নৈহাটির বড় মা: যিনি কাউকে ফেরান না। শুদ্ধ মনে তাঁর কাছে যা চাওয়া যায়, মা তা পূরণ করেন।

নৈহাটির বড় মা’র ইতিহাস, তাঁর ভবেশ কালী থেকে বড় মা হয়ে ওঠার যাত্রাপথ, অলৌকিক মহিমা এবং শতাব্দী প্রাচীন কিছু সামাজিক ঐতিহ্য নিয়ে আলোচনা।

নৈহাটির বড় মা

নৈহাটির নাম শুনলেই আজ আপামোর বাঙালির মনে ভেসে ওঠে এক অমোঘ মাতৃরূপের ছবি—তিনি নৈহাটির ‘বড় মা’। হুগলি নদীর পূর্ব তীরে অবস্থিত শিল্পাঞ্চল নৈহাটি যেমন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্মস্থান হিসেবে খ্যাত, তেমনই গত এক শতাব্দী ধরে এটি শাক্ত সাধনার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পীঠস্থানে পরিণত হয়েছে। প্রতি বছর কালীপুজোয় ২১ থেকে ২২ ফুট উচ্চতার এই বিশালাকার কৃষ্ণবর্ণা মাতৃমূর্তি দর্শনের জন্য দেশ-বিদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ ভক্তের সমাগম ঘটে।

নৈহাটির বড় মা: এক নজরে মূল তথ্য

বিষয়বিবরণ
প্রতিষ্ঠা বছর১৯২৩ সাল (শতবর্ষ প্রাচীন ঐতিহ্য)
মূল প্রতিষ্ঠাতাভবেশ চক্রবর্তী (নদিয়া জুট মিলের কর্মী ও বৈঞ্চব সাধক)
প্রতিমার উচ্চতা২১ থেকে ২২ ফুট (১৪ হাত)
আদি নামভবেশ কালী বা বড় কালী
মূল মন্ত্র ও স্লোগান“ধর্ম যার যার, বড় মা সবার”
বিশেষত্বসম্পূর্ণ বৈষ্ণব মতে পুজো, কোনো পশুবলি হয় না

ইতিহাসের সূচনা: ভবেশ কালী থেকে ‘বড় মা’

নৈহাটির এই বিখ্যাত পুজোর ইতিহাস শুরু হয়েছিল আজ থেকে এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে, ১৯২৩ সালে। এই পুজোর প্রধান কারিগর ছিলেন নৈহাটির বাসিন্দা ভবেশ চক্রবর্তী। পেশায় তিনি ছিলেন নদিয়া জুট মিলের একজন সাধারণ কর্মী এবং মনে-প্রাণে একজন সমাজসেবী ও বৈষ্ণব ভাবাপন্ন মানুষ (তিনি গলায় তুলসীর কণ্ঠী ধারণ করতেন)।

নবদ্বীপের সেই ভাঙা রাস ও ভবেশ চক্রবর্তী’র ঐশ্বরিক স্বপ্ন

লোকশ্রুতি এবং ইতিহাস অনুযায়ী, ১৯২২ সাল নাগাদ ভবেশ চক্রবর্তী তাঁর চার বন্ধুর সাথে নবদ্বীপের বিখ্যাত ‘ভাঙা রাস’ উৎসব দেখতে গিয়েছিলেন। সেখানে রাসের বিশালাকার রক্ষাকালী এবং অন্যান্য দেবদেবীর বিশাল মূর্তি দেখে তিনি গভীরভাবে অনুপ্রাণিত ও বিস্মিত হন। নৈহাটিতে ফিরে আসার পর তিনি স্বপ্নে স্বয়ং মা কালীর নির্দেশ পান বলে জানা যায়। স্বপ্নে দেবী তাঁকে নির্দেশ দেন যে, তাঁদের পারিবারিক ছোট পুজোটিকে যেন নবদ্বীপের মূর্তির আদলে এক বিশাল রূপ দেওয়া হয়।

স্বপ্নাদেশ পেয়েই ভবেশবাবু প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন এবং পরের বছর অর্থাৎ ১৯২৩ সালে ২১ ফুট উচ্চতার এক বিশালাকার রক্ষাকালী মূর্তি নির্মাণ করে পুজোর সূচনা করেন। যেহেতু ভবেশ চক্রবর্তী এই পুজো শুরু করেছিলেন, তাই শুরুর দিকে এই দেবীকে এলাকার মানুষ ‘ভবেশ কালী’ বা দেবীর বিশাল আকৃতির কারণে ‘বড় কালী’ বলে ডাকতেন।

‘বড় মা’ নামকরণের ইতিহাস

কালের নিয়মে ভবেশ কালীর অলৌকিক মহিমা চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। প্রথম দিকে পুজোটি চক্রবর্তী পরিবারের এবং একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, ধীরে ধীরে তা সর্বজনীন রূপ নেয়। ভক্তরা যখনই মায়ের কাছে আসতেন, এক অলৌকিক মানসিক শান্তি ও পরম মাতৃত্বের টান অনুভব করতেন। মায়ের এই সর্বজনীন রূপ এবং ভক্তদের প্রতি অসীম বাৎসল্যের কারণে কালক্রমে ‘বড় কালী’ নামটি রূপান্তরিত হয় পরম শ্রদ্ধার ‘বড় মা’ নামে। ভক্তদের বিশ্বাস—তিনি শুধু আকারের বড় নন, তিনি হৃদয়েও বিশ্বজনীন মা।

আরও পড়ুন :- প্রাসাদ-নগরী ধান্যকুড়িয়া, বাংলার বুকে এক টুকরো ইউরোপ

অলৌকিক ঘটনা ও লৌকিক বিশ্বাস (Myths & Miracles)

নৈহাটির বড় মাকে নিয়ে প্রচলিত আছে অজস্র অলৌকিক কাহিনী ও লোকবিশ্বাস। ভক্তদের দৃঢ় বিশ্বাস, বড় মা অত্যন্ত জাগ্রত এবং তিনি কাউকেই খালি হাতে ফেরান না।

প্রচলিত বিশ্বাস: “বড় মা কাউকে ফেরায় না। শুদ্ধ মনে তাঁর কাছে যা চাওয়া যায়, মা তা পূরণ করেন।”

১. দণ্ডী কাটার অলৌকিক ঐতিহ্য

প্রতি বছর কালীপুজোর অমাবস্যার পর থেকে কয়েক হাজার ভক্ত গঙ্গার ঘাট থেকে বুক দিয়ে হেঁটে (দণ্ডী কেটে) বড় মার মন্দির পর্যন্ত আসেন। এদের মধ্যে অনেকেরই মারাত্মক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া, চাকরি লাভ বা সন্তান লাভের মনস্কামনা পূরণ হওয়ার ইতিহাস রয়েছে। বহু মানুষ তাঁদের মনের ইচ্ছা পূরণ হওয়ার পর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ এই কঠিন ব্রত পালন করেন।

২. ভক্তদের বাস্তব অভিজ্ঞতা

স্থানীয় এবং দূর-দূরান্ত থেকে আসা ভক্তদের মুখে মুখে মায়ের অলৌকিক কীর্তি ঘোরে। যেমন, বহু জটিল রোগে আক্রান্ত রোগী চিকিৎসকদের আশা ছেড়ে দেওয়ার পর বড় মার চরণে মানসিক দিয়ে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে উঠেছেন। আবার অনেক বেকার যুবক-যুবতী মায়ের মন্দিরে এসে প্রার্থনা করার পর কর্মসংস্থান পেয়েছেন। মায়ের এই জাগ্রত রূপের কারণেই শনি ও মঙ্গলবার করে নৈহাটির ঋষি অরবিন্দ রোডের মন্দির চত্বর এক মিনি তীর্থক্ষেত্রে পরিণত হয়।

বড় মার পুজোর রীতিনীতি ও অনন্য বৈশিষ্ট্য

নৈহাটির বড় মা কালীর পুজোয় এমন কিছু বৈশিষ্ট্য দেখা যায় যা সাধারণত অন্য কোনো কালীপুজোয় সচরাচর মেলে না।

  • বৈষ্ণব মতে আরাধনা: যদিও বড় মা দক্ষিণাকালী রূপে পূজিতা হন, কিন্তু এর প্রতিষ্ঠাতা ভবেশ চক্রবর্তী বৈষ্ণব হওয়ায় এখানে সম্পূর্ণ বলিহীন পুজো হয়। কোনো পশুবলি এখানে দেওয়া হয় না। সম্পূর্ণ সাত্ত্বিক ও বৈষ্ণবীয় মতে মায়ের আরাধনা করা হয়।
  • কাঠামো পুজো: প্রতি বছর কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোর দিন অত্যন্ত নিষ্ঠার সাথে খুঁটি বা কাঠামো পুজোর মাধ্যমে দেবীর মূর্তির মূল কাঠামো তৈরির কাজ শুরু হয়। বর্তমান সময়ে ভাস্কর শুভেন্দু সরকার এই সুউচ্চ মূর্তি নির্মাণের দায়িত্ব পালন করছেন।
  • সোনার ও রুপোর গয়নার রাজকীয় সাজ: মায়ের পুজোয় ভক্তদের দান করা প্রায় ১০০ ভরির বেশি সোনার অলংকার এবং ২০০ কেজিরও বেশি রুপোর অলংকার দিয়ে মাকে সাজানো হয়। অমাবস্যার রাতে মায়ের এই রূপ দেখার মতো সৃষ্টি করে।
  • মহাপ্রসাদ ও অন্নকূট: পুজোর দিনগুলোতে কয়েক হাজার কেজি খিচুড়ি, পোলাও ও নানাবিধ ব্যঞ্জন রান্না করা হয়। টানা ১০০ ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে চলে ভক্তদের মধ্যে প্রসাদ বিতরণ।

আরও পড়ুন :- মুক্তবেণী ত্রিবেণী, বাংলার এক বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানে

বিসর্জন শোভাযাত্রা: এক অবিস্মরণীয় দৃশ্য

নৈহাটির কালীপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো বড় মার বিসর্জন শোভাযাত্রা। এই নিরঞ্জন প্রক্রিয়াটির নিজস্ব একটি ইতিহাস রয়েছে।

কাঁধ থেকে ট্রলি ব্যবস্থার ইতিহাস

১৯৭০ সালের আগে পর্যন্ত বড় মার এই বিশালাকার ও ভারী প্রতিমাকে এলাকার সবচেয়ে শক্তিশালী যুবকেরা কাঁধে করে বহন করে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যেতেন। কিন্তু মূর্তির বিশাল ওজন ও ভক্তদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ১৯৭০ সালের পর থেকে একটি বিশেষ চাকার ট্রলি বা রথের ব্যবস্থা করা হয়। এখন হাজার হাজার মানুষ দড়ি টেনে মহাসাড়ম্বরে বড় মাকে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যান।

বিসর্জনের সাজ ও সামাজিক সম্প্রীতি

বিসর্জনের দিন মায়ের শরীর থেকে সমস্ত সোনা ও রুপোর গয়না খুলে নেওয়া হয়। তার বদলে হাওড়া থেকে আনা রক্তজবা, গাঁদা ও রজনীগন্ধার বিশাল আকৃতির মালা এবং ফুলের সাজে মাকে সাজানো হয়। বিসর্জনের সময় গোটা নৈহাটির আকাশ-বাতাস মুখরিত হয়ে ওঠে একটি ঐতিহাসিক ধ্বনিতে—“ধর্ম যার যার, বড় মা সবার”। বড় মার বিসর্জন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নৈহাটি শহরের অন্য কোনো কালী প্রতিমার বিসর্জন দেওয়া নিয়ম নেই।

সারা বছর মায়ের দর্শন: স্থায়ী মন্দির ও সমাজসেবা

পূর্বে বড় মার পুজো শুধুমাত্র কালীপুজোর দিনগুলিতেই মৃন্ময়ী (মাটির) রূপে হতো। কিন্তু ভক্তদের নিত্যদিনের আকুলতা দেখে ২০১৪ সালে মূল মণ্ডপের ঢিল ছোঁড়া দূরত্বে বড় মার একটি স্থায়ী মন্দির গড়ে তোলা হয়। এই মন্দিরে মায়ের একটি ছোট প্রতিরূপ নিত্যদিন পুজো করা হয়।

নৈহাটি বড় মা সমিতি শুধুমাত্র ধর্মীয় আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, তারা নানাবিধ সামাজিক কাজের সাথে যুক্ত:
১. দান ও সেবা: ভক্তদের দেওয়া ফলমূল নিত্যদিন স্থানীয় সরকারি হাসপাতাল ও বৃদ্ধাশ্রমে বিতরণ করা হয়।

২. বস্ত্রদান: রাসপূর্ণিমায় হাজার হাজার দুঃস্থ মানুষের মধ্যে শাড়ি ও পোশাক বিতরণ করা হয়।

৩. বেনারসি দান: অভাবী পরিবারের বিবাহযোগ্যা মেয়েদের বিয়ের জন্য বড় মার চড়ানো বেনারসি শাড়ি ও সাহায্য প্রদান করা হয়।

কীভাবে পৌঁছাবেন নৈহাটি বড় মা মন্দিরে?

যদি আপনি বড় মার দর্শন করতে চান, তবে যাতায়াত অত্যন্ত সুগম:

  • রেলপথে: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে মেইন লাইনের যেকোনো ট্রেনে (যেমন কল্যাণী সীমান্ত, শান্তিপুর, রানাঘাট বা কৃষ্ণনগর লোকাল) চড়ে নৈহাটি জংশন স্টেশনে নামতে হবে।
  • হাঁটা পথ: স্টেশন থেকে ১ নম্বর প্ল্যাটফর্মের দিকের গেট দিয়ে বেরিয়ে ঋষি অরবিন্দ রোড ধরে মাত্র ৫ মিনিট হাঁটলেই মায়ের মন্দিরে পৌঁছানো যায়।
  • নিত্য দর্শনের সময়: মন্দির প্রতিদিন সকাল ৮:০০ থেকে দুপুর ১:০০ এবং বিকেল ৪:০০ থেকে রাত ৮:০০ পর্যন্ত ভক্তদের জন্য খোলা থাকে।

নৈহাটির বড় মা আজ কেবল একটি ধর্মীয় বিশ্বাসের নাম নয়, তিনি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে এক মহামিলনের প্রতীক। শতবর্ষ পার করেও মায়ের প্রতি মানুষের এই ভক্তি ও টান প্রমাণ করে যে, বাংলার লোকসংস্কৃতি ও শাক্ত ঐতিহ্যের অন্তরে বড় মা কতটা গভীর স্থান জুড়ে আছেন।


Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top