রানাভালোনা তৃতীয় ছিলেন মাদাগাস্কারের শেষ স্বাধীন রাণী। দেশপ্রেম, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার প্রতি অটল ভালোবাসা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়েছেন।

ইতিহাস মানে শুধু তারিখ আর যুদ্ধের গল্প নয়—ইতিহাস মানে মানুষের স্বপ্ন, সংগ্রাম আর স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা। এমনই এক অনন্য ইতিহাসের চরিত্র হলেন রানাভালোনা তৃতীয় (Ranavalona III), মাদাগাস্কারের শেষ রাণী। তিনি এমন এক সময়ে সিংহাসনে বসেছিলেন, যখন ইউরোপীয় উপনিবেশবাদ আফ্রিকা ও ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলিকে গ্রাস করছিল। তাঁর শাসনকাল ছিল তুলনামূলকভাবে সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর দেশপ্রেম, আত্মসম্মান ও স্বাধীনতার প্রতি অটল ভালোবাসা আজও শিক্ষার্থীদের জন্য এক গভীর অনুপ্রেরণা।
এই প্রবন্ধে আমরা সহজ ভাষায় জানব—রানাভালোনা তৃতীয় কে ছিলেন, কেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ, আর কীভাবে তিনি পরাধীনতার মধ্যেও মাথা উঁচু করে নিজের দেশের মর্যাদা রক্ষা করার চেষ্টা করেছিলেন।
শৈশব ও পারিবারিক পটভূমি
রানাভালোনা তৃতীয় জন্মগ্রহণ করেন ২২ নভেম্বর, ১৮৬১ সালে। তাঁর আসল নাম ছিল রাযাফিন্দ্রাহেতি (Razafindrahety)। তিনি মেরিনা রাজবংশের একজন সদস্য ছিলেন, যে রাজবংশ বহু বছর ধরে মাদাগাস্কারের কেন্দ্রীয় অংশ শাসন করত। ছোটবেলা থেকেই তিনি রাজকীয় পরিবেশে বেড়ে ওঠেন এবং দেশ পরিচালনা, কূটনীতি ও সংস্কৃতি সম্পর্কে শিক্ষা লাভ করেন।
তাঁর শিক্ষায় ইউরোপীয় প্রভাব ছিল, কিন্তু মননে তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ মাদাগাস্কারীয়। এই দ্বৈত শিক্ষাই পরবর্তীকালে তাঁকে বিদেশি শক্তির সঙ্গে আলোচনায় দক্ষ করে তোলে, আবার নিজের দেশের ঐতিহ্য রক্ষায়ও দৃঢ় করে।
আরও পড়ুন – রাজা চুলালংকর্ন (পঞ্চম রামা): ঔপনিবেশিকতাকে হারিয়ে থাইল্যান্ডকে আধুনিক করেন
সিংহাসনে আরোহণ: এক কঠিন সময়ের শুরু
১৮৮৩ সালে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে তিনি মাদাগাস্কারের রাণী হিসেবে সিংহাসনে আরোহণ করেন। কিন্তু এই রাজত্ব কোনো স্বস্তির ছিল না। ফ্রান্স তখন মাদাগাস্কারকে উপনিবেশে পরিণত করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। একদিকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত ফরাসি সেনাবাহিনী, অন্যদিকে একটি স্বাধীন দ্বীপ রাষ্ট্র—সংঘর্ষ অনিবার্য ছিল।
রানাভালোনা তৃতীয় বুঝতে পেরেছিলেন, যুদ্ধের পাশাপাশি কূটনীতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। তিনি চেষ্টা করেছিলেন আলোচনার মাধ্যমে দেশের সার্বভৌমত্ব বজায় রাখতে।
দেশপ্রেম ও স্বাধীনতার প্রতি অটল বিশ্বাস
রানাভালোনা তৃতীয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়—তিনি ছিলেন স্বাধীনতার প্রতীক। ফরাসি চাপে পড়েও তিনি সহজে আত্মসমর্পণ করেননি। তিনি একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর করতে বাধ্য হলেও, অন্তরে তিনি কখনোই মাদাগাস্কারকে ফরাসি উপনিবেশ হিসেবে মেনে নেননি।
তিনি প্রায়ই বলতেন,
“একটি জাতির আত্মা কেড়ে নেওয়া মানে শুধু ভূমি দখল নয়—এ তার সম্মান কেড়ে নেওয়া।”
এই চিন্তাভাবনাই তাঁকে আজও একজন অনুপ্রেরণাময় নেত্রী হিসেবে স্মরণীয় করে রেখেছে।
ফরাসি উপনিবেশবাদ ও রাজ্যের পতন
১৮৯৫ সালে ফরাসি বাহিনী আন্টানানারিভো (রাজধানী) দখল করে নেয়। পরের বছর, ১৮৯৬ সালে, মাদাগাস্কার আনুষ্ঠানিকভাবে ফরাসি উপনিবেশে পরিণত হয়। রানাভালোনা তৃতীয়কে সিংহাসনচ্যুত করা হয়।
এটি ছিল শুধু একজন রাণীর পতন নয়—এটি ছিল একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের আত্মমর্যাদায় আঘাত।
আরও পড়ুন – দীঘার ইতিহাস: অজানা ‘বীরকুল’ থেকে প্রাচ্যের ‘ব্রাইটন’ হয়ে ওঠা
নির্বাসিত জীবন: তবু অটুট আত্মসম্মান

সিংহাসন হারানোর পর রানাভালোনা তৃতীয়কে প্রথমে রিইউনিয়ন দ্বীপে এবং পরে আলজেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠানো হয়। তিনি আর কখনো নিজের প্রিয় মাতৃভূমি মাদাগাস্কারে ফিরে যেতে পারেননি।
তবু নির্বাসিত জীবনেও তিনি নিজের পরিচয় ভুলে যাননি। তিনি নিজেকে সবসময় “মাদাগাস্কারের রাণী” হিসেবেই পরিচয় দিতেন। তাঁর জীবন প্রমাণ করে—ক্ষমতা চলে যেতে পারে, কিন্তু আত্মসম্মান নয়।
মৃত্যু ও উত্তরাধিকার
রানাভালোনা তৃতীয় ২৩ মে, ১৯১৭ সালে আলজেরিয়ায় মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর বহু বছর পর, ১৯৩৮ সালে তাঁর দেহাবশেষ মাদাগাস্কারে ফিরিয়ে আনা হয়। আজ তিনি শুধু ইতিহাসের একটি অধ্যায় নন, বরং মাদাগাস্কারের জাতীয় চেতনায় এক অমর নাম।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই গল্প?
রানাভালোনা তৃতীয়ের জীবন থেকে শিক্ষার্থীরা অনেক কিছু শিখতে পারে—
- দেশপ্রেম: নিজের দেশের জন্য ভালোবাসা কেমন হওয়া উচিত
- আত্মমর্যাদা: পরাজয়ের মধ্যেও কীভাবে সম্মান বজায় রাখতে হয়
- নারী নেতৃত্ব: কঠিন সময়ে একজন নারীও কীভাবে জাতির মুখ হতে পারেন
- স্বাধীনতার মূল্য: স্বাধীনতা সহজে আসে না, আর হারালে তার কষ্ট গভীর
উপসংহার: ইতিহাস থেকে ভবিষ্যতের শিক্ষা
এই শিক্ষাই একজন ভালো নাগরিক, সচেতন মানুষ এবং ভবিষ্যৎ নেতা গড়ে তোলে।
রানাভালোনা তৃতীয়ের জীবন আমাদের শেখায়—স্বাধীনতা শুধু রাজনৈতিক ধারণা নয়, এটি মানসিক শক্তির নাম। তিনি হয়তো যুদ্ধ জিততে পারেননি, কিন্তু তিনি জয় করেছিলেন ইতিহাসের সম্মান।
আজকের শিক্ষার্থীরা যখন নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পথে হাঁটছে, তখন রানাভালোনা তৃতীয়ের মতো মানুষদের গল্প মনে করিয়ে দেয়—
নিজের শিকড়কে ভালোবাসো, নিজের পরিচয়কে সম্মান করো, আর অন্যায়ের সামনে মাথা নত কোরো না।


