ত্রিবেণী পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার এক জনপদ। প্রাচীন বন্দর সপ্তগ্রামের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে মধ্যযুগীয় বাংলার শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান।

ত্রিবেণী পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলার প্রাচীনতম জনপদগুলোর মধ্যে একটি অনন্য স্থান। বহু সহস্রাব্দ আগে থেকেই এটি ধর্মীয়, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রাচীন ভারতের বহু ঘটনা, কিংবদন্তি, সাধক-সন্ন্যাসীর পদচিহ্ন এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের সাক্ষী এই ছোট্ট অঞ্চলটি। স্বাধীনতা লাভের পূর্ব পর্যন্ত ত্রিবেণীর দীর্ঘ ইতিহাস নানা উত্থান-পতনে ভরপুর—যা ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য যেমন রোমাঞ্চকর, তেমনি আজকের পর্যটকের জন্যও এক অনাবিল অনুসন্ধানের জায়গা।
নদী, কীর্তিস্তম্ভ, সাধনভূমি এবং বাণিজ্যবন্দর—সব মিলিয়ে ত্রিবেণী এক বহুমাত্রিক ঐতিহ্যের ধারক। এই প্রবন্ধে আমরা ত্রিবেণীর ইতিহাসের কালক্রমিক ধারায় প্রবেশ করব—প্রাচীন যুগ, মধ্যযুগ, ইসলামি শাসনকালের পরিবর্তন, মুঘল ও নবাব আমল, ঔপনিবেশিক প্রভাব, এবং অবশেষে স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনৈতিক উত্তাল সময়। পর্যটকদের জন্যও এখানে থাকছে বেশ কিছু দেখার জায়গার উল্লেখ।
নামের উৎস ও ভৌগোলিক গুরুত্ব
‘ত্রিবেণী’ শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘ত্রি’ (তিন) এবং ‘বেণী’ (প্রবাহ) থেকে। প্রবাদ ও পুরাণ অনুযায়ী, এখানে ভাগীরথী (গঙ্গা), যমুনা (বা কঞ্চরপাড়া খাল) এবং সরস্বতী নদী এসে মিলিত হয়েছে। উত্তর ভারতের প্রয়াগরাজ (এলাহাবাদ) যেখানে ‘যুক্তবেণী’ নামে পরিচিত, সেখানে বাংলার এই সঙ্গমস্থলকে বলা হয় ‘মুক্তবেণী’। কারণ বিশ্বাস করা হয় যে, প্রয়াগে জট পাকিয়ে থাকা সরস্বতী নদী এখানে এসে মুক্ত হয়েছে।
ভৌগোলিক দিক থেকে প্রাচীন বাংলায় ত্রিবেণীর গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। এটি ছিল তৎকালীন দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলার প্রধান বন্দর ‘সপ্তগ্রাম’-এর প্রবেশদ্বার। বড় বড় সামুদ্রিক জাহাজগুলি সরস্বতী নদী দিয়ে সপ্তগ্রামে ঢুকতে না পারলে ত্রিবেণীতেই নোঙর করত। এখান থেকেই ছোট নৌকায় পণ্য সপ্তগ্রামে নিয়ে যাওয়া হতো। তাই ত্রিবেণী ছিল একাধারে ধর্মীয় সঙ্গম এবং বাণিজ্যের সঙ্গম।
১. প্রাচীন ও বৈদিক যুগে ত্রিবেণী – এক পবিত্র তীর্থক্ষেত্র

ত্রিবেণীর প্রাচীনতার উল্লেখ পাওয়া যায় বৈদিক সাহিত্য এবং পরবর্তী পুরাণগুলিতেও। বিশ্বাস করা হয়, গঙ্গার একটি প্রাকৃতিক মোহনা থেকে বহু উপনদী বের হয়ে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে যেত। সেই নদীগুলির মধ্যে “জামুনা” ও “সরস্বতী” আজ প্রবাহের চরিত্র বদলে হারিয়ে গেলেও তাদের কীর্তি ইতিহাসে অমর হয়ে রয়েছে।
পুরাণ মতে, ত্রিবেণী সঙ্গমে স্নান করলে পাপমোচন হয়—এমন ধারণা বাংলা অঞ্চলে বহু প্রাচীনকাল থেকেই প্রচলিত ছিল। এর ফলে বৌদ্ধ, জৈন ও হিন্দু—তিন ধারার ধর্মীয় সাধক ও গৃহস্থরা এখানে বসতি স্থাপন করেন। সেই সময় তীর্থযাত্রা ও নদীবাণিজ্যের জন্য ত্রিবেণীর ভূগোলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
পুরোনো নদীপথের কেন্দ্রীয় ভূমিকা
গঙ্গার প্রবাহ ত্রিবেণীর ঘাটকে পূর্ব ভারতের এক প্রধান বাণিজ্যপথের কেন্দ্র করে তুলেছিল। উত্তর ভারতের সঙ্গে বঙ্গীয় নগরগুলোর সংযোগ এই নদীপথের মধ্য দিয়েই ছিল। ফলে গঙ্গার স্রোত বদলালেও ত্রিবেণীর পরিচয় বদলায়নি—বরং তা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
আরও পড়ুন – প্রাসাদ-নগরী ধান্যকুড়িয়া: বাংলার বুকে এক টুকরো ইউরোপ
২. মধ্যযুগে ত্রিবেণী—সাহিত্যের উন্মেষ ও সাধক-সন্ন্যাসীদের কেন্দ্র

এক ঐতিহাসিক সাহিত্য-ভূমি
মধ্যযুগে বাংলা সাহিত্যের বিকাশে ত্রিবেণীর নাম আলাদা মর্যাদা পায়। অনন্ত বচন, ত্রিবেণী সাহিত্যের দলিল, এবং বহু পুরনো লিপি প্রমাণ করে যে ত্রিবেণী ছিল জ্ঞানচর্চার এক গুরুত্বপূর্ণ উৎসস্থল। বেদপাঠ, পুরাণ-কথন, সংস্কৃত শিক্ষার মঠ ও আশ্রম এখানে গড়ে ওঠে।
চৈতন্যদেবের আগমন
১৫শ শতকে শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর ত্রিবেণী আগমন এই অঞ্চলকে নতুন ধর্মীয় উন্মাদনায় ভরিয়ে তোলে।
চৈতন্যভাগবত ও চৈতন্যচরিতামৃত-এ উল্লেখ রয়েছে—ত্রিবেণীতে স্নান শেষে তিনি নবদ্বীপে ফিরে যান এবং তাঁর ভক্তেরা ত্রিবেণীকে মহাপবিত্র স্থান হিসেবে মান্য করে আসেন। আজও পর্যটকরা ত্রিবেণী ঘাটে সেই স্মৃতি খুঁজে পান।
৩. মুসলিম শাসনকালে ত্রিবেণী—সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের পরিবর্তন

১৩শ শতকের শুরুতে বাংলায় ইসলামি শাসন প্রতিষ্ঠার পর ত্রিবেণীর রাজনীতি ও বাণিজ্যে আমূল পরিবর্তন আসে। সেনরাজ্যের পতনের পর গৌড়ের মুসলিম সুলতানরা নদীবন্দরগুলোর গুরুত্ব বাড়ান। ত্রিবেণী তখন বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রশাসনিক দিক থেকেও কার্যকর ভূমিকা নেয়।
মন্দির, মসজিদ ও সমন্বয়ের চিহ্ন
এই সময়ে ত্রিবেণী অঞ্চলে বহু মসজিদ এবং খানকাহ প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে মন্দির-ঘাটের ঐতিহ্যও সমান জোরে টিকে ছিল। ইতিহাস বলে—ত্রিবেণীতে হিন্দু-মুসলিম সংস্কৃতির এক সহাবস্থান তৈরি হয়েছিল, যা অঞ্চলের সামাজিক চরিত্রকে সমৃদ্ধ করে।
বন্দর সুবিধা ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ
ত্রিবেণীর নদীপথ দিয়ে সুতী কাপড়, লোহার সামগ্রী, ধান, এবং চন্দন কাঠ সহ বহু পণ্য বাংলার অভ্যন্তরীণ অঞ্চল থেকে গৌড় ও উত্তর ভারতের বাজারে যেত। এর ফলে এলাকাটি সমৃদ্ধ, কর্মচঞ্চল ও বহুজাতিক জনপদে পরিণত হয়।
আরও পড়ুন – বিজ্ঞানের জানা-অজানা ৫০টি মজার তথ্য
৪. মুঘল ও নবাব আমলে ত্রিবেণী—এক প্রভাবশালী নৌ-বন্দর
১৬শ থেকে ১৮শ শতকের মধ্যে মুঘল শাসনামলে ত্রিবেণীর গুরুত্ব নতুন মাত্রা পায়। গঙ্গার তীর ধরে সেনানিবাস, নৌ-ঘাট এবং শুল্কঘর গড়ে ওঠে। মুঘল প্রশাসনের কাছে ত্রিবেণী ছিল নদীপথ রক্ষার একটি কৌশলগত স্থান।
নদীবাণিজ্যের সুদিন
মুঘল আমলে হুগলি নদীর ধার ধরে পর্তুগিজ, ফরাসি, ডাচ ও ব্রিটিশ বণিকদের আনাগোনা বাড়ে। ত্রিবেণীও এর প্রভাব অনুভব করে, যদিও প্রধান কুঠিগুলি ছিল হুগলি, চন্দননগর ও সুতানুটিতে। তবুও ত্রিবেণী ছিল ঐ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথের একটি অপরিহার্য অংশ।
অঞ্চলের কৃষি ও বসতি বিস্তার
গঙ্গার পলিযুক্ত ভূমি কৃষির জন্য অত্যন্ত উপযোগী ছিল। ফলে গ্রামসমূহ দ্রুত বাড়তে থাকে। স্থানীয় জমিদার ও প্রজাদের উৎপাদন বৃদ্ধিতে ত্রিবেণী বাজার কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
৫. ব্রিটিশ আমলে ত্রিবেণী—নতুন অবকাঠামো, রেলপথ ও রাজনৈতিক আন্দোলন

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর বঙ্গদেশে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন প্রতিষ্ঠা করে এবং ত্রিবেণীর উপরে তাঁদের প্রশাসনিক নজর আরও বাড়ে।
রেলপথ ও শিল্পায়ন
১৮৫৪ সালে হাওড়া-রানাঘাট রেললাইন চালুর পরে ত্রিবেণী আরও বেশি সংযুক্ত হয়ে পড়ে। ত্রিবেণী স্টেশন স্থানীয় ব্যবসাকে নতুন উত্থান দেয়। পরবর্তীকালে ত্রিবেণীর আশপাশে ছোট শিল্পাঞ্চল, গুদামঘর, নৌ-ঘাট এবং বাজার গড়ে ওঠে।
যদিও বড় শিল্প গড়ে ওঠেনি, কিন্তু কৃষিপণ্য পরিবহনে ত্রিবেণী কেন্দ্রীয় ভূমিকা পালন করত।
শিক্ষা ও সমাজসংস্কার
ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সমাজ সংস্কারক ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিদের উদ্যোগে ত্রিবেণীতে পাঠশালা, সংস্কৃত টোল এবং বাংলা শিক্ষার কেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। এর ফলে ত্রিবেণী ধীরে ধীরে এক সুশিক্ষিত জনপদে পরিণত হয়।
ধর্মীয় উৎসবের বিকাশ
ত্রিবেণী সঙ্গমে কালীপূজা, গঙ্গাস্নান, ম্যাঘী পূর্ণিমা, রথযাত্রা ইত্যাদি উৎসব তখন অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হুগলি জেলার চারধার থেকে মানুষ তীর্থ করতে আসতেন। এই ধর্মীয় ঐতিহ্য পরবর্তী পর্যটন গঠনের মূল ভিত্তি।
৬. স্বদেশি আন্দোলন ও জাতীয়তাবাদ—ত্রিবেণীর জাগরণ
১৯০৫ সালের বঙ্গভঙ্গ ঘোষণার পর সমগ্র বাংলায় যেভাবে স্বদেশি আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, ত্রিবেণীও তার ব্যতিক্রম ছিল না। স্থানীয় শিক্ষিত যুবক, ব্যবসায়ী, শিক্ষক ও কৃষকরা আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নেয়।
স্বদেশি শিল্প, বয়কট ও যুব সংঘের ভূমিকা
ত্রিবেণীতে দেশি বস্ত্র ব্যবহার, বিদেশি পণ্যের বয়কট এবং দেশীয় কারিগরদের উন্নয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়। যুব সমাজের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা বৃদ্ধি পায়। গোপন সভা, স্বদেশি প্রবন্ধ পাঠ, নাট্যোৎসব—সবকিছুই আন্দোলনের ইন্ধন যোগাত।
বিপ্লবী কার্যকলাপের প্রভাব
হুগলি, চুঁচুড়া, বর্ধমান, হাওড়া—এই এলাকাগুলিতে বিপ্লবী দলগুলির কার্যকলাপ ব্যাপক ছিল। ত্রিবেণীর বহু যুবকই বিপ্লবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। যদিও ত্রিবেণী কোনও বড় সংঘর্ষের কেন্দ্র হয়নি, তবুও জাতীয় আন্দোলনের স্রোত এখানে গভীরভাবে ছুঁয়ে গিয়েছিল।
৭. গান্ধীয় যুগে ত্রিবেণী—অসহযোগ থেকে ভারত ছাড়ো আন্দোলন
মহাত্মা গান্ধীর নেতৃত্বে অসহযোগ আন্দোলন, সিভিল অবিডিয়েন্স এবং ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময়ে ত্রিবেণী ও আশপাশের এলাকাগুলি রাজনৈতিকভাবে উত্তপ্ত ছিল। স্থানীয় নেতা ও সাধারণ মানুষ সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
বিদ্যালয় ও গ্রামে গ্রামে জাতীয় শিক্ষা আন্দোলন
অনেক স্থানে সরকারি বিদ্যালয়ের পরিবর্তে জাতীয় বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ছাত্র-যুবকরা স্বেচ্ছায় ইংরেজি শাসনের বিরুদ্ধে প্রচারে নেমে পড়েন।
নারীরাও খাদিপরিচালনা, সভা-সমিতি সংগঠনে অংশ নেন।
গ্রামীণ প্রতিরোধ ও ব্রিটিশ প্রশাসনের নজরদারি
ত্রিবেণীর ঘাট ও রেলপথের উপরে ব্রিটিশ প্রশাসন কড়া নজরদারি বসায়, কারণ এই পথ ধরে আন্দোলনকারীরা যাতায়াত করতেন। কয়েকটি ছোট সংঘর্ষ, গ্রেফতার ও জরিমানার ঘটনাও নথিবদ্ধ রয়েছে।
৮. স্বাধীনতার প্রাক্কালে ত্রিবেণী—অবক্ষয় থেকে পুনরুত্থানের অপেক্ষা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে-পরে গঙ্গার প্রবাহ ক্রমশ সরতে শুরু করে। ফলে ত্রিবেণীর কিছু পুরনো বন্দরঘাট অকার্যকর হয়ে পড়ে। তবুও তীর্থযাত্রা, কৃষি এবং স্থানীয় ব্যবসার ওপর ভিত্তি করে অঞ্চলটি তার অস্তিত্ব রক্ষা করে।
১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় ত্রিবেণী একটি শান্ত, ঐতিহ্যপূর্ণ, ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক জনপদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত ছিল। তার হাজার বছরের ইতিহাস এই ছোট্ট শহরটিকে এক মূল্যবান সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত করেছে।
পর্যটকদের জন্য ত্রিবেণীর উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

একজন পর্যটকের জন্য ত্রিবেণী আজও এক ‘ওপেন এয়ার মিউজিয়াম’ বা উন্মুক্ত জাদুঘরের মতো। স্বাধীনতার পূর্ববর্তী ইতিহাসকে ছুঁয়ে দেখতে চাইলে আপনাকে অবশ্যই নিচের স্থানগুলি ভ্রমণ করতে হবে:
ক. জাফর খান গাজি মসজিদ ও দরগা: ১২৯৮ খ্রিস্টাব্দে নির্মিত এই মসজিদটি বাংলার ইন্দো-ইসলামিক স্থাপত্যের আদি নিদর্শন। কালো ব্যাসল্ট পাথরে তৈরি এই ইমারতের গায়ে হিন্দু ও মুসলিম স্থাপত্যের অদ্ভুত মেলবন্ধন আপনাকে মুগ্ধ করবে।
খ. ত্রিবেণী সঙ্গম ও ঘাট: যদিও সরস্বতী নদী আজ লুপ্তপ্রায়, তবুও গঙ্গার এই ঘাটে দাঁড়ালে এক পবিত্র অনুভূতি হয়। পূর্ণিমা বা সংক্রান্তির দিনে এখানে স্নান করা বা নিছক গঙ্গার হাওয়া খাওয়া এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
গ. বেণীমাধব মন্দির: প্রাচীন এই মন্দিরের চূড়া এবং গঠনশৈলী বাংলার মন্দির স্থাপত্যের বিবর্তনের সাক্ষ্য দেয়।
ঘ. হংসেশ্বরী ও অনন্ত বাসুদেব মন্দির (বাঁশবেড়িয়া): ত্রিবেণী থেকে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই মন্দির দুটি স্থাপত্যের বিস্ময়। রাজা নৃসিংহদেব রায় মহাশয় এবং তাঁর স্ত্রী রানী শঙ্করীর তৈরি হংসেশ্বরী মন্দিরটি তান্ত্রিক মতে মানবদেহের ‘ষড়চক্র’-এর আদলে নির্মিত, যা ভারতে বিরল। অনন্ত বাসুদেব মন্দিরটি তার অসামান্য টেরাকোটা কাজের জন্য বিখ্যাত।
উপসংহার
ত্রিবেণীর ইতিহাস শুধু নদীর ইতিহাস নয়—এটি মানুষের বসতি, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, ধর্ম, সাহিত্য এবং রাজনীতির বহু যুগের সমন্বিত দলিল। প্রাচীন বৈদিক যুগ থেকে শুরু করে ব্রিটিশ শাসনের শেষ অবধি ত্রিবেণী এক বহুসাংস্কৃতিক, বাণিজ্যনির্ভর এবং ঐতিহ্যবাহী জনপদ হিসেবে টিকে এসেছে।
ইতিহাসপ্রেমী পাঠকের কাছে ত্রিবেণী এক অমূল্য গবেষণাক্ষেত্র, আর পর্যটকের কাছে এটি শান্ত নদীতীরবর্তী এক মনোমুগ্ধকর ভ্রমণস্থান—যেখানে প্রতিটি ঘাট, প্রতিটি গলি অতীতের কথা বলে। নদীর স্রোত যেমন বদলায়, তেমনি বদলায় সময়ের ধারাও—কিন্তু ত্রিবেণীর ঐতিহ্য অমোঘভাবে টিকে আছে, আজও।
ভ্রমণ টিপস:
- কিভাবে যাবেন: হাওড়া বা শিয়ালদহ থেকে লোকাল ট্রেনে সহজেই ত্রিবেণী বা বাঁশবেড়িয়া স্টেশনে নামা যায়। সড়কপথেও কলকাতা থেকে এটি সহজগম্য (প্রায় ৭০ কিমি)।
- কখন যাবেন: সারা বছরই যাওয়া যায়, তবে শীতকাল (নভেম্বর-ফেব্রুয়ারি) ঘোরার জন্য সবচেয়ে আরামদায়ক। কুম্ভমেলা বা সংক্রান্তির সময় গেলে স্থানীয় সংস্কৃতির রূপ দেখা যাবে।
ত্রিবেণীর এই হাজার বছরের পথচলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, নদী হয়তো পথ বদলায়, কিন্তু ইতিহাস তার ছাপ রেখে যায় পাথরে, ইটে আর মানুষের বিশ্বাসে।



