কজাখস্থানের উত্তরাংশে রয়েছে কালাচি নামে একটি গ্রাম যেখানে কোন অজানা কারনে মানুষ হঠাৎ গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন পড়ছেন। একে ‘ঘুমের গ্রাম’ নামেও ডাকা হয়।

মানুষের জীবনে ঘুম এক প্রাকৃতিক চাহিদা। সাধারণত রাতেই আমরা গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হই। কিন্তু কজাখস্থানে এমন একটি গ্রাম আছে, যেখানে ঘুম মানুষের জন্য হয়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর অভিশাপ। কজাখস্থানের উত্তরাঞ্চলের প্রত্যন্ত গ্রাম কালাচি আজ পরিচিত “ঘুমের গ্রাম” নামে।
অদ্ভুতুড়ে এই ঘটনার সূত্রপাত
২০১০ সালে প্রথমবার সেখানে লক্ষ্য করা যায় অদ্ভুত এক ঘটনা। গ্রামের মানুষ হঠাৎ করেই যেকোনো সময়, যেকোনো অবস্থায় গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়তে শুরু করেন। ২০১৩ সাল থেকে এ ঘটনা আরও প্রকট রূপ নেয়। কেউ স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে দাঁড়িয়ে, কেউ মোটরসাইকেল চালাতে চালাতে, আবার কেউ বা হাঁটতে হাঁটতেই ঘুমিয়ে পড়েন। কারও ঘুম দুই দিন স্থায়ী হয়, আবার কেউ কেউ আট দিন পর্যন্ত ঘুমিয়ে থাকেন।
উপসর্গ ও ভয়াবহতা
এই রহস্যজনক রোগে আক্রান্ত হয়ে জেগে ওঠার পর মানুষের স্মৃতিভ্রংশ হয়, দেখা দেয় প্রচণ্ড দুর্বলতা, মাথা ঝিম ধরা, বমি-বমি ভাব এবং অনেকের ক্ষেত্রে দৃষ্টিভ্রমও ঘটে। আক্রান্তদের হাঁটাচলায় অক্ষমতাও দেখা যায়। কালাচির প্রায় ১৪ শতাংশ মানুষ এ রোগে ভুগছেন। পাশাপাশি পাশের শহর ক্রাসনোগোরস্কও ধীরে ধীরে আক্রান্ত হয়েছে।
আরও পড়ুন. বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক আয়না কি, কোথায়?
‘হঠাৎ ঘুম’ এর সম্ভাব্য কারণ
- চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা এখনও এর সঠিক কারণ খুঁজে পাননি। কেউ কেউ মনে করেন, মস্তিষ্কে অস্বাভাবিক তরলের উপস্থিতির কারণেই এমনটি হতে পারে। আবার কেউ সন্দেহ করছেন মেনিনজাইটিস জাতীয় ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার প্রভাবকে।
- অন্যদিকে স্থানীয়দের ধারণা, সোভিয়েত আমলের পরিত্যক্ত ইউরেনিয়াম খনি থেকে নির্গত তেজস্ক্রিয় পদার্থই এর মূল কারণ। আশেপাশের মাটি ও জলে তেজস্ক্রিয় উপাদানের উপস্থিতিও পাওয়া গেছে। তবে আশ্চর্যের বিষয় হলো, খনিতে কাজ করা শ্রমিকরা কখনও এ রোগে আক্রান্ত হননি।
- আরও একদল গবেষক মনে করেন, এখানে কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের মাত্রাতিরিক্ত উপস্থিতি থাকতে পারে। বিশেষ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে ধোঁয়া ও গ্যাস ওপরে না উঠে আশেপাশে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে মাথাব্যথা, অবসাদ ইত্যাদি হওয়া সম্ভব হলেও দিনের পর দিন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকার বিষয়টি এখনো ব্যাখ্যাতীত।
গ্রামের বহু মানুষ ভয় আর অনিশ্চয়তায় ভুগছেন। কেউ কেউ সন্তানদের নিয়ে অন্য শহরে চলে যাচ্ছেন, আবার অনেকে জন্মভূমি ছেড়ে যেতে চাইছেন না। একসময় কর্মচাঞ্চল্যে ভরা শহর ক্রাসনোগোরস্ক এখন প্রায় জনশূন্য হয়ে পড়েছে। কালাচি গ্রামও ধীরে ধীরে পরিণত হচ্ছে এক ভুতুড়ে জনপদ।
রহস্য এখনো অমীমাংসিত
বিগত দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে এই রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা হলেও বিজ্ঞানীরা আজও কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। তাই কালাচি আজও রয়ে গেছে এক অমীমাংসিত রহস্য, যেখানে ঘুম একদিকে মানুষের প্রাকৃতিক চাহিদা হলেও অন্যদিকে মৃত্যুভয়ের মতো আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এ কারণেই কালাচিকে ‘মায়াপুরীর গ্রাম’ও বলা হয়, যেখানে বাস্তব জীবনে রূপকথার মতো হঠাৎ ঘুম মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করে।



