কিং চুলালংকর্ন (পঞ্চম রামা) তাঁর তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও দূরদর্শিতার দ্বারা সিয়ামকে স্বাধীন রাখেন এবং থাইল্যান্ডকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন।

পঞ্চম রামা: তরুণ দুরন্ত সাহসী এক রাজা!
বন্ধুরা, তোমরা কি জানো, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এমন একটি দেশ আছে, যাকে তার আশেপাশে থাকা শক্তিশালী ব্রিটিশ বা ফরাসি সাম্রাজ্য কখনোই পুরোপুরি দখল করতে পারেনি? হ্যাঁ, দেশটার নাম থাইল্যান্ড (আগের নাম সিয়াম)। আর এই স্বাধীনতার পেছনে যার সবচেয়ে বড় অবদান, তিনি হলেন এক অসাধারণ রাজা— কিং চুলালংকর্ন, যিনি ইতিহাসে পঞ্চম রামা (Rama V) নামে পরিচিত।
আজ থেকে প্রায় ১৫০ বছর আগে যখন পুরো এশিয়া জুড়ে ঔপনিবেশিকতার কালো ছায়া, তখন মাত্র ১৫ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেছিলেন এই তরুণ রাজা। তার সামনে ছিল দুটো রাস্তা: হয় পরাক্রমশালী ইউরোপীয় শক্তিগুলোর কাছে মাথা নত করা, নয়তো নিজের দেশকে বাঁচানোর জন্য অসম্ভব এক সংগ্রাম শুরু করা। কিং চুলালংকর্ন দ্বিতীয় পথটি বেছে নিয়েছিলেন।
আমরা জানব, কীভাবে তীক্ষ্ণ বুদ্ধি, দূরদর্শিতা আর আধুনিকতার প্রতি অগাধ বিশ্বাস নিয়ে তিনি সিয়ামকে শুধু স্বাধীনই রাখেননি, বরং একটি আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত করেছিলেন। তার জীবন তরুণ প্রজন্মের জন্য এক দারুণ অনুপ্রেরণা, যা শেখায় যে চ্যালেঞ্জ যতই বড় হোক না কেন, সঠিক জ্ঞান ও সাহসের জোরে সব বাধা পেরোনো যায়।
প্রধান চ্যালেঞ্জ: সাম্রাজ্যবাদী থাবা
১৯ শতাব্দীর শেষভাগ। ব্রিটিশরা তখন পাশেই বার্মা (মায়ানমার) দখল করে ফেলেছে। আর ফরাসিরা দখল করছে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া আর লাওস। সিয়াম ঠিক যেন দুই বাঘের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক হরিণ! ইউরোপীয় শক্তিগুলো সিয়ামকে তাদের প্রভাব বলয়ে নিয়ে আসার জন্য সব সময় চাপ সৃষ্টি করত। তাদের দাবি ছিল— সিয়ামের শাসন ব্যবস্থা ‘অসভ্য’ এবং ‘অনাধুনিক’, তাই তাদের ‘সভ্য’ করার জন্য ইউরোপীয়দের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
কিন্তু রাজা চুলালংকর্ন বুঝেছিলেন, যদি ইউরোপীয়দের দেখিয়ে দেওয়া যায় যে সিয়ামও তাদের মতোই আধুনিক ও উন্নত, তবে তারা হস্তক্ষেপের সুযোগ পাবে না। তাই তিনি বেছে নিলেন “নকল করো, কিন্তু নত হয়ো না”-এর কৌশল।
আরও পড়ুন – থাইল্যান্ডের 4 টি জনপ্রিয় লোককাহিনীর বাংলা অনুবাদ
১. দাসপ্রথা বিলোপ: স্বাধীনতার প্রথম পদক্ষেপ
রাজা চুলালংকর্নের সবচেয়ে সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারগুলোর মধ্যে একটি ছিল দাসপ্রথার বিলোপ (Abolition of Slavery)। সিয়ামে তখন সমাজের একটি বড় অংশ দাস হিসেবে জীবন কাটাত। তিনি জানতেন, একটা আধুনিক এবং শক্তিশালী দেশ কখনো দাসপ্রথার মতো মধ্যযুগীয় প্রথা নিয়ে চলতে পারে না।
তিনি রক্তপাত বা বিপ্লব ছাড়াই এই পরিবর্তন আনেন। ১৮৭৪ সাল থেকে শুরু করে তিনি ধীরে ধীরে দাসপ্রথার অবসান ঘটানোর জন্য আইন তৈরি করেন। একটি আইনের মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন যে ১৮৬৮ সালের পরে জন্ম নেওয়া সকল দাসশিশুরা ১৯ বছর বয়সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মুক্ত হয়ে যাবে। এরপর অন্যান্য আইন এনে দাসের মূল্য কমানো হয় এবং তাদের মুক্তির পথ সহজ করে দেওয়া হয়।
এই সংস্কার শুধু মানুষকে মুক্তি দেয়নি, বরং দেশবাসীকে দেখিয়েছে যে তাদের রাজা প্রগতিশীল এবং জনগণের মঙ্গলের জন্য কাজ করছেন। এটি তাঁকে ‘Phra Piya Maharat’ (মহান প্রিয় রাজা) উপাধি এনে দিয়েছিল।
২. আধুনিকীকরণ ও সংস্কার: দেশকে ‘সিভিলাইজড’ করা
পশ্চিমা শক্তিগুলো যখন সিয়ামকে ‘অসভ্য’ বলে আক্রমণ করার অজুহাত খুঁজছিল, তখন রাজা চুলালংকর্ন দেশকে দ্রুত আধুনিকতার পথে নিয়ে যান। তিনি এমন সব সংস্কার এনেছিলেন যা পুরো দেশের চেহারা পাল্টে দেয়:
ক. আধুনিক প্রশাসন (Centralized Bureaucracy):
তিনি পুরোনো সামন্ততান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা ভেঙে দেন। স্থানীয় প্রধানদের হাতে থাকা ক্ষমতা কমিয়ে ইউরোপীয় মডেলের আদলে ১২টি কার্যকরী মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এর ফলে প্রশাসনে দক্ষতা আসে এবং কেন্দ্রের ক্ষমতা বাড়ে, যা ঔপনিবেশিক শক্তির প্রভাব কমানোর জন্য জরুরি ছিল।
খ. শিক্ষা বিপ্লব (Modern Education System):
তিনি দেশজুড়ে আধুনিক স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন এবং বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা চালু করার উদ্যোগ নেন। তিনি মনে করতেন, শিক্ষা হলো আধুনিক রাষ্ট্রের ভিত্তি। তিনি তাঁর নিজের সন্তানসহ অনেক রাজপুত্রকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাঠান, যাতে তারা আধুনিক জ্ঞান ও শাসন পদ্ধতি শিখে আসতে পারে। ****
গ. অবকাঠামো উন্নয়ন (Infrastructure Development):
যোগাযোগ ব্যবস্থা আধুনিক না হলে দেশের উন্নতি অসম্ভব। তাই তিনি:
- প্রথম রেললাইন নির্মাণ শুরু করেন।
- টেলিগ্রাফ লাইন স্থাপন করেন, যা দূর-দূরান্তের অঞ্চলে দ্রুত খবর পাঠাতে সাহায্য করত।
- আধুনিক ডাক ও তার (Postal and Telegraph) ব্যবস্থা চালু করেন।
ঘ. প্রথাবিরুদ্ধ পদক্ষেপ (Social Reforms):
তিনি দরবারে রাজার সামনে প্রথাগতভাবে মাটিতে শুয়ে মাথা নত করার (Prostration) প্রথা তুলে দেন। এর পরিবর্তে তিনি সবাইকে উঠে দাঁড়ানোর (Standing Up) নির্দেশ দেন। এই সাধারণ পরিবর্তনটি রাজকীয় ক্ষমতাকে আরও মানবিক ও আধুনিক করে তুলেছিল।
আরও পড়ুন – ছোটদের নৈতিক শিক্ষা দেয় এমন ৮ টি মজার ও যুগোপযোগী নীতিগল্প
৩. কূটনীতির জাদু: উপনিবেশিকতাকে হারানো
কিং চুলালংকর্নের সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল তার কূটনৈতিক দক্ষতা (Diplomatic Skill)। তিনি জানতেন, সিয়াম সরাসরি যুদ্ধ করে ইউরোপীয়দের হারাতে পারবে না। তাই তিনি এক অসাধারণ কৌশল নেন:
- ভারসাম্য রক্ষা (Balancing the Powers): তিনি ব্রিটিশ এবং ফরাসিদের মধ্যে এমনভাবে ভারসাম্য রক্ষা করেন যে কেউই সিয়ামকে পুরোপুরি গ্রাস করার সাহস পায়নি। তিনি একদিকে ব্রিটিশদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেন, আবার অন্যদিকে ফরাসিদের সাথেও চুক্তি করতেন।
- ইউরোপ ভ্রমণ (Travels to Europe): তিনি দুবার ইউরোপ ভ্রমণ করেন (১৮৯৭ এবং ১৯০৭ সালে)। এই ভ্রমণগুলো শুধু বিদেশ ভ্রমণের জন্য ছিল না। এর মাধ্যমে তিনি ইউরোপীয় রাজপরিবার এবং সরকারদের কাছে প্রমাণ করেন যে সিয়াম একটি ‘সভ্য’ ও আধুনিক রাষ্ট্র। তাকে ইউরোপীয় রাজাদের মতোই সম্মান ও আতিথেয়তা জানানো হয়েছিল, যা বহির্বিশ্বে সিয়ামের মর্যাদা বাড়ায় এবং ঔপনিবেশিক আগ্রাসনকে কঠিন করে তোলে।
- অল্প ত্যাগ, বেশি লাভ: সার্বভৌমত্ব বাঁচাতে তিনি কিছু বিতর্কিত সিদ্ধান্তও নেন। ফরাসিদের চাপ কমাতে তিনি লাওস এবং কম্বোডিয়ার কিছু অংশ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন। একইভাবে, ব্রিটিশদের কাছে কিছু মালয় রাজ্য ছেড়ে দেন। এই ‘অল্প ত্যাগ’ করার ফলে সিয়ামের মূল ভূখণ্ড এবং স্বাধীনতা রক্ষা পেয়েছিল।
৪. তরুণদের জন্য অনুপ্রেরণা: শিখতে থাকুন, এগিয়ে চলুন!
কিং চুলালংকর্নকে তার প্রজারা এখনো ‘ফাদার অফ মডার্ন থাইল্যান্ড’ হিসেবে স্মরণ করে। তার জীবন থেকে তরুণ প্রজন্মের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে:
- শিখনীয় মানসিকতা: তিনি ১৫ বছর বয়সে সিংহাসনে বসেও শেখা থামাননি। তিনি বিশ্বকে জানতে চেয়েছিলেন, ইউরোপ ভ্রমণ করেছিলেন এবং নতুন ধারণা নিয়ে দেশে ফিরে এসেছিলেন। তোমাদেরও সব সময় নতুন কিছু শেখার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
- ভয়কে জয় করা: তিনি দুই পরাশক্তির মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভয় পাননি। বরং তাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার জন্য জ্ঞান ও আধুনিকতাকে হাতিয়ার করেছেন। কঠিন পরিস্থিতিতে সাহস হারানো যাবে না।
- ধীরে চলো, কিন্তু লক্ষ্য স্থির রাখো: তিনি দাসপ্রথা একদিনে বিলোপ করেননি। তিনি ধাপে ধাপে, আইন করে তা নিশ্চিত করেছেন। বড় লক্ষ্য অর্জনের জন্য ধৈর্য এবং কৌশল দরকার।
উপসংহার: এক স্বাধীন দেশের ভিত্তিপ্রস্তর
কিং চুলালংকর্ন (রামা ভি) কেবল একজন রাজা ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন দূরদর্শী সংস্কারক, একজন দক্ষ কূটনীতিক এবং তার দেশের স্বাধীনতা রক্ষাকারী নায়ক। তার ৪৯ বছরের রাজত্বকাল সিয়ামকে একটি মধ্যযুগীয় রাজ্য থেকে একটি আধুনিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করেছিল। তিনি প্রমাণ করে গেছেন, সামরিক শক্তিই সব নয়; জ্ঞান, কৌশল, এবং জনগণের প্রতি ভালোবাসা একটি দেশকে ঔপনিবেশিকতার কবল থেকে রক্ষা করতে পারে।
তাই, যখনই কোনো চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, কিং চুলালংকর্নের কথা মনে করো— যিনি দেখিয়েছিলেন, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা এবং পরিবর্তনের সাহসই হলো স্বাধীনতার আসল শক্তি।


