অন্যায়ের বিরুদ্ধে সচেতন হয়েছেন, প্রশ্ন করতে শিখেছেন।
জীবদ্দশায় তিনি বড় কোনও সাহিত্য পুরস্কার পাননি, আজীবন আর্থিক সংকটে ভুগেছেন। কিন্তু মৃত্যুর পর তাঁর মর্যাদা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে। তাঁর রচনা ইংরেজি, রুশ-সহ বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিশ্বসাহিত্যের মঞ্চে স্বীকৃতি পেয়েছে। তাঁর গল্প-উপন্যাস আজও স্কুল-কলেজের পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত। ২০১৬ সালের ৩১শে জুলাই গুগল একটি বিশেষ ডুডলের মাধ্যমে তাঁর ১৩৬তম জন্মবার্ষিকী উদযাপন করে, যা প্রমাণ করে তিনি আজও কতখানি প্রাসঙ্গিক।
মুন্সি প্রেমচাঁদের মৃত্যু
দীর্ঘদিন অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করার পর ১৯৩৬ সালের ৮ই অক্টোবর, মাত্র ৫৬ বছর বয়সে এই মহান সাহিত্যিক শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু তাঁর কলমের সৃষ্টি আজও অমর।
প্রায়ই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
প্রশ্ন: মুন্সি প্রেমচাঁদের প্রকৃত নাম কী ছিল?
তাঁর প্রকৃত নাম ছিল ধনপত রায় শ্রীবাস্তব। প্রথম জীবনে তিনি উর্দুতে “নবাব রায়” ছদ্মনামে লিখতেন, পরে “প্রেমচাঁদ” নাম গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন: মুন্সি প্রেমচাঁদের সবচেয়ে বিখ্যাত উপন্যাস কোনটি?
তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি হল “গোদান” (১৯৩৬), যা দরিদ্র কৃষক হোরির জীবন ও সামন্ততান্ত্রিক শোষণের এক নির্মম চিত্র তুলে ধরে।
প্রশ্ন: মুন্সি প্রেমচাঁদকে “উপন্যাস সম্রাট” বলা হয় কেন?
সাধারণ মানুষ, কৃষক ও প্রান্তিক শ্রেণিকে সাহিত্যের কেন্দ্রে এনে বাস্তববাদী ধারা প্রবর্তনের জন্য এবং ১৪টি উপন্যাস ও প্রায় ৩০০টি ছোটগল্প রচনার জন্য তাঁকে এই সম্মান দেওয়া হয়।
প্রশ্ন: মুন্সি প্রেমচাঁদ কবে জন্মগ্রহণ ও মৃত্যুবরণ করেন?
তিনি ১৮৮০ সালের ৩১শে জুলাই বারাণসীর কাছে লামহি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৩৬ সালের ৮ই অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।
প্রশ্ন: প্রেমচাঁদ স্বাধীনতা সংগ্রামে কীভাবে যুক্ত ছিলেন?
১৯২১ সালে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনে সাড়া দিয়ে তিনি সরকারি চাকরিতে ইস্তফা দেন এবং সাহিত্যের মাধ্যমে সমাজ সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন।
উপসংহার
মুন্সি প্রেমচাঁদ শুধু একজন লেখক ছিলেন না, তিনি ছিলেন সমাজের বিবেক। এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়ে, আজীবন দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করেও তিনি যে সাহিত্যসম্পদ রেখে গেছেন, তা ভারতীয় সংস্কৃতির অমূল্য উত্তরাধিকার। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন—সাহিত্য শুধু বিনোদন নয়, তা সমাজ বদলানোর হাতিয়ারও বটে।
আজকের প্রজন্মের কাছে প্রেমচাঁদ শুধু ইতিহাসের একটি নাম নয়। হোরির স্বপ্ন, হামিদের চিমটে, নির্মলার যন্ত্রণা—এই চরিত্রগুলি আজও আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় সমাজের অসঙ্গতি। তাই আসুন, আমরা প্রেমচাঁদকে পড়ি, তাঁকে জানি, এবং তাঁর দেখানো পথে একটি সুন্দর, ন্যায্য সমাজ গড়ার স্বপ্ন দেখি। কারণ প্রেমচাঁদ চিরন্তন—তিনি সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরকাল বেঁচে থাকবেন।



