হেলেন কেলার ছিলেন অন্ধ ও বধির তবুও শিক্ষালাভ করেছেন, বই লিখেছেন, বক্তৃতা দিয়েছেন এবং সারা বিশ্বে প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য সংগ্রাম করেছেন।

বিশ্ব ইতিহাসে এমন কিছু মানুষ আছেন যাঁদের জীবন কাহিনি মানুষের মনে অমলিন ছাপ ফেলে গেছে। তাঁদের মধ্যে অন্যতম হেলেন অ্যাডামস কেলার। তাঁর জীবন আমাদের শিখিয়ে দেয়, দৃঢ় মনোবল আর অক্লান্ত পরিশ্রম থাকলে কোনো বাধাই অসম্ভব নয়। স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য হেলেন কেলার কেবল একটি নাম নয়, বরং এক অনুপ্রেরণার উৎস।
হেলেন কেলার : তাঁর জন্ম ও শৈশব
হেলেন কেলার জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮০ সালের ২৭ জুন, যুক্তরাষ্ট্রের আলাবামা অঙ্গরাজ্যের টাসকুম্বিয়া নামের একটি ছোট শহরে। তিনি ছিলেন তাঁর পরিবারের প্রথম সন্তান। জন্মের পর প্রথম দেড় বছর স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিলেন। কিন্তু ১৯ মাস বয়সে এক ধরনের মারাত্মক অসুখে (সম্ভবত মেনিনজাইটিস বা স্কারলেট ফিভার) আক্রান্ত হয়ে তিনি একসাথে তাঁর দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি হারান।
এই আকস্মিক পরিবর্তন তাঁর পরিবারকে হতাশ করে তোলে। এত ছোট্ট মেয়ের সাথে যোগাযোগ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তিনি কিছুটা রাগী ও জেদি স্বভাবের হয়ে ওঠেন, কারণ চারপাশের মানুষ কী বলছে বা করছে তা তিনি বুঝতে পারতেন না। তবে তাঁর বাবা-মা আশা ছাড়েননি। তাঁরা চেয়েছিলেন, কোনোভাবে মেয়েটিকে শিক্ষা ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে।
অ্যানি সুলিভান – আলোর পথপ্রদর্শক
হেলেন কেলারের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় ১৮৮৭ সালে, যখন অ্যানি সুলিভান নামের এক তরুণী শিক্ষক তাঁর জীবনে আসেন। অ্যানি সুলিভান নিজেও ছোটবেলায় প্রায় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন এবং বিশেষ চিকিৎসার মাধ্যমে আবার আংশিক দৃষ্টি ফিরে পান। তাই তিনি জানতেন অন্ধত্বের কষ্ট কী।
অ্যানি সুলিভান হেলেনকে শেখাতে শুরু করেন এক অভিনব পদ্ধতিতে। তিনি হেলেনের হাতে ইংরেজি বর্ণমালা আকারে শব্দ বানিয়ে লিখতেন। যেমন— জলের ধারা হাতে ঢেলে দিয়ে তিনি হেলেনের হাতে “W-A-T-E-R” বানান লিখতেন। হেলেন প্রথমে বুঝতে পারতেন না, কিন্তু একসময় তাঁর মনে আলো জ্বলে ওঠে। তিনি বুঝতে পারেন প্রতিটি বস্তুরই একটি নাম আছে এবং সেই নাম হাতের মাধ্যমে শেখা যায়। এই ঘটনাই তাঁর শিক্ষাজীবনের প্রথম দরজা খুলে দেয়।
আরও পড়ুন – জানা অজানা মজার তথ্য
শিক্ষা ও একাডেমিক জীবন
অ্যানি সুলিভানের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় হেলেন দ্রুত নতুন শব্দ, বাক্য ও ধারণা আয়ত্ত করতে থাকেন। তিনি ব্রেইল লিপির মাধ্যমে পড়তে শিখেন এবং বিশেষ কৌশলে কথা বলারও চেষ্টা করেন।
১৯০০ সালে হেলেন কেলার ভর্তি হন র্যাডক্লিফ কলেজে। সেখানে তিনি সুলিভানের সাহায্যে পড়াশোনা চালিয়ে যান। কল্পনা করা যায় কতটা কঠিন ছিল এই কাজ—ক্লাসে তিনি শুনতে পান না, দেখতে পান না, তবুও অ্যানি সুলিভান প্রতিটি পাঠ্যবই তাঁকে স্পর্শের মাধ্যমে বোঝাতেন। ১৯০৪ সালে হেলেন কেলার স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন বিশ্বের প্রথম অন্ধ ও বধির ব্যক্তি যিনি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক সম্পন্ন করেন।
সাহিত্যকর্ম ও রচনা

হেলেন কেলার কেবল পড়াশোনাই করেননি বরং প্রচুর লিখেছেন। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত বই হলো “The Story of My Life” (আমার জীবনের গল্প), যেখানে তিনি নিজের শৈশব, সংগ্রাম ও শিক্ষার কাহিনি লিখেছেন। এই বই আজও সারা বিশ্বের মানুষকে অনুপ্রেরণা দেয়। এছাড়াও তিনি বহু প্রবন্ধ, চিঠি এবং বক্তৃতা লিখেছেন, যেখানে শিক্ষা, সমাজসেবা ও মানবিক মূল্যবোধের কথা উল্লেখ রয়েছে।
সমাজসেবামূলক কাজ
হেলেন কেলার সারা জীবন কাজ করেছেন অন্ধ, বধির ও প্রতিবন্ধী মানুষের জন্য। তিনি বিভিন্ন সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, বক্তৃতা দিয়েছেন এবং বিভিন্ন দেশে ভ্রমণ করেছেন। তাঁর মূল বার্তা ছিল—”শারীরিক প্রতিবন্ধকতা মানুষের স্বপ্ন ও সাফল্যের পথে বাধা হতে পারে না।”
তিনি দারিদ্র্য, নারীর অধিকার, শিক্ষা এবং শান্তি নিয়েও কথা বলেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি আহত সৈনিকদের হাসপাতালে গিয়ে সাহস জুগিয়েছেন। তাঁর জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপ মানবকল্যাণে উৎসর্গিত ছিল।
আরও পড়ুন – ‘গরুর বুদ্ধি’ সুকুমার রায়ের ছোট গল্প, হাসির গল্প
হেলেন কেলারের শিক্ষণ
হেলেন কেলারের জীবন আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
- অধ্যবসায় ও পরিশ্রম
যত বড় সমস্যাই আসুক, চেষ্টা চালিয়ে গেলে সমাধান পাওয়া সম্ভব। - ইচ্ছাশক্তির শক্তি
চোখে দেখতে না পারা বা কানে শুনতে না পাওয়াই তাঁর জীবনের সবকিছু নির্ধারণ করেনি। বরং তাঁর ইচ্ছাশক্তি তাঁকে মহৎ করে তুলেছে। - শিক্ষার গুরুত্ব
শিক্ষা শুধু বই পড়া নয়, বরং জীবনকে আলোকিত করে। হেলেন কেলার প্রমাণ করেছেন যে শিক্ষা মানুষের প্রকৃত শক্তি। - সহানুভূতি ও সমাজসেবা
তিনি শিখিয়েছেন অন্যের কষ্ট বুঝে পাশে দাঁড়ানোই মানুষের আসল মানবিকতা। - আত্মবিশ্বাস
নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত না করে, আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে সাফল্য অর্জন সম্ভব।
উপসংহার
হেলেন কেলার-এর জীবনকাহিনি কেবল একটি ব্যক্তিগত সংগ্রামের গল্প নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক মহামূল্যবান শিক্ষা। তাঁর সাহস, ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও সমাজসেবার মানসিকতা আজও লক্ষ মানুষের প্রেরণার উৎস।
স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য তাঁর গল্প আমাদের শেখায় —
- কখনো হাল ছাড়বে না,
- নিজের স্বপ্নের পেছনে লেগে থাকবে,
- এবং সবসময় অন্যের পাশে দাঁড়াবে।
তাঁর নিজের কথায়— “The best and most beautiful things in the world cannot be seen or even touched – they must be felt with the heart.” (পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিস চোখে দেখা যায় না, হাতেও ধরা যায় না, শুধু হৃদয় দিয়ে অনুভব করা যায়)।



