সঙ্গীত সম্রাট মিঞা তানসেন: জীবন, সুরের জাদুকরী রহস্য ও কালজয়ী ইতিহাস

মিঞা তানসেন সম্রাট আকবরের রাজসভার সবচেয়ে উজ্বল রত্ন ছিলেন। তানসেন তাঁর সুরের মূর্চ্ছনায় প্রদীপ জ্বালাতে বা বৃষ্টি আনতে পারতেন বলে লোকগাথায় প্রচলিত।

মিঞা তানসেন

ভারতীয় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নাম নিলেই যার মুখটি শ্রদ্ধার সাথে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, তিনি হলেন মিঞা তানসেন। তিনি কেবল একজন সঙ্গীতশিল্পী বা সম্রাট আকবরের দরবারের রত্নই ছিলেন না, বরং তাকে বলা হয় ‘হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের জনক’। ষোড়শ শতাব্দীর এই মহান সঙ্গীত সাধকের সুরের মূর্চ্ছনায় এমন অলৌকিক জাদু ছিল যা কেবল মানুষকে নয়, প্রকৃতি, পশুপাখি এবং এমনকি জ্বলন্ত আগুন ও বৃষ্টিকেও প্রভাবিত করতে পারত বলে লোকগাঁথায় প্রচলিত।

স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য ইতিহাস ও সংস্কৃতির এই মহা-নায়কের জীবন জানা অত্যন্ত জরুরি। আসুন, তানসেনের রহস্যময় জীবন, তার সঙ্গীত সাধনা এবং কিছু অবিশ্বাস্য তথ্য বিস্তারিত জেনে নেওয়া যাক।

১. প্রারম্ভিক জীবন ও বাল্যকালের রহস্য

তানসেনের জন্ম নিয়ে ইতিহাসবিদদের মধ্যে কিছুটা মতভেদ রয়েছে, তবে সাধারণ ধারণা অনুযায়ী ১৫০৬ খ্রিস্টাব্দে মধ্যপ্রদেশের গোয়ালিয়র শহরের কাছে অবস্থিত ‘বেহাত’ নামক এক গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তার আসল নাম ছিল রামতনু পাণ্ডে। তার বাবা মুকুন্দ মিশ্র (বা মুকুন্দ পাণ্ডে) ছিলেন একজন খ্যাতিমান কবি ও পণ্ডিত।

তানসেনের শৈশব ছিল অদ্ভুত রহস্যে ঘেরা। প্রচলিত আছে যে, তানসেন জীবনের প্রথম পাঁচ বছর পর্যন্ত কথা বলতে পারতেন না। কিন্তু যখন তিনি বলতে শুরু করেন, তখন তার মধ্যে এক অলৌকিক ক্ষমতা প্রকাশ পায়। তিনি বনের পশুপাখির ডাক অবিকল অনুকরণ করতে পারতেন।

একটি বিখ্যাত গল্প:
একবার একদল সাধু বন পথ দিয়ে যাচ্ছিলেন। ছোট রামতনু একটি ঝোপের পেছনে লুকিয়ে হিংস্র বাঘের ডাক ডাকেন। সাধুরা ভেবেছিলেন সত্যি বাঘ এসেছে এবং তারা ভয় পেয়ে যান। কিন্তু পরে তারা যখন জানতে পারেন এটি এক ছোট শিশুর খেলা, তখন তাদের দলে থাকা বিখ্যাত সঙ্গীত গুরু স্বামী হরিদাস বালক রামতনুর এই অসাধারণ ধ্বনি উচ্চারণের প্রতিভা দেখে মুগ্ধ হন। গুরু হরিদাস রামতনুর বাবাকে রাজি করিয়ে তাকে নিজের শিষ্যেরূপে গ্রহণ করেন এবং বৃন্দাবনে নিয়ে গিয়ে ১০ বছর ধরে সঙ্গীতের কঠোর শিক্ষা দেন।

রামতনু পাণ্ডে (শৈশবের নাম)
       │
       ▼ (গুরু স্বামী হরিদাসের শিক্ষা)
শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের ধ্রুপদ শৈলীতে দক্ষতা
       │
       ▼ (রাজা রামচন্দ্র সিংহের দরবার)
সঙ্গীতজ্ঞ হিসেবে খ্যাতি অর্জন
       │
       ▼ (সম্রাট আকবরের দরবারে যোগদান)
'মিঞা' উপাধি ও 'নবরত্ন' হিসেবে স্বীকৃতি

২. সঙ্গীত শিক্ষা এবং গুরুদের প্রভাব

তানসেনের জীবনে দুজন ব্যক্তিত্বের বিশাল প্রভাব ছিল—

১. স্বামী হরিদাস: বৃন্দাবনের সাধু ও বৈষ্ণব সঙ্গীতজ্ঞ গুরু হরিদাস তানসেনকে ধ্রুপদ সঙ্গীতের ব্যাকরণ, ভাব ও সাধনা শেখান। হরিদাসের শিষ্যত্বেই রামতনুর সুরের ভীত শক্ত হয়।

২. মহম্মদ গাউস: গোয়ালিয়রের বিখ্যাত সুফি সাধক মহম্মদ গাউসের সান্নিধ্যে তানসেনের সঙ্গীত চেতনার বিকাশ আরও গভীর হয়। সুফি সাধক গাউসের আধ্যত্মিক ভাবধারা তানসেনের সঙ্গীতে এক সার্বজনীন ও উদার মেজাজ এনে দিয়েছিল।

৩. সম্রাট আকবরের দরবারে মিঞা তানসেন

আকবরের দরবারে মিঞা তানসেন
Image courtesy

তানসেন মুঘল দরবারে আসার আগে রেওয়ার হিন্দু রাজা রামচন্দ্র সিংহের সভাগায়ক ছিলেন। রাজা রামচন্দ্র তার সঙ্গীত শুনে এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, দুজন একসাথে সঙ্গীত চর্চা করতেন।

যখন তানসেনের অলৌকিক খ্যাতির কথা মুঘল সম্রাট আকবরের কানে পৌঁছায়, তখন আকবর তাকে নিজ দরবারে আনার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। ১৫৬২ সালে, প্রায় ৬০ বছর বয়সে তানসেন দিল্লির মুঘল রাজদরবারে যোগদান করেন।

তানসেনের প্রথম পরিবেশনা শুনেই আকবর এতটাই বিমোহিত হন যে, তিনি তাকে ২ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা উপহার দেন এবং তাকে নিজের দরবারের নবরত্নের (Nine Jewels) অন্যতম রত্ন হিসেবে ঘোষণা করেন। আকবর ভালোবেসে ও শ্রদ্ধায় তাকে ‘মিঞা’ উপাধিতে ভূষিত করেন, যার অর্থ “পণ্ডিত” বা “সম্মানীয় ব্যক্তি”।

৪. তানসেন সম্পর্কে ৮টি আশ্চর্যজনক তথ্য (Amazing Facts)

তথ্যসূচক শিরোনামবর্ণনা ও ঐতিহাসিক ঘটনা
১. দীপক রাগ ও অগ্নিকাণ্ডকথিত আছে, তানসেন দরবারে ‘রাগ দীপক’ গাইলে বাতাস উত্তপ্ত হয়ে উঠত এবং নেভানো প্রদীপগুলো নিজে থেকেই জ্বলে উঠত।
২. মেঘ মল্লার ও বৃষ্টিদীপক রাগের প্রচণ্ড উত্তাপে তানসেনের শরীর যখন পুড়ে যাচ্ছিল, তখন তার কন্যা (বা শিষ্য) রূপবতী ‘রাগ মেঘ মল্লার’ গেয়ে বৃষ্টি নামান এবং তার প্রাণ রক্ষা করেন।
৩. বুনো হাতিকে বশ করাসম্রাট আকবরের এক হিংস্র ও উন্মাদ হাতিকে তানসেন নিজের মিষ্টি গান ও সুর দিয়ে শান্ত করেছিলেন, যার ফলে আকবর সেই হাতির পিঠে চড়তে পেরেছিলেন।
৪. নতুন রাগের উদ্ভাবকতানসেন প্রচলিত রাগ সংশোধন করে বহু নতুন রাগের জন্ম দেন; যেমন— ‘দরবারি কানাড়া’, ‘মিঞা কি মল্লার’, ‘মিঞা কি তোড়ি’ এবং ‘মিঞা কি সারং’।
৫. নতুন বাদ্যযন্ত্র সংস্কারতিনি কেবল গায়ক ছিলেন না, বাদ্যযন্ত্র বাজাতেও দক্ষ ছিলেন। প্রাচীন ভারতীয় ‘রবাব’ এবং ‘রুদ্রবীণা’ বাদ্যযন্ত্রের নকশায় তিনি যুগান্তকারী সংস্কার আনেন।
৬. দরবারের ঈর্ষাতানসেনের প্রতি আকবরের বিশেষ ভালোবাসা দেখে রাজদরবারের অন্যান্য গায়ক ও সভাসদরা এতটাই ঈর্ষান্বিত ছিলেন যে, তাকে মারার ষড়যন্ত্র হিসেবেই ‘দীপক রাগ’ গাইতে বাধ্য করা হয়েছিল।
৭. ইমারত ও প্রতিধ্বনিফতেহপুর সিক্রির ‘অনুপ তালাও’ নামক দীঘির মাঝখানে তানসেনের জন্য বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল, যেখানে তার সুরের প্রতিধ্বনি পুরো প্রাসাদে ছড়িয়ে পড়ত।
৮. আবুল ফজলের ঐতিহাসিক বাণীআকবরের ঐতিহাসিক গ্রন্থ ‘আইন-ই-আকবরী’-তে আবুল ফজল লিখেছেন: “বিগত এক হাজার বছরে ভারতের মাটিতে তানসেনের মতো কোনো সঙ্গীতজ্ঞের জন্ম হয়নি।”

৫. সঙ্গীত জগতে তানসেনের কালজয়ী অবদান

আজ আমরা হিন্দুস্তানি শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেখি, তার মূল ভিত গড়ে দিয়ে গেছেন তানসেন।

ক) ধ্রুপদ শৈলীর আধুনিকীকরণ

তানসেন বৈদিক যুগ থেকে চলে আসা জটিল ধ্রুপদ সঙ্গীতকে সহজ ও শ্রুতিমধুর করে তোলেন। তিনি সংস্কৃত ভাষার পাশাপাশি ব্রজবুলি ও হিন্দিতে গান রচনা শুরু করেন, যার ফলে সাধারণ মানুষের কাছে শাস্ত্রীয় সঙ্গীত সহজবোধ্য হয়ে ওঠে।

খ) সেনিয়া ঘরানার প্রতিষ্ঠা

তানসেনের বংশধর এবং শিষ্যদের মাধ্যমে গঠিত হয় বিখ্যাত ‘সেনিয়া ঘরানা’ (Senia Gharana)। ভারতের প্রায় সমস্ত বিখ্যাত সঙ্গীত ঘরানা নিজেদের শিকড় তানসেনের সেনিয়া ঐতিহ্যের সাথে যুক্ত করতে গর্ববোধ করে।

গ) রচিত বই ও সাহিত্য

সঙ্গীত তত্ত্বের ওপর তানসেন দুটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ রচনা করেছিলেন—

  • সঙ্গীত সার (Sangeeta Sara)
  • রাগমালা (Ragmala)

তার গানে হিন্দু দেব-দেবী (যেমন শিব, বিষ্ণু, গণেশ) এবং সম্রাট আকবরের প্রশংসাসূচক পদ সমানভাবে স্থান পেয়েছিল, যা তার নিরপেক্ষ ও উদার মানসিকতার পরিচয় দেয়।

৬. তানসেনের জীবন থেকে শিক্ষার্থীদের শিক্ষণীয় বিষয়

তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের জন্য তানসেনের জীবনী থেকে শেখার মতো অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে:

১. কঠোর অনুশীলন (Practice & Perseverance): সহজাত প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও তানসেন বছরের পর বছর গুরুর অধীনে থেকে কঠিন সাধনা করেছেন। সাফল্য পেতে কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই।

২. ঐক্য ও উদারতা: তিনি হিন্দু সংস্কৃতি ও সুফি দর্শনের এক অনন্য মিলন ঘটিয়েছিলেন। শিল্প ও জ্ঞান কখনো কোনো ধর্মের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকে না—তিনি তা প্রমাণ করে গেছেন।

৩. উদ্ভাবনী মানসিকতা (Innovation): প্রাচীন নিয়ম অন্ধভাবে অনুসরণ না করে তিনি সঙ্গীতের পুরনো রীতিনীতিকে আধুনিক ও মনোগ্রাহী করে তুলেছিলেন।

৭. প্রয়াণ ও স্মারক

১৫৮৯ খ্রিস্টাব্দে (মতান্তরে ১৫৮৬) এই মহান সুরসাধক মৃত্যুবরণ করেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী গোয়ালিয়রে তার সুফি গুরু মহম্মদ গাউসের সমাধির পাশেই তানসেনকে সমাধিস্থ করা হয়।

গ্লোয়ালিয়রে তানসেনের সমাধিসৌধের পাশে একটি বিখ্যাত তেঁতুল গাছ রয়েছে। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ওই গাছের পাতা খেলে নাকি কণ্ঠস্বর মিষ্টি ও সুরেলা হয়! আজও প্রতি বছর ডিসেম্বর মাসে গোয়ালিয়রে জাতীয় স্তরে ‘তানসেন সমারোহ’ (Tansen Samaroh) পালিত হয়, যেখানে সারা বিশ্বের শ্রেষ্ঠ সঙ্গীতশিল্পীরা তাকে শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন।

উপসংহার

মিঞা তানসেন কেবল মুঘল আমলের একজন সভাগায়ক ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতীয় সংস্কৃতি ও সঙ্গীতের ধারক ও বাহক। ইতিহাস যাকে এক অলৌকিক সুরের জাদুকর হিসেবে মনে রেখেছে, তার জীবন ও কাজ আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে। আজকের তরুণ প্রজন্মের উচিত ইতিহাস ও শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের এই মহা-নায়কদের অবদান সম্পর্কে জানা এবং ঐতিহ্যকে ধারণ করা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top