কলেরার ইতিহাসে ড.শম্ভুনাথ দে’ র অবদান মানব কল্যাণে অসীম । ১৯৫৯ সালে কলেরা টক্সিন আবিষ্কার করে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন।

শম্ভুনাথ দে (১৯১৫-১৯৮৫) ভারতের একজন শ্রেষ্ঠ চিকিৎসক এবং গবেষক, যিনি কলেরা টক্সিন আবিষ্কার করে বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্যবিজ্ঞানে বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন। তাঁর জীবনী এবং অবদান যুবসমাজকে বিজ্ঞানের পথে অনুপ্রাণিত করে আজও।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা
শম্ভুনাথ দে ১৯১৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার গরিবতি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা দশরথি দে ছিলেন একজন সাধারণ ব্যবসায়ী, যিনি বন্যার কারণে পরিবারের অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর করে ফেলেন।
কাকা আশুতোষ দে-এর সহায়তায় তিনি গরিবতি হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন এবং জেলা স্কলারশিপ পান। হুগলি মহসিন কলেজে পড়াশোনা করে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এমবি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন ১৯৩৯ সালে।
১৯৪২ সালে ট্রপিক্যাল মেডিসিনে ডিপ্লোমা অর্জনের পর তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে যোগ দেন। অধ্যাপক এম এন দে-এর প্রভাবে তাঁর জীবাণুবিজ্ঞানে আগ্রহ জাগে এবং তাঁর কন্যা তরুণবালাকে বিয়ে করেন।
কর্মজীবনের শুরু
১৯৪২ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজের রোগবিদ্যা ও জীবাণুবিজ্ঞান বিভাগে প্রদর্শক হিসেবে যোগ দেন শম্ভুনাথ। অধ্যাপক বি পি ত্রিবেদীর অধীনে গবেষণা শুরু করেন এবং একাধিক পেপার প্রকাশ করেন।
১৯৪৭ সালে লন্ডনের ইউনিভার্সিটি কলেজ হাসপাতালে পিএইচডি করেন স্যার রয় ক্যামেরনের অধীনে। ১৯৪৯ সালে ফিরে এসে কলেরা গবেষণায় মনোনিবেশ করেন। ১৯৫৫ সালে নিউফিল্ড ফাউন্ডেশনের সাহায্যে ইংল্যান্ডে গিয়ে গবেষণা উপস্থাপন করেন।
কলকাতা মেডিকেল কলেজে রোগবিদ্যা ও জীবাণুবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যক্ষ হন এবং অবসরপ্রাপ্তি পর্যন্ত সেখানে কাজ করেন। কলকাতার কলেরা মহামারীর মধ্যে তাঁর গবেষণা ত্বরান্বিত হয়।
আরও পড়ুন : ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা – আধুনিক ভারতের বিজ্ঞানযুগের নির্মাতা
কলেরা টক্সিনের ঐতিহাসিক আবিষ্কার
১৮৮৪ সালে রবার্ট কোখ কলেরার জীবাণু ভাইব্রিও কলেরি আবিষ্কার করলেও তার সংক্রমণ পদ্ধতি অজানা ছিল। শম্ভুনাথ ১৯৫০-৬০ দশকে প্রমাণ করেন যে এই জীবাণু এন্টারোটক্সিন নিঃসরণ করে যা অন্ত্রে জল নির্গমন ঘটায়।
তিনি প্রথম খরগোশকে কলেরা মডেল হিসেবে ব্যবহার করেন, যা লাইগেড লুপ পরীক্ষায় সফল হয়। এতে প্রমাণিত হয় যে ডিহাইড্রেশনই কলেরার মূল কারণ। এই আবিষ্কার ওরাল রিহাইড্রেশন থেরাপির ভিত্তি স্থাপন করে।
১৯৫৯ সালে তাঁর গবেষণায় দেখান যে ভাইব্রিও কলেরি টক্সিন নিঃসৃত করে এবং এটি কলেরা ও ডায়রিয়ার চিকিৎসায় নতুন দিগন্ত খোলে। তাঁর কাজ বিশ্বব্যাপী কলেরা নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত হয়।

গবেষণার প্রভাব ও উপলব্ধি
শম্ভুনাথের কাজ কলেরার প্যাথোজেনেসিস বোঝায় এবং ভ্যাকসিন উন্নয়নে সাহায্য করে। তিনি ৩০টিরও বেশি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন এবং কলেরা মনোগ্রাফ লেখেন। নোবেল পুরস্কারের জন্য একাধিকবার মনোনীত হন কিন্তু পাননি।
১৯৭৮ সালে নোবেল সিম্পোজিয়ামে আহ্বানিত হন। তাঁর কাজ পাবলিক হেলথে মাইলফলক স্থাপন করে এবং ডায়রিয়াল ডিজিজের চিকিৎসা বিপ্লব ঘটায়। আজও ওআরএস (ওরাল রিহাইড্রেশন সল্ট) তাঁর আবিষ্কারের ফল।
কলকাতার মতো এন্ডেমিক এলাকায় তাঁর গবেষণা লক্ষাধিক জীবন রক্ষা করে। তিনি প্রমাণ করেন যে জীবাণু টক্সিন-মধ্যস্থ হয় এবং এটি নতুন থেরাপির পথ প্রশস্ত করে।
আরও পড়ুন : ভারতের ‘ওয়েদার উইম্যান’ অন্নামণি – এক অনুপ্রেরণামূলক গল্প
ব্যক্তিগত জীবন ও চ্যালেঞ্জ
সাধারণ পরিবার থেকে উঠে এসে শম্ভুনাথ দারিদ্র্য ও সংস্থানের অভাব মোকাবিলা করেন। তাঁর স্ত্রী তরুণবালা ও পরিবার তাঁর গবেষণায় সমর্থন দেন। কলেরা মহামারীর মধ্যে ল্যাবে কাজ করে তিনি নিজের জীবন ঝুঁকি নেন।
তিনি বাঙালি পরিবারের সদস্য ছিলেন এবং বিজ্ঞানকে ধর্মের উর্ধ্বে রাখতেন। অবসরের পরও গবেষণা চালিয়ে যান এবং ছাত্রদের প্রশিক্ষণ দেন।
ঐতিহ্য ও যুবদের জন্য অনুপ্রেরণা
শম্ভুনাথের জীবন দেখায় যে গ্রাম্য ভারত থেকেও বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী হওয়া সম্ভব। তাঁর অধ্যবসায় যুবকদের বিজ্ঞান গবেষণায় উৎসাহিত করে। কলেরা যেমন এশিয়ার মহামারী ছিল, তেমনি তাঁর কাজ বিশ্বকে মুক্ত করে।
আজকের যুবকরা তাঁর মতো চ্যালেঞ্জ মেনে বিজ্ঞানে অবদান রাখতে পারে। ভারতের মতো উন্নয়নশীল দেশে স্বাস্থ্য গবেষণা তাঁর আদর্শ অনুসরণ করে এগোবে। তাঁর জীবনী স্কুল কারিকুলামে অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত।
কলেরা গবেষণার তথ্যসমূহ
| বিষয় | বিবরণ | প্রভাব |
|---|---|---|
| জন্ম-মৃত্যু | ১৯১৫-১৯৮৫ | ৭০ বছরের জীবনকালে বিপ্লব। |
| মূল আবিষ্কার | কলেরা টক্সিন ও সংক্রমণ পদ্ধতি | ওআরএস চিকিৎসা। |
| মডেল | খরগোশ লাইগেড লুপ | প্রথম প্রাণী মডেল। |
| পুরস্কার | নোবেল মনোনয়ন | আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। |
| প্রকাশনা | ৩০+ পেপার | কলেরা মনোগ্রাফ। |
উপসংহার
শম্ভুনাথ দে ভারতীয় বিজ্ঞানের গৌরব, যাঁর কাজ লক্ষ লক্ষের জীবন রক্ষা করেছে। যুবসমাজ তাঁকে মেন্টর হিসেবে দেখে বিজ্ঞানের পথে এগোক। তাঁর জীবনী পড়ে অনুপ্রাণিত হোন এবং দেশের জন্য অবদান রাখুন।
Photo courtesy – বঙ্গদর্শন



