তেলকুপি পুরুলিয়া – দামোদরের জলে তলিয়ে যাওয়া এক মন্দির নগরী

তেলকুপি পুরুলিয়া এক সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতা, যা একদিন হঠাৎ করেই অতল জলের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। গ্রীক পুরাণের ‘আটলান্টিস’ বা ভারতের দ্বারকা নগরীর গল্প আমরা কম-বেশি সবাই জানি। আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বুকেই লুকিয়ে থাকা ঠিক এমনই এক ‘হারিয়ে যাওয়া মন্দির নগরী’।

তেলকুপি পুরুলিয়া
pic courtesy Amitabha Gupta – CC by 4.0 via wikicommons

গ্রীক পুরাণের ‘আটলান্টিস’ বা ভারতের দ্বারকা নগরীর গল্প আমরা কম-বেশি সবাই জানি। এক সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতা, যা একদিন হঠাৎ করেই অতল জলের নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি কি জানেন, আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বুকেই লুকিয়ে রয়েছে এমন এক ‘হারিয়ে যাওয়া মন্দির নগরী’?

পুরুলিয়া জেলার দামোদর নদের অববাহিকায় অবস্থিত তেলকুপি (Telkupi)। একে নির্দ্বিধায় বলা যায় ‘বাংলার আটলান্টিস’ (Atlantis of Bengal)। আজ থেকে প্রায় সাত দশক আগে, আধুনিক উন্নয়নের জোয়ারে এই ঐতিহাসিক জনপদটি চিরতরে তলিয়ে যায় পাঞ্চেত বাঁধের নীল জলরাশির নিচে। কিন্তু ইতিহাসকে কি এত সহজে মুছে ফেলা যায়? শীত বা শুকনো গরমে যখন দামোদরের জলস্তর কিছুটা নেমে যায়, তখন জলের বুক চিরে আজও মাথা চাড়া দিয়ে ওঠে প্রাচীন পাথরের দেউলের চূড়া।

আপনি যদি একজন ইতিহাসপ্রেমী হন, যিনি প্রাচীন স্থাপত্যের ধুলোবালি মাখা গল্প ভালোবাসেন, কিংবা আপনি যদি এমন একজন পর্যটক হন, যিনি চেনা ছকের বাইরে গিয়ে এক রোমাঞ্চকর অফবিট জায়গার সন্ধান করছেন—তবে পুরুলিয়ার তেলকুপি আপনার ভ্রমণ তালিকায় অবশ্যই থাকা উচিত। এই আর্টিকেলে আমরা বিস্তারিত আলোচনা করব তেলকুপির গৌরবময় ইতিহাস, তার সলিল সমাধির করুণ কাহিনী এবং কেন আজই আপনার এখানে ঘুরতে যাওয়া উচিত।

তেলকুপি কোথায় অবস্থিত? (Geographical Location)

ভৌগোলিক দিক থেকে তেলকুপি পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার রঘুনাথপুর মহকুমার অন্তর্গত। এটি বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র গড় পঞ্চকোট (Garh Panchakot) থেকে উত্তর-পশ্চিমে মাত্র ১০-১১ কিলোমিটার দূরে এবং চেলিয়ামা গ্রামের কাছে অবস্থিত।

বর্তমানে তেলকুপি বলতে কোনো নির্দিষ্ট গ্রামকে বোঝায় না, বরং পাঞ্চেত জলাধারের একটি বিস্তীর্ণ জলমগ্ন অঞ্চলকে বোঝায়। ১৯৫৬ সালের আগে পর্যন্ত এই অঞ্চলটি বিহারের মানভূম জেলার অংশ ছিল। পরে রাজ্য পুনর্গঠনের মাধ্যমে এটি পশ্চিমবঙ্গের পুরুলিয়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়।

তৈলকম্পী থেকে তেলকুপি: ইতিহাসের গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়

আজকের তেলকুপি যেখানে এক শান্ত, নির্জন জলাধার, আজ থেকে হাজার বছর আগে সেখানে ছিল এক ব্যস্ত কোলাহলময় নগরী। তেলকুপির প্রাচীন নাম ছিল ‘তৈলকম্পী’

১. রাজা রুদ্রশিখর ও রামচরিতম কাব্যের সংযোগ

একাদশ শতকে তৈলকম্পী ছিল এই অঞ্চলের অত্যন্ত শক্তিশালী স্থানীয় শাসক রুদ্রশিখরের রাজধানী। এই রাজবংশকে ‘শিখর বংশ’ বা পঞ্চকোটের রাজবংশ বলা হতো। বিখ্যাত কবি সন্ধ্যাকর নন্দী তাঁর ঐতিহাসিক মহাকাব্য ‘রামচরিতম’-এ এই রাজা রুদ্রশিখরের উল্লেখ করেছেন।

“সন্ধ্যাকর নন্দীর বিবরণ অনুযায়ী, পাল বংশের রাজা রামপাল যখন তাঁর হৃত রাজ্য ‘বরেন্দ্রভূমি’ উদ্ধার করার জন্য কৈবর্ত রাজা ভীমের বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন, তখন তৈলকম্পীর রাজা রুদ্রশিখর তাঁকে বিশাল সৈন্যবাহিনী দিয়ে সাহায্য করেছিলেন। কাব্যে রুদ্রশিখরকে বর্ণনা করা হয়েছে এমন এক বীর রাজা হিসেবে, যিনি দাবানলের মতো শত্রুকে ছারখার করতে পারতেন এবং অরণ্য ও পর্বতের শাসকদের অহংকার চূর্ণ করেছিলেন।”

ঐতিহাসিক নীহাররঞ্জন রায়ের মতে, রুদ্রশিখর আনুমানিক ১০৭০ থেকে ১১২০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে এই অঞ্চলে রাজত্ব করেছিলেন।

২. এক প্রাচীন বাণিজ্যিক বন্দর (Trade Hub)

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তৈলকম্পী বা তেলকুপি প্রাচীন বাংলায় এক গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছিল। দামোদর নদের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এই বন্দরটি জলপথে সরাসরি যুক্ত ছিল প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত বন্দর তাম্রলিপ্ত (অধুনা তমলুক)-এর সাথে। ছোটনাগপুর মালভূমির খনিজ, কাঠ এবং অন্যান্য সামগ্রী এই পথেই পরিবাহিত হতো।

এই বাণিজ্যিক সমৃদ্ধির কারণেই তৎকালীন ধনী ব্যবসায়ী বা ‘বণিক’ সম্প্রদায় (যাঁদের মধ্যে সিংহভাগ ছিলেন জৈন ধর্লম্বী) এখানে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করে একের পর এক চমৎকার মন্দির নির্মাণ করেছিলেন।

আরও পড়ুন – গৌরবের গল্পে মোড়া জনপদ গোবরডাঙ্গার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের এক মায়াবী সফর

জে. ডি. বেগলারের চোখে তেলকুপি: মন্দিরের স্বর্গরাজ্য

জে. ডি. বেগলার
picture source

১৮৭৮ খ্রিস্টাব্দে আর্মেণিয়ান-ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক এবং ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের (ASI) তদানীন্তন আধিকারিক জে. ডি. বেগলার (Joseph David Beglar) তেলকুপি পরিদর্শন করেন। তাঁর সেই ঐতিহাসিক রিপোর্টটি পড়লে বোঝা যায়, তেলকুপি ঠিক কতটা সমৃদ্ধ ছিল।

বেগলার তাঁর রিপোর্টে লিখেছিলেন:

“ছোটনাগপুর মালভূমি অঞ্চলের আর কোনো ছোট জায়গায় এত সুন্দর এবং এত বিপুল সংখ্যক পাথরের মন্দির একসঙ্গে দেখা যায় না।”

বেগলার তেলকুপির মন্দিরগুলিকে মূলত তিনটি প্রধান ক্লাস্টারে বা গুচ্ছে ভাগ করেছিলেন:

মন্দিরের গুচ্ছ (Clusters)অবস্থানবৈশিষ্ট্য
প্রথম গুচ্ছ (বড় দল)তেলকুপি গ্রামের উত্তরে, দামোদরের একেবারে তীরে।এখানে প্রায় ১৩টি পাথরের তৈরি রেখ দেউল ছিল। স্থানীয়ভাবে একে ‘ভৈরবথান’ বলা হতো। এখানে শিবলিঙ্গ, গনেশ ও বিষ্ণুর মূর্তি ছিল।
দ্বিতীয় গুচ্ছগ্রামের পশ্চিম দিকে।এখানে প্রায় ৬টি মন্দির এবং প্রচুর ছড়ানো-ছিটানো পাথরের ভাস্কর্য ছিল।
তৃতীয় গুচ্ছগ্রামের দক্ষিণ-পূর্ব অংশে।এখানে ৩টি বড় মন্দির এবং একটি ইটের ঢিবি ছিল, যা দেখে বেগলার এটিকে কোনো প্রাচীন বৌদ্ধ বা জৈন মঠ (Monastery) বলে অনুমান করেছিলেন।

ঐতিহাসিকদের মতে, তেলকুপিতে হিন্দু (শৈব, বৈষ্ণব, শাক্ত) এবং জৈন ধর্মের এক অপূর্ব মিশ্রণ ঘটেছিল। এখানকার রেখ দেউলগুলির স্থাপত্যশৈলী উড়িষ্যার ভুবনেশ্বরের মন্দিরগুলির সাথে অনেকটাই সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল।

দামোদরের পেটে সলিল সমাধি: পাঞ্চেত বাঁধের ট্র্যাজেডি

তাহলে কীভাবে এই মন্দিরের নগরী আজ জলের নিচে? এর পেছনে রয়েছে স্বাধীন ভারতের এক আধুনিক উন্নয়ন প্রকল্প।

১৯৫০-এর দশকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন (DVC) ধানবাদ ও পুরুলিয়ার সীমান্তে দামোদর নদের ওপর পাঞ্চেত বাঁধ (Panchet Dam) নির্মাণের পরিকল্পনা করে। এই বাঁধের জলাধারের ক্যাচমেন্ট এরিয়ার মধ্যেই পড়ে যায় ঐতিহাসিক তেলকুপি গ্রাম।

১৯৫৭: পাঞ্চেত বাঁধের নির্মাণ শুরু হয়। স্থানীয় মানুষ ও পশ্চিমবঙ্গ সরকার মন্দিরগুলি স্থানান্তরের জন্য ASI-কে অনুরোধ করে।

১৯৫৯ (ফেব্রুয়ারি): প্রখ্যাত প্রত্নতাত্ত্বিক দেবলা মিত্র (Debala Mitra) তেলকুপি পরিদর্শনে যান। তিনি দেখেন বেশিরভাগ মন্দির ইতিমধ্যে জলমগ্ন।

১৯৬০ (জুন): জলস্তর কিছুটা কমলে দেবলা মিত্র মাত্র ৩টি মন্দির অক্ষত অবস্থায় দেখতে পান। বাকিগুলি জলের তোড়ে ভেঙে পড়েছিল।

বর্তমান: তেলকুপির ২০টিরও বেশি মন্দির চিরতরে দামোদরের গর্ভে লীন হয়ে গেছে। মাত্র দুটি মন্দিরের চূড়া আজও টিকে রয়েছে।

প্রত্নতাত্ত্বিক দেবলা মিত্র তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘Telkupi – a submerged temple-site in West Bengal’—এ এই সলিল সমাধির করুণ বিবরণ অত্যন্ত মর্মস্পর্শীভাবে তুলে ধরেছেন। উপযুক্ত প্রযুক্তির অভাব এবং দ্রুত জল বেড়ে যাওয়ার কারণে এই অমূল্য জাতীয় ঐতিহ্যকে রক্ষা করা সম্ভব হয়নি।

আরও পড়ুন – বর্ধমান রাজবংশের মহাকাব্য: ইতিহাস, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের এক অমর উপাখ্যান

পর্যটকদের জন্য কেন অনন্য তেলকুপি? (Worth Visiting)

বাংলার আটলান্টিস
pic courtesy: Joseph David Beglar – CC by 4.0 via wikicommons

আপনি হয়তো ভাবছেন, যে জায়গা জলের নিচে তলিয়ে গেছে, সেখানে দেখার কী আছে? এখানেই রয়েছে তেলকুপির আসল ম্যাজিক। একজন পর্যটক ও ইতিহাসপ্রেমীর কাছে তেলকুপি কেন আজও অত্যন্ত আকর্ষণীয়, তার কারণগুলি নিচে দেওয়া হলো:

১. জলের বুক চিরে জেগে ওঠা দেউলের চূড়া

তেলকুপির মূল আকর্ষণ হলো দামোদরের নীল জলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা দুটি প্রাচীন মন্দিরের চূড়া বা শিখর। বছরের বেশিরভাগ সময় এগুলি আংশিক বা পূর্ণ ডুবন্ত থাকে। কিন্তু শীতকালে (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) এবং গ্রীষ্মের শুরুতে (মে-জুন) যখন জলাধারের জল কমে যায়, তখন এই প্রাচীন রেখ দেউল দুটি তার সমস্ত রহস্য নিয়ে জলের ওপর ভেসে ওঠে।

২. নৌকা বিহার এবং অফবিট রোমাঞ্চ

পাঞ্চেত জলাধারের তীরে এসে আপনি স্থানীয় মৎস্যজীবীদের নৌকা ভাড়া করতে পারেন। শান্ত জলের বুক চিরে যখন আপনার নৌকা এগিয়ে যাবে এবং আপনি একদম কাছ থেকে জলের নিচে ডুবে থাকা মন্দিরের পাথরের দেওয়ালগুলি দেখতে পাবেন, সেই অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। এটি আপনাকে এক অদ্ভুত নস্টালজিয়া এবং রোমাঞ্চের আমেজ দেবে।

৩. দুর্দান্ত ফটোগ্রাফি স্পট

ফটোগ্রাফারদের জন্য তেলকুপি একটি স্বর্গরাজ্য। বিশেষ করে সূর্যোদয় বা সূর্যাস্তের সময় যখন হালকা কুয়াশায় ঢাকা দামোদরের জলের ওপর মন্দিরের চূড়ার প্রতিফলন পড়ে, তখন ক্যামেরায় বন্দি হয় এক অলৌকিক দৃশ্য।

৪. ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষের অন্বেষণ

জলাধারের আশেপাশের শুকনো জমিতে বা চেলিয়ামা গ্রামের দিকে আজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে প্রাচীন আমলকি, দ্বারশাখা, এবং জৈন তীর্থঙ্করদের ভাঙা মূর্তি। ইতিহাসপ্রেমীরা এখানে এসে অনায়াসেই হারিয়ে যেতে পারেন একাদশ শতকের বাংলায়।

তেলকুপির আশেপাশের দর্শনীয় স্থান (Garh Panchakot Circuit)

আপনি যদি তেলকুপি ভ্রমণের পরিকল্পনা করেন, তবে এর আশেপাশের এই জায়গাগুলিকেও আপনার ট্যুর প্ল্যানে যুক্ত করে নিতে পারেন:

  • গড় পঞ্চকোট (Garh Panchakot): তেলকুপি থেকে মাত্র ১০ কিমি দূরে পঞ্চকোট পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এক ঐতিহাসিক দুর্গনগরী। এখানে বর্গী আক্রমণের ধ্বংসাবশেষ এবং পঞ্চরত্ন মন্দির দেখার মতো।
  • বান্দা দেউল (Banda Deul): রঘুনাথপুর অঞ্চলেই অবস্থিত বান্দা দেউল পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম সেরা এবং সম্পূর্ণ অক্ষত রেখ দেউল। এর পাথরের খোদাই কার্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম।
  • বড়ন্তি (Baranti): পাহাড় আর হ্রদে ঘেরা এক শান্ত আদিবাসী গ্রাম। যারা প্রকৃতির কোলে দু-দিন শান্তিতে কাটাতে চান, তাদের জন্য আদর্শ।
  • চেলিয়ামা (Cheliama): তেলকুপির কাছেই অবস্থিত এই গ্রাম চেলিয়ামা’তে রয়েছে রাধাবিনোদ মন্দির, যা তার পোড়ামাটির (Terracotta) কাজের জন্য বিখ্যাত।

ভ্রমণ নির্দেশিকা: কীভাবে যাবেন তেলকুপি?

তেলকুপি পৌঁছানো এখন বেশ সহজ, কারণ এটি পুরুলিয়ার মূল পর্যটন সার্কিটের সাথেই যুক্ত।

১. ট্রেনে (By Train)

কলকাতা (হাওড়া/শিয়ালদহ/চিত্রপুর) থেকে আসানসোলগামী যেকোনো ট্রেনে উঠে পড়ুন। আসানসোল স্টেশনে নেমে সেখান থেকে গাড়ি ভাড়া করে পাঞ্চেত বাঁধ হয়ে তেলকুপি পৌঁছানো যায় (দূরত্ব প্রায় ৩৫ কিমি)। অথবা আপনি আদ্রা (Adra) বা কুমারডুবি (Kumardhubi) স্টেশনেও নামতে পারেন, সেখান থেকেও তেলকুপি কাছাকাছি হয়।

২. সড়কপথে (By Road)

কলকাতা থেকে নিজের গাড়ি বা বাইকে আসতে চাইলে দুর্গাপুর এক্সপ্রেসওয়ে (NH 19) ধরে আসানসোল হয়ে নিয়ামতপুর মোড় দিয়ে পাঞ্চেত ড্যামের রাস্তায় চলে আসুন। কলকাতা থেকে দূরত্ব প্রায় ২৫০ কিলোমিটার।

আরও পড়ুন – দীঘার ইতিহাস: অজানা ‘বীরকুল’ থেকে প্রাচ্যের ‘ব্রাইটন’ হয়ে ওঠার গল্প

তেলকুপি ভ্রমণের সেরা সময় (Best Time to Visit)

যদিও পুরুলিয়া মানুষ সাধারণত শীতকালে যান, তবে তেলকুপির ক্ষেত্রে বিষয়টি একটু আলাদা:

  • নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি (শীতকাল): আবহাওয়া খুব মনোরম থাকে। পাঞ্চেত জলাধারে প্রচুর পরিযায়ী পাখি আসে। এই সময় মন্দিরের চূড়া আংশিক দেখা যায়। পর্যটনের জন্য এটিই সেরা সময়।
  • মে থেকে জুন (গ্রীষ্মকাল): অত্যন্ত গরম হলেও, এই সময় পাঞ্চেতের জলস্তর সর্বনিম্ন থাকে। ফলে ডুবে থাকা মন্দিরের সিংহভাগ জল থেকে বেরিয়ে আসে। স্থাপত্যটি ভালোভাবে দেখতে চাইলে এই সময় যাওয়া যেতে পারে।

জরুরি টিপস: তেলকুপিতে সরাসরি থাকার কোনো হোটেল নেই। আপনাকে গড় পঞ্চকোট, বড়ন্তি অথবা রঘুনাথপুর শহরের কোনো রিসোর্ট বা হোটেলে থাকতে হবে। সেখান থেকে ডে-ট্রিপ (Day Trip) হিসেবে তেলকুপি পুরুলিয়া ঘুরে নেওয়া সবচেয়ে ভালো বিকল্প। জলের ওপর নৌকায় ওঠার সময় অবশ্যই লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করবেন।

উপসংহার: ইতিহাস ও প্রকৃতির এক করুণ কোলাজ

পুরুলিয়ার তেলকুপি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র নয়, এটি একটি নীরব সাক্ষী—কীভাবে আধুনিক মানুষের অগ্রগতির প্রয়োজনে আমাদের অতীত সভ্যতাকে বলিদান দিতে হয়েছে। দামোদরের শান্ত জলরাশির দিকে তাকিয়ে থাকলে মনে হয়, জলের নিচের ওই প্রাচীন পাথরগুলো যেন আজও একাদশ শতকের তৈলকম্পীর গল্প ফিসফিস করে বলে চলেছে।

পরের বার যখন পুরুলিয়া ভ্রমণের ছক কষবেন, তখন অযোধ্যা পাহাড়ের চেনা রুট ছেড়ে একবেলার জন্য চলে আসুন রঘুনাথপুরের এই অফবিট ঠিকানায়। এই ‘বাংলার আটলান্টিস’ আপনাকে হতাশ করবে না, বরং আপনার মনে এক দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাসের ঘোর তৈরি করে দিয়ে যাবে।

আপনার কি তেলকুপি পুরুলিয়া নিয়ে কোনো প্রশ্ন আছে বা আপনি কি আগে এখানে গেছেন? নিচে কমেন্ট করে আমাদের জানান!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top