হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের রানী লিলিওকালানি তাঁর আত্মত্যাগ ও দীর্ঘ লড়াই সত্ত্বেও কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার স্বকীয়তা হারিয়েছিল।

হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের নাম শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে নীল সমুদ্র, সার্ফিং আর পর্যটনের এক স্বর্গরাজ্য। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ লড়াই, আত্মত্যাগ এবং এক মহীয়সী নারীর গল্প। তিনি হলেন রানী লিলিওকালানি (Queen Liliʻuokalani)—হাওয়াই সাম্রাজ্যের শেষ সার্বভৌম শাসক।
এই নিবন্ধে আমরা আলোচনা করব প্রশান্ত মহাসাগরের এই অদম্য নেত্রীর জীবন, তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম এবং কীভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার স্বকীয়তা হারিয়েছিল।
হাওয়াই দ্বীপপুঞ্জের: রানী লিলিওকালানি
হাওয়াইয়ের ইতিহাসে রানী লিলিওকালানি কেবল একজন শাসক ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দক্ষ সুরকার, লেখক এবং তাঁর জাতির অধিকার রক্ষার প্রধান কণ্ঠস্বর। ১৮৯১ সালে তিনি যখন সিংহাসনে বসেন, তখন হাওয়াই এক চরম রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। একদিকে আমেরিকান ব্যবসায়ীদের অর্থনৈতিক আধিপত্য, অন্যদিকে স্থানীয় জনগণের অধিকার রক্ষার লড়াই—এই দুইয়ের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর দেশের স্বাধীনতা রক্ষার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন।
১. প্রাথমিক জীবন ও শিক্ষা
১৮৩৮ সালের ২ সেপ্টেম্বর হনুলুলুতে লিলিুওকালানি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর শৈশব নাম ছিল লিডিয়া কামাকায়েহা (Lydia Kamakaʻeha)। তিনি রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন এবং তাঁর পরিবার ছিল হাওয়াইয়ের ঐতিহ্যের ধারক।
- শিক্ষা: তিনি ‘রয়্যাল স্কুল’-এ পড়াশোনা করেন। সেখানে তিনি ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির সংস্পর্শে আসেন।
- সঙ্গীত প্রতিভা: ছোটবেলা থেকেই তাঁর সঙ্গীতের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি শত শত গান রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে বিশ্ববিখ্যাত ‘আলোহা ও’ (Aloha ʻOe) অন্যতম।
২. সিংহাসনে আরোহণ এবং প্রতিকূল পরিস্থিতি
১৮৯১ সালে তাঁর ভাই রাজা কালাকাউয়ার (King Kalākaua) মৃত্যুর পর লিলিুওকালানি হাওয়াইয়ের সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তাঁর জন্য পরিস্থিতি মোটেও সহজ ছিল না।
১৮৮৭ সালে তাঁর ভাইয়ের শাসনকালে ‘বেয়নেট কনস্টিটিউশন’ (Bayonet Constitution) নামক একটি সংবিধান বলপ্রয়োগ করে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এই সংবিধানের ফলে:
- রাজার ক্ষমতা নাটকীয়ভাবে কমে যায়।
- ভোটাধিকার কেবল ধনী ইউরোপীয় এবং আমেরিকান বংশোদ্ভূত জমি মালিকদের হাতে চলে যায়।
- স্থানীয় হাওয়াইয়ানরা তাদের রাজনৈতিক অধিকার হারায়।
সিংহাসনে বসার পর লিলিওকালানির প্রধান লক্ষ্য ছিল একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা, যা জনগণের ক্ষমতা ফিরিয়ে দেবে।
আরও পড়ুন – রানাভালোনা তৃতীয়: স্বাধীনতার প্রতীক এক রাণীর অনুপ্রেরণাময় জীবনকাহিনী
৩. ১৮৯৩ সালের অভ্যুত্থান: ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা
রানী যখন নতুন সংবিধান আনার চেষ্টা করেন, তখন হাওয়াইয়ে অবস্থানরত আমেরিকান চিনি ব্যবসায়ী এবং বাগান মালিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। তারা জানতেন, রানীর ক্ষমতা বাড়লে তাদের একচ্ছত্র বাণিজ্যিক আধিপত্য এবং শুল্কমুক্ত ব্যবসার সুবিধা হুমকির মুখে পড়বে।
১৮৯৩ সালের জানুয়ারি মাসে ‘কমিটি অফ সেফটি’ নামে একটি গোষ্ঠী মার্কিন নৌবাহিনীর সহায়তায় রানীকে ক্ষমতাচ্যুত করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়। কোনো রক্তপাত এড়াতে এবং তাঁর জনগণের নিরাপত্তার কথা ভেবে রানী সাময়িকভাবে ক্ষমতা ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি বিশ্বাস করেছিলেন যে, মার্কিন সরকার (তৎকালীন রাষ্ট্রপতি গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড) তদন্ত করে তাঁকে তাঁর ন্যায্য অধিকার ফিরিয়ে দেবেন।
৪. বন্দী জীবন এবং ‘আলোহা ও’

১৮৯৫ সালে রানীর অনুগতরা একটি পাল্টা বিদ্রোহের চেষ্টা করলে তা ব্যর্থ হয়। এই অজুহাতে রানীকে গ্রেফতার করা হয় এবং তাঁকে ইওলানি প্যালেসের (Iolani Palace) একটি ছোট ঘরে গৃহবন্দী করে রাখা হয়।
বন্দী থাকাকালীন তাঁর কর্মকাণ্ড:
- তিনি তাঁর আত্মজীবনী ‘Hawaii’s Story by Hawaii’s Queen’ লিখতে শুরু করেন।
- তিনি তাঁর বিখ্যাত গানগুলো সংকলিত করেন।
- তিনি একটি কাপড় বুনেছিলেন (Quilt), যাতে হাওয়াইয়ের ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা সেলাই করা ছিল। এটি আজও ইতিহাসের এক অনন্য দলিল হিসেবে সংরক্ষিত।
৫. হাওয়াইয়ের অন্তর্ভুক্তি (Annexation)
রাষ্ট্রপতি ক্লিভল্যান্ড রানীর প্রতি সহানুভূতিশীল থাকলেও মার্কিন কংগ্রেস এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি উইলিয়াম ম্যাককিনলে হাওয়াইকে যুক্তরাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত করার পক্ষে ছিলেন। ১৮৯৮ সালে স্প্যানিশ-আমেরিকান যুদ্ধের সময় হাওয়াইয়ের কৌশলগত অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বীপপুঞ্জটিকে দখল করে নেয়। রানী লিলিুওকালানি ওয়াশিংটন ডিসিতে গিয়ে প্রতিবাদ জানালেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাছে তাঁর আবেদন ব্যর্থ হয়।
৬. রানী লিলিওকালানির ঐতিহাসিক অবদান: এক নজরে
| বিষয় | অবদান/গুরুত্ব |
|---|---|
| রাজনৈতিক চেতনা | স্থানীয় হাওয়াইয়ানদের অধিকার রক্ষায় আপসহীন লড়াই। |
| সাহিত্য | ‘Hawaii’s Story by Hawaii’s Queen’ গ্রন্থের মাধ্যমে সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা। |
| সঙ্গীত | ‘Aloha ʻOe’ সহ ১৬০টিরও বেশি গান রচনা। |
| ট্রাস্ট গঠন | অনাথ এবং সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য ‘Liliʻuokalani Trust’ প্রতিষ্ঠা। |
আরও পড়ুন – ছোটদের নৈতিক শিক্ষামুলক ৮ টি মজার গল্প
৭. শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষণীয় দিক
রানী লিলিুওকালানির জীবন থেকে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নিতে পারে:
- শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ: তিনি অস্ত্র হাতে তুলে না নিয়ে কূটনৈতিক ও আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছিলেন।
- সাংস্কৃতিক পরিচয় রক্ষা: রাজনৈতিক পরাজয় সত্ত্বেও তিনি তাঁর দেশের গান, ভাষা এবং ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে কাজ করে গেছেন।
- নারীর নেতৃত্ব: উনবিংশ শতাব্দীতে একজন নারী হিসেবে তিনি যেভাবে পরাশক্তিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন, তা আজও অনুপ্রেরণাদায়ক।
৮. শেষ জীবন ও মৃত্যু
রানী তাঁর জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত সাধারণ মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছিলেন। ১৯১৭ সালের ১১ নভেম্বর ৭৯ বছর বয়সে এই মহীয়সী নারীর জীবনাবসান ঘটে। তাঁর মৃত্যুতে পুরো হাওয়াই শোকস্তব্ধ হয়ে পড়েছিল। যদিও তিনি তাঁর রাজ্য ফিরে পাননি, কিন্তু তিনি হাওয়াইয়ের মানুষের হৃদয়ে ‘চিরস্থায়ী রানী’ হয়ে আছেন।
উপসংহার
রানী লিলিওকালানি কেবল হাওয়াইয়ের শেষ রানী ছিলেন না; তিনি ছিলেন ঔপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে এক নৈতিক শক্তির প্রতীক। তাঁর লড়াই আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জয়-পরাজয় বড় কথা নয়, নিজের আদর্শ এবং জন্মভূমির প্রতি দায়বদ্ধতা থাকাই প্রকৃত বীরত্ব। আজকের আধুনিক হাওয়াই যখন তাদের আদি সংস্কৃতি নিয়ে গর্ব করে, তখন তার মূলে রয়েছে লিলিওকালানির ত্যাগ।
আপনি কি জানেন?
১৯৯৩ সালে মার্কিন কংগ্রেস একটি প্রস্তাব (Apology Resolution) পাস করে, যেখানে ১৮৯৩ সালের সেই অনৈতিক অভ্যুত্থানের জন্য হাওয়াইয়ের আদিবাসীদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমা চাওয়া হয়।


