
গঙ্গার শীতল হাওয়া, প্রাচীন মন্দিরের ঘন্টার ধ্বনি আর অলিগলিতে লুকিয়ে থাকা কয়েকশ বছরের পুরনো ইতিহাস—এই নিয়েই আমাদের আজকের গন্তব্য হুগলি জেলার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ, বৈদ্যবাটী (Baidyabati)। আপনি যদি ইতিহাসপ্রেমী হন কিংবা সপ্তাহান্তের ছুটিতে একটু নিরিবিলিতে পুরনো বাংলার গন্ধ নিতে চান, তবে বৈদ্যবাটী আপনার জন্য আদর্শ জায়গা।
আজকের আর্টিকেলে আমরা এ শহরের ইতিহাসের গল্পে ফিরে যাব সেই সময়ে, যখন বৈদ্যবাটী হয়ে উঠেছিল বাংলার ব্যবসা-বাণিজ্য আর সংস্কৃতির অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। চলুন, ১৯৪৭-এর আগের সেই স্বর্ণযুগে একটু ডুব দেওয়া যাক।
বৈদ্যবাটী: নামের পেছনে লুকিয়ে থাকা রহস্য
প্রথমেই মাথায় আসে, ‘বৈদ্যবাটী’ নামটা এল কোত্থেকে? লোককথা অনুযায়ী, একসময় এই জনপদে প্রচুর ‘বৈদ্য’ বা আয়ুর্বেদিক চিকিৎসকদের বাস ছিল। তাঁদের ‘বাটী’ বা বাড়ি থেকেই এই জায়গার নাম হয়েছে বৈদ্যবাটী। প্রাচীনকালে যখন আজকের মতো অ্যালোপ্যাথি হাসপাতাল ছিল না, তখন সারা বাংলার মানুষ সুচিকিৎসার আশায় এই গঙ্গার তীরের জনপদে ছুটে আসতেন।
প্রাচীন ও মধ্যযুগ: যখন ইতিহাসের শুরু
বৈদ্যবাটীর ইতিহাস কিন্তু একদিনের নয়। মধ্যযুগেও যখন এই অঞ্চল ‘রাঢ়’ অঞ্চলের অন্তর্গত ছিল, তখনও এর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে অবস্থিত হওয়ার কারণে ভৌগোলিকভাবেই এটি অত্যন্ত নিরাপদ এবং ব্যবসা-বান্ধব ছিল। শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর সময়েও এই অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়। কথিত আছে, মহাপ্রভু যখন নীলাচলে যেতেন, তখন এই গঙ্গার ঘাট দিয়েই তাঁর যাতায়াত ছিল। বৈদ্যবাটীর ‘নিমাই তীর্থ ঘাট’ আজও সেই স্মৃতি বহন করছে।
শেওড়াফুলি রাজবাড়ি ও বৈদ্যবাটীর উত্থান

বৈদ্যবাটীর ইতিহাস বলতে গেলে পাশের জনপদ শেওড়াফুলির রাজপরিবারের কথা বলতেই হয়। কারণ, বৈদ্যবাটীর অনেকটা অংশই ছিল এই রাজপরিবারের জমিদারির অধীনে। রাজা মনোহর রায়ের সময়ে এই অঞ্চলের শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছিল চোখে পড়ার মতো।
১৭৫০ সাল নাগাদ যখন বাংলার মসনদে নবাবদের দাপট কমছে আর ব্রিটিশদের আধিপত্য বাড়ছে, তখন থেকেই বৈদ্যবাটী একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। শেওড়াফুলি রাজাদের তৈরি মন্দির, বাজার আর জনহিতকর কাজগুলো বৈদ্যবাটীকে এক অনন্য রূপ দিয়েছিল।
আরও পড়ুন – আদিসপ্তগ্রাম: বাংলার হারানো বন্দর ও ইতিহাসের এক স্বর্ণালি অধ্যায়
ব্রিটিশ শাসনকাল: ব্যবসা-বাণিজ্যের স্বর্ণযুগ
১৮৫০-এর দশক থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত সময়টা ছিল বৈদ্যবাটীর জন্য সবচেয়ে নাটকীয়। ব্রিটিশরা যখন রেললাইন পাতল (১৮৫৪ সালে ইস্ট ইন্ডিয়া রেলওয়ে), তখন বৈদ্যবাটী স্টেশনের গুরুত্ব বেড়ে গেল কয়েক গুণ।
১. আলু আর চটের হাট
আপনি কি জানেন? শেওড়াফুলি-বৈদ্যবাটীর এই হাট একসময় এশিয়ার অন্যতম বৃহত্তম সবজির বাজার ছিল। বিশেষ করে সিঙ্গুর ও সংলগ্ন অঞ্চলের আলুর প্রধান রপ্তানি কেন্দ্র ছিল এই বৈদ্যবাটী। গঙ্গার ঘাট দিয়ে বড় বড় নৌকা করে মালামাল আসত, আর রেলপথে তা পৌঁছে যেত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে।
২. ভিক্টোরিয়া জুট মিলের আভিজাত্য
শিল্পায়নের ছোঁয়া লেগেছিল এই জনপদেও। ১৮৭৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ভিক্টোরিয়া জুট মিল। গঙ্গার পাড় ঘেঁষে গড়ে ওঠা এই চটকলটি হাজার হাজার শ্রমিকের অন্নসংস্থান করত। শুধু তাই নয়, ব্রিটিশ সাহেবদের কোয়ার্টার, ক্লাব আর নীল গঙ্গার জল মিলিয়ে এক অদ্ভুত সাহেবঘেঁষা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল এখানে।
মন্দিরের শহর: স্থাপত্যের এক অনন্য প্রদর্শনী
বৈদ্যবাটীর গলিগুলোতে হাঁটলে আপনি আজও ব্রিটিশ আমলের আগের স্থাপত্য দেখতে পাবেন। এখানকার মন্দিরগুলো শুধু উপাসনালয় নয়, এগুলো ইতিহাসের জীবন্ত দলিল।
- নিমাই তীর্থ ঘাট ও মন্দির: গঙ্গার পাড়ে অবস্থিত এই ঘাটটি অত্যন্ত প্রাচীন। পর্যটকদের কাছে এটি এক প্রধান আকর্ষণ।
- রাধা-বল্লভ জিউর মন্দির: এই মন্দিরের কারুকার্য আর শান্ত পরিবেশ আপনাকে এক নিমেষে ১০০ বছর পিছিয়ে নিয়ে যাবে।
- বারোয়ারি পুজো: বৈদ্যবাটীর জগদ্ধাত্রী পুজোর ইতিহাসও বেশ প্রাচীন। ব্রিটিশ আমলে এখানকার বাবুরা যখন এই পুজো শুরু করেন, তখন তা ছিল আভিজাত্যের লড়াই।
স্বাধীনতা আন্দোলনে বৈদ্যবাটীর ভূমিকা

১৯৪৭-এর আগের ইতিহাস বলতে গেলে স্বাধীনতার লড়াইয়ের কথা না বললে অপূর্ণ থেকে যায়। বৈদ্যবাটী ছিল বিপ্লবীদের এক গোপন আস্তানা। হুগলি জেলার অন্যান্য জায়গার মতো এখানেও অনুশীলন সমিতি ও যুগান্তর দলের কর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। গঙ্গার নিভৃত ঘাটগুলো অস্ত্র আনা-নেওয়া বা গোপন বৈঠকের জন্য ব্যবহার করা হতো। ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট যখন দেশ স্বাধীন হলো, তখন বৈদ্যবাটীর সাধারণ মানুষ গঙ্গার ঘাটে সমবেত হয়ে আনন্দোৎসবে মেতে উঠেছিলেন।
আরও দেখুন – দীঘার ইতিহাস: অজানা ‘বীরকুল’ থেকে প্রাচ্যের ‘ব্রাইটন’ হয়ে ওঠার গল্প
ভ্রমণপিপাসুদের জন্য গাইড: কেন আসবেন বৈদ্যবাটী?
আপনি যদি ইতিহাস ভালোবাসেন, তবে আপনার উইকএন্ড লিস্টে বৈদ্যবাটী অবশ্যই থাকা উচিত।
- গঙ্গার ঘাট: বিকেলের দিকে গঙ্গার পাড়ে বসে সূর্যাস্ত দেখা এক অদ্ভুত প্রশান্তি দেয়।
- পুরনো রাজবাড়ি ও স্থাপত্য: ব্রিটিশ আমলের তৈরি লাল ইটের বাড়ি আর খড়খড়ি দেওয়া জানলার রাজকীয় ভাব আজও এখানে রয়ে গেছে।
- স্ট্রিট ফুড: বৈদ্যবাটীর মিষ্টির কথা ভুললে চলবে না! এখানকার স্থানীয় মিষ্টির দোকানগুলোতে আজও সেই সাবেকি স্বাদ পাওয়া যায়।
শেষ কথা (Conclusion)
বৈদ্যবাটী মানে শুধু একটা স্টেশন বা ঘিঞ্জি এলাকা নয়। এটি গঙ্গার পলিমাটিতে গড়ে ওঠা এক প্রাচীন সভ্যতা, যা নবাবী আমল থেকে ব্রিটিশ রাজ—সবই নিজের চোখে দেখেছে। ১৯৪৭-এর দেশভাগের আঁচ এখানে লাগলেও, এখানকার সম্প্রীতি আর বাণিজ্যের ঐতিহ্য আজও অটুট।
পরের বার যখন ট্রেন বা বাসে করে এই এলাকা দিয়ে যাবেন, জানলা দিয়ে একবার তাকিয়ে দেখবেন। হয়তো কোনো এক ভাঙা মন্দিরের দেওয়ালে বা পুরনো ঘাটের সিঁড়িতে আপনি খুঁজে পাবেন হারিয়ে যাওয়া কোনো বীরগাথা।
আপনি কি আগে কখনও বৈদ্যবাটী গিয়েছেন? বা এখানকার কোনো পুরনো গল্প কি আপনার জানা আছে? আমাদের কমেন্ট বক্সে অবশ্যই জানান!



