ভক্ত কবির বা কবির দাস ছিলেন পঞ্চদশ শতাব্দীর একজন ভক্তি সাধক, কবি এবং সমাজ সংস্কারক যিনি হিন্দু-মুসলিম ঐক্যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

১৫শ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান উত্তরপ্রদেশের বারাণসী (কাশী) নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন মহৎ কবি ও সাধক কবির দাস। তাঁর জীবন সম্পর্কে নির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া কঠিন; ইতিহাস, উপাখ্যান ও কিংবদন্তির মিশ্রণে গড়ে উঠেছে তাঁর জীবনচিত্র। তাঁর জীবনের প্রাচীনতম উৎসের মধ্যে রয়েছে ‘বিজক’ ও ‘আদি গ্রন্থ’। এছাড়াও ‘ভক্ত মাল’-এর লেখক নবাজি, মোহসিন ফানির ‘দবিস্তান-ই-তাওয়ারিখ’ এবং ‘খাজিনাতুল আসফিয়া’-তেও কবির সম্পর্কে উল্লেখ পাওয়া যায়।
কবিরের প্রারম্ভিক জীবন:
‘কবির’ নামটি সে সময়ের প্রেক্ষাপটে ছিল একেবারেই অচেনা। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, এক কাজি শিশুটির নাম রাখার সময় বারবার কোরআন শরীফ খুললে প্রতিবারই ‘কবির’ নামটি আসে, যার অর্থ ‘মহান’ – এটি মূলত আল্লাহর জন্য ব্যবহৃত একটি শব্দ।
কবির দাস কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণ করেননি। এমনকি তাঁকে তাঁতির কাজেও বিশেষ প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়নি, যদিও তাঁর রচনায় তাঁত শিল্পের বহু উপমা পাওয়া যায়। তাঁর আসল মনোযোগ ছিল আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানে – এক মহাসত্যের সন্ধানে, যা তাঁর কবিতার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে।
এই আত্মসন্ধানেই তিনি বারাণসীর প্রসিদ্ধ সাধু রামানন্দের শিষ্য হতে চেয়েছিলেন। তিনি জানতেন, গুরু তাঁর নামে যা উচ্চারণ করবেন তাই তাঁর দীক্ষামন্ত্র হয়ে উঠবে। একদিন রামানন্দ যখন প্রতিদিনকার মতো ঘাটে যাচ্ছিলেন, কবির ইচ্ছাকৃতভাবে সিঁড়িতে শুয়ে পড়েন। হঠাৎ রামানন্দের পায়ে লাগলে তিনি চমকে উঠে বলেন, “রাম!” কবির এই শব্দকেই নিজের দীক্ষামন্ত্র হিসেবে গ্রহণ করেন এবং পরে রামানন্দ তাঁকে শিষ্য হিসেবে স্বীকার করেন। তবে ‘খাজিনাতুল আসফিয়া’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, কবিরের ওপর সুফি পীর শেখ তাক্কি-র প্রভাবও ছিল। তাঁর দর্শনে সুফি চিন্তাধারার ছাপ স্পষ্ট।
বারাণসীর ‘কবির চৌরা’ অঞ্চলটিকে কবিরের বসবাসস্থল হিসেবে মনে করা হয়। জীবনের এক পর্যায়ে তিনি ‘লোই’ নামের এক মহিলাকে বিবাহ করেন এবং তাঁদের দুটি সন্তান – পুত্র কমল ও কন্যা কমলি ছিল বলে জানা যায়। তবে অনেক উৎসে বলা হয়েছে তিনি কখনোই বিবাহ করেননি বা একাধিকবার বিবাহ করেছিলেন – এসব বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।
আরও পড়ুন: বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসু – বাংলা ভাষায় বিজ্ঞান চর্চা
ভক্ত কবির: জীবন দর্শন
কবির ছিলেন একজন একেশ্বরবাদী সাধক। মোহসিন ফানির ‘দবিস্তান’ ও আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’ গ্রন্থে তাঁকে ‘মুয়াহিদ’ অর্থাৎ এক ঈশ্বরে বিশ্বাসী বলা হয়েছে। প্রভাকর মাচওয়ে-র ‘কবির’ গ্রন্থের ভূমিকায় প্রখ্যাত পণ্ডিত হজারিপ্রসাদ দ্বিবেদী লিখেছেন, কবির রামের ভক্ত হলেও তাঁকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে নয়, নিরাকার সর্বশক্তিমান রূপেই পূজা করতেন।
তিনি উপনিষদের অদ্বৈতবাদ, ইসলামি একত্ববাদ ও বৈষ্ণব ভক্তিবাদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। তাঁর ঈশ্বর রূপ-গুণহীন, সময় ও স্থানের ঊর্ধ্বে, তিনি শব্দ, জ্ঞান ও আনন্দের একমাত্র উৎস।
কবির জাতপাতের প্রথা মানতেন না। একবার কিছু ব্রাহ্মণ গঙ্গায় স্নান করছিলেন, পাপ মোচনের আশায়। কবির তাঁদের কাঠের পাত্রে গঙ্গাজল দিয়ে পান করতে বললে তাঁরা অপমান বোধ করেন। তখন কবির বলেন, “যদি গঙ্গাজল আমার পাত্রকে পবিত্র করতে না পারে, তবে সে কীভাবে তোমার পাপ ধুয়ে দেবে?”
তিনি কেবল জাতপ্রথার বিরুদ্ধেই নয়, মূর্তিপূজা, অন্ধ বিশ্বাস ও উভয় ধর্মের (হিন্দু-মুসলিম) অর্থহীন আচার-অনুষ্ঠানও সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, ঈশ্বরকে পাওয়া যায় একমাত্র নিঃস্বার্থ ভক্তির মাধ্যমে।
তাঁর সমস্ত ভাবনা উঠে এসেছে কবিতার মাধ্যমে। তিনি ছিলেন আত্মসন্ধানী, তাঁর কাব্যধারা সেই অন্বেষণেরই ভাষা। কবির সচেতনভাবে কবিতা লেখেননি, তাঁর আনন্দ, বেদনা ও আধ্যাত্মিক উপলব্ধিই রূপ পেয়েছে পদ ও দোহায়। তিনি লেখার জন্য ব্যবহার করেছেন কথ্য ভাষা – হিন্দি, খড়িবোলি, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি, উর্দু, ফার্সি ও মারোয়ারির সংমিশ্রণে গঠিত এক অনন্য কাব্যভাষা।
যদিও তাঁর জীবনের অনেক তথ্য নির্ভরযোগ্য নয়, তবুও তাঁর কবিতা যুগ যুগ ধরে বেঁচে রয়েছে – মুখে মুখে প্রচারিত হয়েছে, পরবর্তীতে সংগীতের সুরে বাঁধা হয়েছে। তাঁর দোহা ও পদগুলোর ভাষা সরল হলেও তাৎপর্য গভীর ও প্রতীকী।
কবিরের ভাবধারা বহু সাধককে প্রভাবিত করেছে – গুরু নানক, দাদু দয়াল, জীবনদাস প্রমুখ তাঁকে উদ্ধৃত করেছেন। আজও কবির পন্থ অনুসরণকারীরা তাঁকে গুরু রূপে মান্য করে থাকেন। এটি কোনও ধর্ম নয়, বরং এক আধ্যাত্মিক দর্শন।
পড়ে দেখুন: বাংলা ভাষায় প্রথম ঔপন্যাসিক ও ভাষাবিদ প্যারীচাঁদ মিত্র
কবিরের শেষ জীবন
জীবনের শেষ পর্বে কবির দাস চলে যান মগহর নামক স্থানে, যেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, মৃত্যুর পর হিন্দু ও মুসলিমদের মধ্যে দেহ সৎকার নিয়ে বিবাদ হলে তাঁর কফনের নিচে ফুল পাওয়া যায় – যার একাংশ কাশীতে দাহ ও অন্য অংশ মগহরে সমাহিত করা হয়। আজও মগহরে কবিরের সমাধি রয়েছে।
ভক্ত কবীর সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য কিছু তথ্য:
- ভক্ত কবীর সত্যকে জানার করার জন্য অহম বা আত্ম-অহংকার ত্যাগ করার কথা বলেছিলেন।
- ভক্ত কবীরের কবিতা হিন্দির বিভিন্ন উপভাষায় যেমন ব্রজ, ভোজপুরি এবং অবধিতে পাওয়া যায়।
- ভক্ত কবীর ১৩৯৮ খ্রিস্টাব্দে কাশী (বারাণসী) এর লাহারতা‘র কাছে জন্মগ্রহণ করেছিলেন বলে বিশ্বাস করা হয়।
- কবির দাস নীরু এবং নীমা নামে এক তাঁতি দম্পতির দ্বারা লালিত-পালিত হন।
- কবির দাস লোই নামে এক মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, যার থেকে তাঁর দুটি সন্তান ছিল, কমল এবং কমলী।
- ভক্ত কবীর বিখ্যাত বৈষ্ণব গুরু রামানন্দ তাঁর আধ্যাত্মিক গুরু ছিলেন ।
- তিনি একেশ্বরবাদী ছিলেন এবং সকল ধরণের আচার-অনুষ্ঠানের বিরোধিতা করেছিলেন।
- ভক্ত কবীর তাঁর শেষ জীবনে মগহরে গিয়েছিলেন, যেখানে তিনি ১৫১৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যুবরণ করেন।



