জগদীশ ভগবতী: ভারতের অর্থনীতিকে নতুন দিশা দেখানো অর্থনীতিবিদ

জগদীশ ভগবতী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন অর্থনীতির জগতে এক প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ। ১৯৯১ সালে ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারে তাঁর অবদান অসীম

জগদীশ ভগবতী
Photo courtesy: Johannes Jansson via wikicommons

ভারতের অর্থনীতির কথা উঠলেই আমরা সাধারণত ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক উদারীকরণ, তৎকালীন অর্থমন্ত্রী ড. মনমোহন সিং, প্রধানমন্ত্রী পি. ভি. নরসিমা রাও কিংবা ‘লাইসেন্স রাজ’-এর অবসানের কথা বলি। কিন্তু এই বিরাট পরিবর্তনের পিছনে শুধু রাজনীতিবিদ বা প্রশাসকদের ভূমিকা ছিল না। তাঁদের পাশাপাশি কিছু অর্থনীতিবিদও দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি প্রশ্ন তুলেছিলেন—ভারত কি নিজের অর্থনীতিকে এতটাই নিয়ন্ত্রণ করে রাখবে যে দেশের মানুষ ও শিল্প বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতার সুযোগই পাবে না?

এই প্রশ্নের অন্যতম শক্তিশালী কণ্ঠ ছিলেন জগদীশ ভগবতী

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন অর্থনীতির জগতে তিনি অত্যন্ত প্রভাবশালী একজন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ। তাঁর গবেষণা শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাসরুমে আটকে থাকেনি। ভারত কীভাবে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিল্প ও অর্থনৈতিক বৃদ্ধির পথে এগোতে পারে—এই বিতর্কেও তাঁর চিন্তার গভীর প্রভাব পড়েছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে তাঁর প্রজন্মের অন্যতম প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক বাণিজ্য তাত্ত্বিক হিসেবে বর্ণনা করেছে।

তবে একটা বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করে নেওয়া ভালো। ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের একমাত্র স্থপতি জগদীশ ভগবতী নন। অর্থনৈতিক সংস্কার ছিল বহু বছর ধরে চলা একটি প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে বহু অর্থনীতিবিদ, আমলা, রাজনীতিবিদ ও নীতিনির্ধারক যুক্ত ছিলেন। এমনকি সাম্প্রতিক গবেষণাও দেখায় যে ১৯৯১-এর পরিবর্তনের বীজ তার আগের দশকগুলোতেই তৈরি হচ্ছিল।

তাহলে ভগবতীর অবদান কোথায়? উত্তরটা বুঝতে হলে তাঁর জীবন, চিন্তা এবং ভারতের অর্থনৈতিক ইতিহাস—এই তিনটিকে একসঙ্গে দেখতে হবে।

জগদীশ ভগবতী কে?

জগদীশ নরায়ণ ভগবতীর জন্ম ভারতে। তিনি মুম্বইয়ের Sydenham College-এ পড়াশোনা করেন এবং পরে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও MIT-তে উচ্চশিক্ষা নেন। ১৯৬১ সালে অর্থনীতিতে গবেষণা শেষ করে তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং Indian Statistical Institute ও Delhi School of Economics-এ শিক্ষকতা করেন। পরে MIT এবং Columbia University-তে তাঁর দীর্ঘ ও উজ্জ্বল অধ্যাপনা-জীবন গড়ে ওঠে।

আজ তিনি Columbia University-এর University Professor Emeritus হিসেবে পরিচিত। আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, উন্নয়ন অর্থনীতি, বিদেশি সাহায্য, অভিবাসন ও বিশ্বায়ন নিয়ে তাঁর গবেষণা তাঁকে আন্তর্জাতিক অর্থনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চিন্তাবিদে পরিণত করেছে।

ভারত সরকারের কাছ থেকেও তিনি পদ্মবিভূষণ সম্মান পেয়েছেন। জাপান সরকারও তাঁকে Order of the Rising Sun, Gold and Silver Star সম্মানে ভূষিত করেছে। কিন্তু পুরস্কার দিয়ে তাঁর গুরুত্ব বোঝা যায় না। তাঁর আসল শক্তি ছিল—অর্থনৈতিক নীতিকে সাধারণ মানুষের জীবন ও দেশের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের সঙ্গে যুক্ত করে দেখা।

স্বাধীনতার পর ভারতের অর্থনীতি কেমন ছিল?

আজকের তরুণ প্রজন্মের কাছে একটা বিষয় কল্পনা করা কঠিন—একসময় ভারতে ব্যবসা শুরু করা, শিল্পের উৎপাদন বাড়ানো, আমদানি করা কিংবা বিদেশি বিনিয়োগ আনা এত সহজ ছিল না।

স্বাধীনতার পর ভারত একটি পরিকল্পিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার দিকে এগিয়েছিল। রাষ্ট্রের হাতে ছিল অর্থনীতির বড় অংশের নিয়ন্ত্রণ। দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করতে উচ্চ আমদানি শুল্ক ও নানা ধরনের আমদানি নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করা হতো।

শিল্পক্ষেত্রেও ছিল নানা লাইসেন্স ও অনুমতির ব্যবস্থা। পরবর্তী সময়ে এই ব্যবস্থাই জনপ্রিয়ভাবে ‘License Raj’ নামে পরিচিত হয়।

সমস্যাটা কোথায় ছিল?

একটি উদাহরণ ভাবুন। আপনি একটি কারখানা খুলতে চান। আপনার কাছে পুঁজি আছে, ব্যবসার পরিকল্পনা আছে, বাজারের চাহিদাও আছে। কিন্তু উৎপাদন কতটা করবেন, কী তৈরি করবেন, কোন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করবেন—এসব ক্ষেত্রেই যদি সরকারের অসংখ্য অনুমতির প্রয়োজন হয়, তাহলে ব্যবসা দ্রুত বাড়ানো কঠিন।

ভগবতী এবং তাঁর মতো উদারীকরণপন্থী অর্থনীতিবিদরা মনে করতেন, বাজারের উপর অতি মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ উৎপাদনশীলতা ও প্রতিযোগিতাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এই চিন্তাই পরে ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের অন্যতম বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি তৈরি করে।

ভগবতীর সবচেয়ে বড় অবদান: ‘বাণিজ্য’কে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে দেখা

জগদীশ ভগবতীর নাম শুনলেই যে বিষয়টি সবচেয়ে আগে মনে আসে, তা হলো Free Trade বা মুক্ত বাণিজ্য

সহজ করে বললে, তাঁর যুক্তি ছিল—একটি দেশ সবকিছু নিজে তৈরি করতে গেলে সবসময় সবচেয়ে দক্ষ ফল পাওয়া যায় না। ধরুন, ভারত একটি নির্দিষ্ট পণ্য কম খরচে এবং ভালো মানে তৈরি করতে পারে। অন্যদিকে অন্য কোনো দেশ এমন একটি পণ্য তুলনামূলকভাবে দক্ষতার সঙ্গে তৈরি করতে পারে যা ভারতে তৈরি করতে বেশি খরচ হয়। তাহলে দুই দেশ যদি বাণিজ্য করে, দু’দেশই লাভবান হতে পারে।

অর্থনীতির ভাষায় এটি comparative advantage-এর ধারণার সঙ্গে যুক্ত।

ভগবতীর গবেষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের এই ধরনের প্রশ্নকে আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছে। তাঁর কাজ দেখিয়েছে যে বাণিজ্যনীতি শুধু আমদানি-রপ্তানির হিসাব নয়; এটি উৎপাদন, আয়, কর্মসংস্থান এবং সাধারণ মানুষের কল্যাণের সঙ্গেও যুক্ত। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর গবেষণা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও উন্নয়ন অর্থনীতির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে এবং তিনি মুক্ত বাণিজ্যের একজন দীর্ঘদিনের প্রবক্তা।

আরও পড়ুন :- মেঘনাদ সাহা নক্ষত্রলোকের আলো ও এক অপরাজিত বিজ্ঞান-পথিক

ভারতকে ‘বন্ধ অর্থনীতি’ থেকে বের করে আনার বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াই

এখানেই ভগবতীর ভারতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্ব। ১৯৯১ সালে ভারত যখন গভীর অর্থনৈতিক সংকটে পড়ল, তখন দেশের অর্থনৈতিক নীতিতে বড় পরিবর্তন শুরু হয়। আমদানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, শিল্পক্ষেত্রে লাইসেন্স কমানো, বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানো এবং বাণিজ্য উদারীকরণের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে এই পরিবর্তনকে ভারতের অর্থনীতির একটি turning point হিসেবে দেখা হয়।

ভগবতী বহু বছর ধরে ভারতের অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষাবাদী বাণিজ্যনীতির সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর ১৯৯৩ সালের বই India in Transition: Freeing the Economy-তে ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা ছিল। তাঁর গবেষণা ও লেখালেখি ভারতের অর্থনৈতিক সংস্কারের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি তৈরি করেছিল।

তবে এখানে ইতিহাসকে একটু সাবধানে দেখা জরুরি।

১৯৯১ সালের সংস্কার শুধু ভগবতীর চিন্তার ফল ছিল না। আর্থিক সংকট, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, প্রশাসনিক উদ্যোগ এবং বহু অর্থনীতিবিদের কাজ—সব মিলিয়েই সেই পরিবর্তন সম্ভব হয়েছিল। ১৯৯১-এর সংস্কারের দীর্ঘ পথ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাতেও দেখা যায় যে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া বহু আগে শুরু হয়েছিল এবং বিভিন্ন নীতিগত ও রাজনৈতিক কারণ এতে ভূমিকা রেখেছিল। তাই তাঁকে বলা বেশি সঠিক—ভারতের অর্থনৈতিক উদারীকরণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক প্রবক্তা।

‘Growth’ কেন এত গুরুত্বপূর্ণ—এই প্রশ্নে ভগবতীর উত্তর

আজ আমরা GDP, economic growth, per capita income—এসব শব্দ খুব সহজেই শুনি। কিন্তু একটা সময় উন্নয়ন নিয়ে বড় বিতর্ক ছিল। শুধু অর্থনৈতিক বৃদ্ধি কি সত্যিই দরিদ্র মানুষের উপকার করে? ভগবতীর উত্তর ছিল—হ্যাঁ, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; তবে বৃদ্ধির সুফল মানুষের কাছে পৌঁছানোর জন্য সঠিক নীতি দরকার।

অর্থনৈতিক বৃদ্ধি হলে সরকারের রাজস্ব বাড়তে পারে। নতুন শিল্প তৈরি হতে পারে। কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। মানুষের আয় বাড়তে পারে। আর এই বাড়তি সম্পদ ব্যবহার করে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার মতো ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করা সম্ভব।

এই চিন্তাই তিনি এবং তাঁর সহলেখক অর্থনীতিবিদ অরবিন্দ পানাগারিয়া তাঁদের বিখ্যাত বই Why Growth Matters: How Economic Growth in India Reduced Poverty and the Lessons for Other Developing Countries-এ বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।

তাঁদের বিশ্লেষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল—ভারতে ১৯৯০-এর দশকের পর অর্থনৈতিক সংস্কার ও দ্রুততর বৃদ্ধির সঙ্গে দারিদ্র্য হ্রাসের সম্পর্ক ছিল। অর্থাৎ, ‘বৃদ্ধি’ আর ‘দারিদ্র্য দূরীকরণ’কে তাঁরা পরস্পরের শত্রু হিসেবে দেখেননি।

কিন্তু ভগবতী কি শুধু ‘বাজারের’ কথা বলেছেন?

এখানে একটা ভুল ধারণা ভাঙা দরকার। ভগবতীকে অনেক সময় শুধু free-market economist হিসেবে দেখানো হয়। কিন্তু তাঁর কাজ অনেক বেশি বিস্তৃত। তিনি জোর দিয়েছেন এমন অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর যেখানে বৃদ্ধি তৈরি হবে এবং সেই বৃদ্ধিকে ব্যবহার করে মানুষের জীবনযাত্রার উন্নতি করা যাবে।

তাঁর নিজের বিশ্লেষণেও ভারতের বৃদ্ধির সীমাবদ্ধতা নিয়ে আলোচনা আছে। বিশেষ করে তিনি মনে করেছেন, ভারতের শিল্পায়ন অনেক ক্ষেত্রে শ্রমনির্ভর না হয়ে skill-intensive ও capital-intensive পথে বেশি এগিয়েছে। এর ফলে পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের তুলনায় দরিদ্র ও কম দক্ষ শ্রমিকদের জন্য মজুরি বৃদ্ধির সুযোগ তুলনামূলকভাবে কম হয়েছে। অর্থাৎ তাঁর বক্তব্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল—শুধু GDP বাড়লেই হবে না; এমন বাজার ও নীতি দরকার যা বেশি মানুষের জন্য ভালো কাজের সুযোগ তৈরি করে।

শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সুরক্ষার সঙ্গে অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সম্পর্ক

সামাজিক সুরক্ষা
Photo courtesy

ভগবতীর চিন্তায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তিনি মনে করতেন, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি সরকারের হাতে এমন সম্পদ তৈরি করতে পারে, যা পরে দরিদ্র মানুষের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক কর্মসূচিতে ব্যবহার করা সম্ভব। এখানে তাঁর চিন্তার একটি সুন্দর ভারসাম্য দেখা যায়। একদিকে তিনি বাজার, বিনিয়োগ ও বাণিজ্যের গুরুত্ব বোঝাচ্ছেন।

অন্যদিকে তিনি বলছেন—রাষ্ট্রের সামাজিক দায়িত্বও গুরুত্বপূর্ণ। এই কারণেই তাঁর চিন্তাকে শুধু ‘সরকার বনাম বাজার’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টা বোঝা যায় না। বরং তাঁর মডেলকে সহজ ভাষায় বলা যায়— বৃদ্ধি তৈরি করো → সম্পদ তৈরি করো → সেই সম্পদ ব্যবহার করে মানুষের সক্ষমতা বাড়াও।

বিদেশি বিনিয়োগ নিয়ে তাঁর অবস্থান

ভারত একসময় বিদেশি বিনিয়োগকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে দেখত। কিন্তু ভগবতী মনে করতেন, বিদেশি বিনিয়োগ সঠিক নীতির মধ্যে পরিচালিত হলে তা মূলধন, প্রযুক্তি, দক্ষতা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগ বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।

১৯৯১ সালের পর ভারতের অর্থনীতি ধীরে ধীরে বিদেশি বিনিয়োগ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য আরও উন্মুক্ত হয়। Columbia University-এর গবেষণা ও প্রকাশনায় উল্লেখ করা হয়েছে যে সংস্কারের পর ভারতে বিদেশি বিনিয়োগের ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটে এবং টেলিকম, বিমান পরিবহণ ও অটোমোবাইলের মতো ক্ষেত্র দ্রুত প্রসারিত হয়। একই সঙ্গে ১৯৯১-এর পর ভারতের trade-to-GDP ratio উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছিল।

আজ আমরা যখন বিদেশি মোবাইল ব্র্যান্ড, আন্তর্জাতিক গাড়ি কোম্পানি, global supply chain কিংবা multinational service company নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে কথা বলি, তখন মনে রাখা দরকার—এই আন্তর্জাতিক সংযোগ একদিনে তৈরি হয়নি।

‘Protectionism’-এর বিরুদ্ধে কেন ছিলেন তিনি?

মুক্ত বাণিজ্য
Photo courtesy

Protectionism বা সুরক্ষাবাদ মানে সাধারণভাবে দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে রক্ষা করার জন্য আমদানি শুল্ক বা অন্যান্য বাধা ব্যবহার করা। স্বাধীনতার পর ভারতের নীতিতে এর গুরুত্ব ছিল। এর পিছনে যুক্তিও ছিল—দেশীয় শিল্পকে যদি শুরুতেই বিদেশি বড় কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে হয়, তাহলে নবজাত শিল্প হয়তো টিকতে পারবে না।

কিন্তু সমস্যা হয় যখন অস্থায়ী সুরক্ষা দীর্ঘস্থায়ী হয়ে যায়।

তখন দেশীয় কোম্পানির উপর প্রতিযোগিতার চাপ কমে যেতে পারে। উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর তাগিদ কমতে পারে। পণ্যের দাম বেশি হতে পারে এবং প্রযুক্তিগত উন্নতি ধীর হতে পারে। ভগবতী এই ধরনের দীর্ঘস্থায়ী সুরক্ষাবাদের সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর বিখ্যাত বই Protectionism আন্তর্জাতিক বাণিজ্যনীতির এই প্রশ্নকে বিশ্লেষণ করেছে।

বিশ্বায়ন নিয়ে তাঁর অবস্থান

বিশ্বায়ন নিয়ে আজও বিতর্ক আছে। একদল মনে করেন globalisation মানুষের সুযোগ বাড়ায়। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলেন, বিশ্বায়নের সুফল সবাই সমানভাবে পায় না এবং কিছু মানুষের চাকরি ও আয়ের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

ভগবতী বিশ্বায়নের পক্ষে শক্তিশালী যুক্তি দিয়েছেন। তাঁর ২০০৪ সালের বই In Defense of Globalization বিশ্বায়নের পক্ষে তাঁর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে এর অর্থ এই নয় যে তিনি পৃথিবীর সমস্ত অর্থনৈতিক সমস্যার একমাত্র সমাধান হিসেবে মুক্ত বাণিজ্যকে দেখেছেন। বরং তাঁর চিন্তার বড় শিক্ষা হলো—নীতির ফলাফলকে তথ্য দিয়ে বিচার করতে হবে।

কোনো নীতি ‘বাজারপন্থী’ বা ‘রাষ্ট্রপন্থী’—এই পরিচয় দিয়ে তার সাফল্য বিচার করা উচিত নয়। দেখতে হবে, সেটি মানুষের জীবনকে বাস্তবে কতটা উন্নত করছে।

আরও পড়ুন :- এ পি জে আব্দুল কালাম, মহান ভারতীয় বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপতি

ভারতীয় অর্থনীতিতে তাঁর বইগুলোর গুরুত্ব

জগদীশ ভগবতীর অবদান শুধু গবেষণাপত্রে নয়। তাঁর বইগুলোও অর্থনৈতিক চিন্তার জগতে বড় প্রভাব ফেলেছে।

উল্লেখযোগ্য কয়েকটি বই হলো—

  • The Economics of Underdeveloped Countries
  • India in Transition: Freeing the Economy
  • Protectionism
  • Free Trade Today
  • In Defense of Globalization
  • Why Growth Matters — অরবিন্দ পানাগারিয়ার সঙ্গে
  • India’s Reforms: How They Produced Inclusive Growth — অরবিন্দ পানাগারিয়ার সঙ্গে

বিশেষ করে ভারতের সংস্কার নিয়ে তাঁর এবং পানাগারিয়ার কাজ ১৯৯১-পরবর্তী অর্থনীতির পরিবর্তন, বৃদ্ধি, দারিদ্র্য এবং বৈষম্য নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে।

তাঁর সঙ্গে দ্বিমতও আছে—এটাই গণতান্ত্রিক অর্থনীতির সৌন্দর্য

একজন মহান অর্থনীতিবিদকে সম্মান করার অর্থ তাঁর প্রতিটি বক্তব্য মেনে নেওয়া নয়। ভগবতীর ‘growth first’ বা দ্রুত অর্থনৈতিক বৃদ্ধির উপর জোর দেওয়া নিয়ে অর্থনীতির জগতে বিতর্ক রয়েছে। কেউ মনে করেন, বৃদ্ধির সুফল স্বয়ংক্রিয়ভাবে সমাজের সব স্তরে সমানভাবে পৌঁছায় না। ভারতের ক্ষেত্রে অসমতা, কর্মসংস্থানের গুণমান, কৃষি, শ্রমবাজার ও সামাজিক সুরক্ষা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। এই বিতর্ক আসলে গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ অর্থনীতি কোনো পরীক্ষাগারের যন্ত্র নয়। এখানে মানুষের জীবন জড়িয়ে থাকে। তাই ভগবতীর অবদান বোঝার সঠিক উপায় হলো—তাঁর বক্তব্য পড়া, তথ্য দেখা, তাঁর সমালোচকদের বক্তব্যও পড়া এবং তারপর নিজের সিদ্ধান্ত তৈরি করা।

ভারতের তরুণ প্রজন্মের কাছে ভগবতী কেন গুরুত্বপূর্ণ?

এখানেই সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আজকের একজন তরুণ হয়তো ভাবতে পারে—একজন অর্থনীতিবিদের এত গুরুত্ব কেন? কারণ আজ আমরা যে ভারতকে দেখি, তার সঙ্গে তাঁর আলোচনার অনেক বিষয় সরাসরি যুক্ত।

আপনি অনলাইনে বিদেশি পণ্য কিনছেন। কোনো ভারতীয় startup বিদেশি বাজারে পরিষেবা বিক্রি করছে। ভারতে multinational company কারখানা করছে। একজন ভারতীয় software professional বিদেশি কোম্পানির জন্য কাজ করছেন। ভারতের কোনো শিল্প সংস্থা আন্তর্জাতিক supply chain-এর অংশ হচ্ছে। এসবের পিছনে রয়েছে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিযোগিতা, দক্ষতা ও বিশ্ব অর্থনীতির সঙ্গে সংযোগ—যে বিষয়গুলো নিয়ে ভগবতী কয়েক দশক ধরে কাজ করেছেন।

আজকের তরুণদের কাছে তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হতে পারে—

অর্থনীতি শুধু টাকার হিসাব নয়; অর্থনীতি আসলে সুযোগ তৈরি করার বিজ্ঞান।

ভগবতীর জীবন থেকে আরও একটি বড় শিক্ষা

জগদীশ ভগবতীর জীবন আমাদের আরেকটি কথা শেখায়—বিশ্বমানের চিন্তাবিদ হওয়া মানেই নিজের দেশের সমস্যাকে ভুলে যাওয়া নয়। তিনি আন্তর্জাতিক অর্থনীতির শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করেছেন। GATT, WTO, United Nations-এর মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর বিভিন্ন সময়ে নীতিগত কাজের সম্পর্ক ছিল।

কিন্তু ভারতের অর্থনীতি তাঁর চিন্তার একটি বড় ক্ষেত্র হয়ে থেকেছে। তাঁর কাজের মাধ্যমে ভারতীয় অর্থনীতির সমস্যাগুলো আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক আলোচনার অংশ হয়েছে। এটাই একজন সত্যিকারের intellectual-এর শক্তি।

শেষ কথা: ভগবতীকে শুধু ‘উদারীকরণের সমর্থক’ হিসেবে দেখবেন না

জগদীশ ভগবতীর অবদানকে যদি এক লাইনে বলতে হয়, তাহলে বলা যায়—

তিনি ভারতকে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবাহের সঙ্গে আরও গভীরভাবে যুক্ত করার পক্ষে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি তৈরি করেছিলেন।

তিনি দেখিয়েছেন, বাণিজ্য কেবল বিদেশে পণ্য বিক্রি করার বিষয় নয়। এটি উৎপাদনশীলতা, প্রতিযোগিতা, প্রযুক্তি, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ের সঙ্গে যুক্ত। তিনি মনে করিয়ে দিয়েছেন, অর্থনৈতিক বৃদ্ধি দরিদ্র মানুষের জীবন উন্নত করার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায় হতে পারে। আবার তাঁর নিজের গবেষণাতেও ভারতের সীমাবদ্ধতা—বিশেষত শ্রমনির্ভর শিল্পায়নের ঘাটতি—নিয়ে আলোচনা আছে। তাই জগদীশ ভগবতীর উত্তরাধিকারকে সবচেয়ে ভালোভাবে বোঝা যায় একটি প্রশ্নের মাধ্যমে:

“ভারত কীভাবে আরও দ্রুত বাড়বে—এটাই কি শেষ কথা, নাকি সেই বৃদ্ধির মাধ্যমে কীভাবে আরও বেশি মানুষকে ভালো সুযোগ দেওয়া যায়?” সম্ভবত তাঁর কাজের আসল মূল্য এখানেই।

আজকের প্রজন্মের কাছে তাঁর পরিচয় শুধু একজন বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ হিসেবে নয়। তিনি এমন একজন ভারতীয় চিন্তাবিদ, যিনি কয়েক দশক আগে এমন একটি ভারতের কথা ভাবতে শুরু করেছিলেন যে ভারত নিজের চারপাশে দেওয়াল তুলে নয়, বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে, শিখে এবং নিজের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যাবে।

আর এই কারণেই জগদীশ ভগবতীর গল্প শুধু অর্থনীতির গল্প নয়। এটি পরিবর্তনের সাহস, প্রতিষ্ঠিত ধারণাকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা এবং যুক্তির উপর বিশ্বাস রাখার গল্প। আজকের প্রজন্মের জন্য তাঁর সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো তাই খুব সহজ:

প্রশ্ন করতে শেখো। তথ্য দিয়ে উত্তর খুঁজে নাও। আর দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় করে ভাবতে কখনও ভয় পেয়ো না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top