গোবরডাঙ্গা: ইতিহাস বলে উত্তর ২৪ পরগনার এই শহরের মাটিতে মিশে আছে জমিদারি আমলের আভিজাত্য, বিপ্লবীদের সাহসিকতা আর সাহিত্যিকদের কলম।

পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার মানচিত্রে যমুনা নদীর তীরে শান্ত, স্নিগ্ধ এক জনপদ হলো গোবরডাঙ্গা। বর্তমানের ছিমছাম মফস্বল শহরটির অলিগলিতে আজও মিশে আছে জমিদারি আমলের আভিজাত্য, বিপ্লবীদের সাহসিকতা আর সাহিত্যিকদের কলমের আঁচড়। আপনি যদি ইতিহাসের গন্ধ মাখা পুরনো দালান আর শান্ত প্রকৃতি ভালোবাসেন, তবে গোবরডাঙ্গা আপনার পরবর্তী ভ্রমণের তালিকায় এক অনন্য নাম হতে পারে।
যমুনার তীরে গড়ে ওঠার শুরু
গোবরডাঙ্গার নামের সাথে জড়িয়ে আছে নানা লোককথা। কেউ বলেন ‘গো-বর্ধন’ থেকে এই নাম, আবার কারো মতে প্রাচীন জনপদের বিবর্তন। তবে এই শহরের আধুনিক ইতিহাসের মূল কারিগর হলেন এখানকার মুখোপাধ্যায় পরিবার বা গোবরডাঙ্গার রাজ পরিবার। ১৮শ শতাব্দীর শেষভাগে এই রাজবংশের হাত ধরেই গোবরডাঙ্গা একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কেন্দ্রে পরিণত হয়।
একসময় যমুনা নদী ছিল এই অঞ্চলের প্রধান বাণিজ্য পথ। আজ নদী তার আগের যৌবন হারালেও, তীরের পোড়ো বাড়িগুলো আজও সেই সোনালী দিনগুলোর সাক্ষ্য দেয়।
স্থাপত্যের বিস্ময়: গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ি ও মন্দির
গোবরডাঙ্গার প্রধান আকর্ষণ হলো এর ঐতিহাসিক স্থাপত্য। ভ্রমণপিপাসুদের জন্য এখানে দেখার মতো অনেক কিছু রয়েছে:
১. প্রসন্নময়ী কালী মন্দির
১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে গোবরডাঙ্গার রানী প্রসন্নময়ী এই নবরত্ন মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেন। দক্ষিণেশ্বর মন্দিরের আদলে তৈরি এই প্রসন্নময়ী কালী মন্দিরটি আজও ভক্ত ও পর্যটকদের কাছে পরম শ্রদ্ধার। মন্দিরের কারুকার্য এবং বিশাল চত্বর আপনাকে এক নিমেষে নিয়ে যাবে কয়েকশো বছর আগের বাংলায়।
২. গোবরডাঙ্গা রাজবাড়ি
যদিও সময়ের নিয়মে রাজবাড়ির অনেক অংশই আজ জীর্ণ, তবু এর সিংহদুয়ার এবং বিশাল ঠাকুরদালান দেখলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়। কথিত আছে, এখানকার দুর্গাপূজা ছিল একসময়ের অবিভক্ত বাংলার অন্যতম বড় উৎসব। রাজবাড়ির নাটমন্দিরে যখন সানাই বাজত, তখন দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ছুটে আসত সেই আভিজাত্য চাক্ষুষ করতে।
৩. নকশা মন্দির ও টেরাকোটা শিল্প
গোবরডাঙ্গার আশেপাশে ছড়িয়ে আছে বেশ কিছু ছোট ছোট টেরাকোটার মন্দির। এখানকার সূক্ষ্ম কারুকার্য প্রমাণ করে যে, তৎকালীন বাংলার শিল্পীরা কতটা দক্ষ ছিলেন।
সাহিত্যে গোবরডাঙ্গা: প্রমথনাথ বিশীর জন্মভূমি

গোবরডাঙ্গার মাটি শুধু বীর প্রসবিনী নয়, এ মাটি মেধার ধারক। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত সাহিত্যিক, গবেষক ও রবীন্দ্র-বিশেষজ্ঞ প্রমথনাথ বিশী ছিলেন এই শহরেরই সন্তান। তাঁর লেখায় বারেবারে ফিরে এসেছে উত্তর ২৪ পরগনার এই শান্ত জনপদ এবং যমুনা নদীর বর্ণনা।
প্রমথনাথ বিশী তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘চলনবিল’ বা তাঁর ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণে আমরা পাই এক জীবন্ত গোবরডাঙ্গাকে। আজও তাঁর পৈতৃক ভিটে এবং তাঁর নামাঙ্কিত পাঠাগার সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে তীর্থস্থানের মতো। তিনি ছাড়াও এই অঞ্চলের সাথে জড়িয়ে আছে বহু বিদগ্ধ পণ্ডিতের নাম, যা গোবরডাঙ্গাকে ‘শিক্ষানগরী’ হিসেবে পরিচিত করেছে।
স্বাধীনতার লড়াই ও অগ্নিযুগের বিপ্লবীরা
ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে গোবরডাঙ্গার অবদান স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে এই অঞ্চল ছিল বিপ্লবীদের এক গোপন আস্তানা।
- বিপ্লবী শৈলেন্দ্রনাথ দত্ত: এখানকার তরুণরা যখন দেশমাতৃকার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলেন, তখন তাঁদের নেতৃত্বে ছিলেন বিপ্লবী শৈলেন্দ্রনাথ দত্তের মতো ব্যক্তিত্বরা।
- অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দল: গোবরডাঙ্গার বহু যুবক গোপনে অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের সাথে যুক্ত ছিলেন। তাঁরা অস্ত্র প্রশিক্ষণ নিতেন এবং ব্রিটিশদের চোখে ধুলো দিয়ে স্বদেশী প্রচার চালিয়ে যেতেন।
এখানে এলে আপনি অনুভব করবেন সেই তেজস্বী মানুষদের আত্মত্যাগ, যাঁদের রক্তে আজ আমরা স্বাধীন বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছি।
আরও পড়ুন – কিং চুলালংকর্ন (পঞ্চম রামা): যে রাজা ঔপনিবেশিকতাকে হারিয়ে দেশকে আধুনিক করেন
পর্যটকদের জন্য যা কিছু আকর্ষণীয়
ইতিহাসের বাইরেও গোবরডাঙ্গা তার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত।
- যমুনা নদীর পাড়: বিকেলের পড়ন্ত রোদে যমুনার পাড়ে বসে থাকা এক স্বর্গীয় অনুভূতি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি সেরা ‘হ্যাঙ্গআউট’ স্পট।
- গোবরডাঙ্গা রেনেসাঁ ইনস্টিটিউট: এটি কেবল একটি ক্লাব বা প্রতিষ্ঠান নয়, এটি গোবরডাঙ্গার সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। এখানে সারা বছর নানা নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
- গাইঘাটা ও ঠাকুরনগর: গোবরডাঙ্গার খুব কাছেই ঠাকুরনগর (মতুয়া ধাম) এবং গাইঘাটা। হাতে সময় থাকলে আপনি এই জায়গাগুলোও ঘুরে নিতে পারেন।
কীভাবে যাবেন ও কখন যাবেন?
কীভাবে যাবেন:
- ট্রেনে: শিয়ালদহ স্টেশন থেকে বনগাঁ লোকাল ধরে মাত্র ১ ঘণ্টা ২০ মিনিটে পৌঁছে যান গোবরডাঙ্গা স্টেশনে। স্টেশনের বাইরেই টোটো বা রিকশা পাবেন ঘোরার জন্য।
- সড়কপথে: কলকাতা থেকে যশোর রোড ধরে বারাসাত, হাবড়া হয়ে খুব সহজেই গাড়ি নিয়ে এখানে আসা যায়।
কখন যাবেন:
গোবরডাঙ্গা ভ্রমণের সেরা সময় হলো অক্টোবর থেকে মার্চ মাস। তবে বর্ষাকালে যমুনার রূপ অন্যরকম থাকে, যা প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করবে।
আরও পড়ুন – আদিসপ্তগ্রাম: বাংলার হারানো বন্দর ও ইতিহাসের এক স্বর্ণালি অধ্যায়
কেন গোবরডাঙ্গা আপনার পরবর্তী গন্তব্য হতে পারে?
আমরা অনেকেই সপ্তাহান্তে দিঘা বা পুরী ছুটে যাই, কিন্তু ঘরের কাছেই লুকিয়ে থাকা এমন ইতিহাসকে অবহেলা করি। গোবরডাঙ্গা আপনাকে কোনো আধুনিক লাক্সারি দেবে না, কিন্তু আপনাকে দেবে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। আপনি যখন রাজবাড়ির ভগ্নস্তূপের সামনে দাঁড়াবেন, কিংবা প্রসন্নময়ী মন্দিরের শান্ত চত্বরে বসবেন, তখন মনে হবে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে।
এখানে এসে আপনি শুধু ঘুরবেন না, বরং ইতিহাসের মুখোমুখি হবেন। প্রমথনাথ বিশীর গ্রাম্য মেঠো পথ কিংবা বিপ্লবীদের গোপন আস্তানার গল্প আপনাকে নতুন করে দেশপ্রেম ও শিকড়ের টানে উদ্বুদ্ধ করবে।
উপসংহার:
গোবরডাঙ্গা কেবল একটি শহর নয়, এটি একটি অনুভূতি। এর ধুলিকণায় মিশে আছে বহু না বলা গল্প। আপনি যদি ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে ভালোবাসেন এবং ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে এক নির্জন ঐতিহাসিক ভ্রমণে যেতে চান, তবে এই উইকএন্ডেই বেরিয়ে পড়ুন গোবরডাঙ্গার উদ্দেশ্যে।
আপনার কি গোবরডাঙ্গা ভ্রমণের কোনো স্মৃতি আছে? অথবা এই শহরের অন্য কোনো অজানা ইতিহাস জানেন? আমাদের কমেন্ট করে জানান!



