চার বন্ধু আর একতার গল্প: ভুটানের এক ঐতিহ্যবাহী লোকগাথা

ঐতিহ্যবাহী অসংখ্য ভুটানের লোকগাথা সমগ্র থেকে চার বন্ধু আর একতার গল্প শেখায় একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করলেই যেকোনো বাধাই অতিক্রম করা যায়।

ভুটানের লোকগাথা - চার বন্ধু আর একতার গল্প
চিত্র সৌজন্য

ভুটানের লোকগাথা – চার বন্ধু আর একতার গল্প

অনেক অনেক দিন আগের কথা। এক ঘন, সবুজ বনের গভীরে চারটে অদ্ভুত বন্ধু বাস করত—একটি হাতি, একটি বাঁদর, একটি খরগোশ আর একটি ছোট্ট তিতির পাখি। বনের পশুপাখিরা সাধারণত একে অপরের সাথে ঝগড়াঝাঁটি করে, কিন্তু আমাদের এই চার বন্ধুর মধ্যে ছিল গলায় গলায় ভাব। তারা সারাদিন একসাথে খেলত, গল্প করত আর বনের আনাচে-কানাচে ঘুরে বেড়াত।

একদিন ঘুরতে ঘুরতে তারা বনের মাঝে একটা বিশাল, ফলবতী গাছের সামনে এসে দাঁড়াল। গাছটার ডালে ডালে ঝুলছিল টসটসে, মিষ্টি ফল। সেই ফল দেখে চার বন্ধুরই জিভে জল চলে এল! কিন্তু সমস্যা হলো, গাছের সবচেয়ে নিচু ডালটাও ছিল অনেক উঁচুতে। ফল পাড়া তো দূরের কথা, সেখানে পৌঁছানোই ছিল অসম্ভব।

তখন হাতিটা বলল, “আমাদের মধ্যে কে সবচেয়ে বড় আর বয়সে জ্যেষ্ঠ, তা যদি আমরা জানতে পারি—তবে সেই আমাদের পথ দেখাতে পারবে এবং আমরা সবাই মিলে ফলটা পেড়ে খেতে পারব।”

যেমন ভাবা, তেমন কাজ! চার বন্ধু মিলে হিসাব করতে বসল, কে কতদিন ধরে এই বনটিকে চেনে।

  • হাতি বলল: “আমি যখন একদম ছোট্ট ছিলাম, তখন এই গাছটা আমার সমান উঁচু ছিল। আমি এটার ওপর দিয়ে হেঁটে যেতাম।”
  • বাঁদরটি মাথা চুলকে বলল: “আরে, আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন এই গাছটার কোনো ডালপালাই ছিল না! এটা একটা ছোট্ট চারাগাছ ছিল, আর আমি এটার ছায়া পাওয়ার জন্য মাটিতে উবু হয়ে বসতাম।”
  • খরগোশ কান দুটো নাড়িয়ে বলল: “তোমরা তো তাও গাছটাকে দেখেছ! আমি যখন এই বনে প্রথম আসি, তখন গাছটার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। মাটিতে তখন মাত্র দুটো পাতা গজিয়েছিল, আর আমি সেই কচি পাতা দুটো চাটতাম।”
  • সবশেষে ছোট্ট তিতির পাখিটি ডানা ঝাপটে বলল: “বন্ধুরা, এই গাছটা কিন্তু এমনি এমনি জন্মায়নি। অনেক বছর আগে, আমি অন্য এক বন থেকে একটা মিষ্টি ফলের বীজ খেয়ে এসেছিলাম। তারপর এখানে এসে যখন আমি মলত্যাগ করি, তখন সেই বীজটি মাটিতে পড়ে। আর তা থেকেই আজ এই বিশাল গাছের সৃষ্টি হয়েছে!”

এই কথা শুনে বাকি তিন বন্ধু তো অবাক! তারা বুঝতে পারল যে ছোট্ট তিতির পাখিটিই বয়সে সবচেয়ে বড় এবং অভিজ্ঞ। কারণ তার জন্যই আজ এই গাছটার জন্ম হয়েছে। হাতি, বাঁদর আর খরগোশ মিলে পরম শ্রদ্ধায় তিতির পাখিকে তাদের নেতা মেনে নিল।

কিন্তু এখন প্রশ্ন হলো—ফল পাড়া যাবে কী করে? পাখি তো একা এত বড় ফল টেনে নামাতে পারবে না।

তখন তিতির পাখিটি এক চমৎকার বুদ্ধি বের করল। সে বলল, “আমরা যদি একজন আরেকজনের পিঠে চড়ি, তবেই আমরা মগডালে পৌঁছে যাব!”

আরও পড়ুন :- বোধিসত্ত্ব বা জাতকের গল্প অপূর্ব সদর্থক নীতিশিক্ষামূলক গল্পমালা

যেই কথা, সেই কাজ!
১. প্রথমে শক্তিশালী হাতিটি শক্ত হয়ে মাটিতে দাঁড়াল।
২. হাতির চওড়া পিঠের ওপর চটপটে বাঁদরটি লাফিয়ে উঠল।
৩. বাঁদরের কাঁধের ওপর আলতো করে বসল নরম তুলতুলে খরগোশটি
৪. আর সবার ওপরে, খরগোশের মাথায় গিয়ে বসল ছোট্ট তিতির পাখিটি

বাহ্! দেখতে দেখতে তৈরি হয়ে গেল এক জীবন্ত মই! তিতির পাখিটি এবার খুব সহজেই তার ঠোঁট দিয়ে গাছের সবচেয়ে পাকা আর মিষ্টি ফলগুলো পেড়ে নিচের বন্ধুদের দিকে ছুড়ে দিতে লাগল।

সেদিন তারা চার বন্ধু মিলে পেট পুরে মিষ্টি ফল খেল। তারা বুঝতে পারল যে, একা একা যা করা অসম্ভব, সবাই মিলে এক জোট হলে তা কত সহজেই না করা যায়! সেই থেকে বনের সব পশুপাখি তাদের এই একতার গল্প করতে লাগল, আর চার বন্ধুও আজীবন সুখে-শান্তিতে একসাথে মিলেমিশে রইল।


গল্পের শিক্ষা: বয়স বা আকার কোনো বিষয় নয়, একে অপরকে সম্মান করা এবং একসঙ্গে মিলেমিশে কাজ করলেই যেকোনো কঠিন বাধা জয় করা যায়। একতাই বল!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top