আদিসপ্তগ্রাম বা সপ্তগ্রাম ছিল মধ্যযুগীয় বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র। জানুন সপ্তগ্রামের ইতিহাস, অর্থনৈতিক গুরুত্ব, পতনের কারণ এবং বর্তমান অবস্থান।

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার একটি শান্ত জনপদ হলো আদিসপ্তগ্রাম যার প্রাচীন নাম ছিল সপ্তগ্রাম। আজ সেখানে জনকোলাহল কম, কিন্তু একসময় এই অঞ্চলটি ছিল প্রাচ্যের অন্যতম ব্যস্ত সমুদ্রবন্দর এবং বাংলার অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে ভ্রমণপিপাসু মানুষ—সবার জন্যই আদিসপ্তগ্রামের ইতিহাস এক রোমাঞ্চকর উপাখ্যান।
সপ্তগ্রাম নামের উৎপত্তি ও ভৌগোলিক অবস্থান
‘সপ্তগ্রাম’ কথাটির আক্ষরিক অর্থ হলো সাতটি গ্রাম। পৌরাণিক কাহিনী এবং ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী— বাঁশবেড়িয়া, কৃষ্ণপুর, বাসুদেবপুর, নিত্যানন্দপুর, শিবপুর, সাম্বলপুর এবং বলদঘাটি—এই সাতটি গ্রামের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছিল এই নগরী।
এটি সরস্বতী নদীর তীরে অবস্থিত ছিল। বর্তমান যুগে সরস্বতী নদীটি একটি সরু খালের মতো মনে হলেও, মধ্যযুগে এটি ছিল ভাগীরথীর প্রধান প্রবাহ এবং অত্যন্ত গভীর। এই ভৌগোলিক অবস্থানের কারণেই সপ্তগ্রাম হয়ে উঠেছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু।
আদিসপ্তগ্রামের ঐতিহাসিক গুরুত্ব
১. সুলতানি ও মুঘল আমলের স্বর্ণযুগ
ত্রয়োদশ শতাব্দীতে তুর্কি বিজয়ের পর থেকে সপ্তগ্রামের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিশেষ করে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের আমলে এটি একটি প্রধান প্রশাসনিক কেন্দ্র (ইকতামদার) এবং মিন্ট বা টাঁকশাল হিসেবে পরিচিতি পায়। গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের আমলে এখান থেকে মুদ্রা জারি করা হতো।
মুঘল সম্রাট আকবরের সময়েও ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে সপ্তগ্রামের সমৃদ্ধির উল্লেখ পাওয়া যায়। তখন এটি ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকার বা প্রশাসনিক বিভাগ।
২. ইউরোপীয় বণিকদের নজরে ‘পোর্তো পিকোলা’
ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ বণিকরা যখন বাংলায় বাণিজ্য করতে আসে, তারা সপ্তগ্রামকে বলত ‘Porto Piccolo’ বা ‘ক্ষুদ্র বন্দর’ (এর বিপরীতে চট্টগ্রাম ছিল ‘Porto Grande’)। এখান থেকে রেশম, মসলিন, চাল, চিনি এবং নীল ইউরোপ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় রপ্তানি হতো।
আরও পড়ুন – তমলুক বা তাম্রলিপ্ত, হাজার বছরের ইতিহাস ও ভ্রমণ গাইড
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য

সপ্তগ্রাম কেবল বাণিজ্যের নয়, ধর্মেরও মিলনস্থল ছিল।
- উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরের শ্রীপাট: শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রধান শিষ্যদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বণিক উদ্ধারণ দত্ত। সপ্তগ্রাম ছিল তার কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। আজও এখানে তার স্মৃতিধন্য মন্দির রয়েছে।
- সৈয়দ জামালুদ্দিনের মসজিদ: ১৪৯৫ সালে সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের আমলে নির্মিত এই মসজিদটি বাংলার টেরাকোটা স্থাপত্যের এক অপূর্ব নিদর্শন। বর্তমানে এটি ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক বিভাগ (ASI) দ্বারা সংরক্ষিত।
কেন হারিয়ে গেল সপ্তগ্রামের গৌরব? (পতনের কারণ)
সপ্তগ্রামের পতনের পেছনে মূলত তিনটি কারণ কাজ করেছিল:
- সরস্বতী নদীর নাব্যতা হ্রাস: সপ্তগ্রামের জীবনরেখা ছিল সরস্বতী নদী। ১৬শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে পলি জমে এই নদীর স্রোত হারিয়ে যায় এবং নদীটি শুকিয়ে যেতে শুরু করে। বড় জাহাজ বন্দরে ঢোকা অসম্ভব হয়ে পড়ে।
- হুগলি বন্দরের উত্থান: নদীর গতিপথ পরিবর্তনের ফলে পর্তুগিজরা তাদের বাণিজ্যের কেন্দ্র সপ্তগ্রাম থেকে সরিয়ে পার্শ্ববর্তী হুগলি (ব্যান্ডেল সংলগ্ন এলাকা) শহরে নিয়ে যায়।
- প্রাকৃতিক বিপর্যয় ও মহামারী: নদীর জল জমে যাওয়ায় ম্যালেরিয়া ও অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটে, ফলে মানুষ এই সমৃদ্ধ নগরী ত্যাগ করতে শুরু করে।
আরও পড়ুন – তোতা কাহিনী, সৈয়দ মুজতবা আলী রচিত একটি বিখ্যাত রম্যরচনা
পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় স্থানসমূহ
আপনি যদি আদি সপ্তগ্রামে ভ্রমণে যান, তবে নিম্নলিখিত স্থানগুলি অবশ্যই দেখবেন:
- সপ্তগ্রাম প্রাচীন মসজিদ: এর পোড়ামাটির কাজ আপনাকে মুগ্ধ করবে।
- উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুরের মন্দির: বৈষ্ণব ধর্মের ইতিহাসের স্বাদ পেতে এখানে আসতেই হবে।
- সরস্বতী নদীর অবশিষ্টাংশ: ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হিসেবে যা আজও বয়ে চলেছে।
ছাত্রছাত্রীদের জন্য সংক্ষিপ্ত নোট (এক নজরে)
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| অবস্থান | হুগলি জেলা, পশ্চিমবঙ্গ। |
| প্রধান নদী | সরস্বতী (প্রাচীনকালে)। |
| পর্তুগিজ নাম | পোর্তো পিকোলা (Porto Piccolo)। |
| বিখ্যাত ব্যক্তি | উদ্ধারণ দত্ত ঠাকুর। |
| পতনের প্রধান কারণ | নদীর নাব্যতা হ্রাস ও হুগলি বন্দরের উত্থান। |
উপসংহার
আদি সপ্তগ্রাম আজ হয়তো তার পুরনো জৌলুস হারিয়েছে, কিন্তু মাটির গভীরে আর জরাজীর্ণ স্থাপত্যের মাঝে আজও বাংলার মধ্যযুগের ইতিহাস জীবন্ত হয়ে আছে। এই স্থানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথে সাথে কীভাবে একসময়ের বিশ্বখ্যাত মহানগরী কেবল একটি নিভৃত গ্রামে পরিণত হতে পারে। বাংলার ইতিহাসকে জানতে হলে আদি সপ্তগ্রামকে জানা অপরিহার্য।



