বর্ধমান রাজবংশের মহাকাব্য: ইতিহাস, আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের এক অমর উপাখ্যান

বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাস, স্থাপত্য এবং রাজকীয় জীবনধারা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা। জেনে নিন পাঞ্জাব থেকে আসা এই পরিবারটি কীভাবে বাংলার অন্যতম শক্তিশালী রাজবংশে পরিণত হলো।

বর্ধমান রাজবংশ

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের কথা উঠলে মুর্শিদাবাদ বা বিষ্ণুপুরের পাশাপাশি যে নামটি অত্যন্ত সগৌরবে উচ্চারিত হয়, তা হলো বর্ধমান। রাঢ় বাংলার কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই জনপদটি দীর্ঘকাল ধরে শিল্প, স্থাপত্য এবং ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু ছিল। বিশেষ করে বর্ধমান রাজবংশ বা Burdwan Raj-এর ইতিহাস কেবল একটি পরিবারের উত্থান-পতনের গল্প নয়, বরং এটি বাংলার কয়েকশ বছরের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের দর্পণ।

আজ আমরা পড়ুয়া ও ইতিহাসপ্রেমী সবার জন্য বর্ধমান রাজবংশের সেই সুবর্ণ অতীতকে তুলে ধরার চেষ্টা করব, যা আজও কার্জন গেট কিংবা ১০৮ শিব মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে কথা বলে।

১. রাজবংশের সূচনা: পাঞ্জাব থেকে রাঢ় বাংলা

বর্ধমান রাজবংশের উৎস সন্ধানে আমাদের পিছিয়ে যেতে হবে সপ্তদশ শতাব্দীতে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই রাজপরিবারের আদি পুরুষরা কিন্তু বাঙালি ছিলেন না। তারা ছিলেন পাঞ্জাবের লাহোরের কোটলি গ্রামের বাসিন্দা, জাতিতে কাপুর খত্রী

১৬৫৭ সালে সঙ্গম রাই নামক এক বণিক ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে বর্ধমানে আসেন। পরবর্তীকালে তাঁর উত্তরসূরি আবু রাই মুঘল আমলে বর্ধমানের কোতোয়াল বা ফৌজদার হিসেবে নিযুক্ত হন। মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সুনজরে থাকায় এই পরিবারের ক্ষমতা দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৭০২ সালে কৃষ্ণরাম রাই-কে মুঘলরা ‘জমিদার’ এবং ‘চৌধুরী’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেখান থেকেই শুরু হয় এক দীর্ঘ রাজকীয় যাত্রার।

আরও পড়ুন – ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা, আধুনিক ভারতের বিজ্ঞানযুগের নির্মাতা

২. মাহারাজাধিরাজ উপাধি এবং মুঘল সংযোগ

বর্ধমান রাজাদের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন তাঁরা মাহারাজাধিরাজ উপাধি লাভ করেন। এটি কোনো সাধারণ জমিদারি ছিল না। ব্রিটিশ আমলের আগে পর্যন্ত বর্ধমান রাজারা ছিলেন এই অঞ্চলের সবচেয়ে প্রভাবশালী করদাতা।

রাজা চিত্র সেন রাই প্রথম মুঘল সম্রাটের কাছ থেকে ‘রাজা’ উপাধি পান। তবে এই বংশের সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন তিলকচাঁদ কাপুর। তাঁর সময়েই বর্ধমান রাজ এস্টেট এক বিশাল আকার ধারণ করে। মুঘল সাম্রাজ্যের দুর্বলতার সুযোগে এবং মারাঠা বর্গী আক্রমণের সময় নিজেদের সুরক্ষিত রেখে তাঁরা বাংলার রাজনীতিতে এক অপরিহার্য শক্তিতে পরিণত হন।

৩. ব্রিটিশ যুগ এবং বর্ধমান রাজবংশ

মহারাজ মহতাব চাঁদ
মহারাজ মহতাব চাঁদ – চিত্র সৌজন্য

১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিস যখন চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত (Permanent Settlement) চালু করেন, তখন অনেক পুরনো জমিদার বংশ ধ্বংস হয়ে গেলেও বর্ধমান রাজ টিকে ছিল তাঁদের বিচক্ষণতার কারণে।

মহারাজ মহতাব চাঁদ (১৮৩২ – ১৮৭৯)

মহতাব চাঁদ ছিলেন এই বংশের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক। ১৮৫৭ সালের সিপাহি বিদ্রোহের সময় তিনি ব্রিটিশদের সমর্থন করেছিলেন, যা রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও বর্ধমানকে শান্তি ও স্থিতিশীলতা দিয়েছিল। তাঁর সময়েই বর্ধমান রাজবাড়ির ব্যাপক সংস্কার হয় এবং রাজকীয় লাইব্রেরি গড়ে তোলা হয়।

মহারাজ বিজয় চাঁদ মহতাব (১৮৮৭ – ১৯৪১)

বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাসে সবচেয়ে শিক্ষিত এবং সংস্কৃতিমনা রাজা ছিলেন বিজয় চাঁদ মহতাব। তিনি কেবল একজন দক্ষ প্রশাসকই ছিলেন না, বরং একাধারে কবি, নাট্যকার এবং সমাজসংস্কারক ছিলেন। ১৯০৩ সালে লর্ড কার্জনের বর্ধমান আগমন উপলক্ষে তিনি নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক কার্জন গেট (বিজয় তোরণ), যা আজও বর্ধমান শহরের প্রধান ল্যান্ডমার্ক।

আরও পড়ুন – বিয়ার গ্রিলস: সাহসিকতার ওপর নাম, অনুপ্রেরণমূলক গল্প

৪. স্থাপত্যের বিস্ময়: রাজবাড়ি থেকে মন্দির

বর্ধমান রাজাদের অবদান কেবল শাসনকার্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, তাঁদের স্থাপত্যশৈলী আজও পর্যটকদের টানে।

১০৮ শিব মন্দির (নবাবহাট)
চিত্র সৌজন্য

ক) ১০৮ শিব মন্দির (নবাবহাট)

১৭৮৮ সালে মহারানি বিষ্ণুকুমারী এই মন্দির গুচ্ছ নির্মাণ করেন। এটি জপমালার আদলে তৈরি। বাংলার আটচালা স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন এই ১০৮টি মন্দির। ইতিহাস ও স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রীদের জন্য এটি একটি জীবন্ত গবেষণাগার।

খ) কার্জন গেট ও রাজবাড়ি

গ্রিক ও রোমান স্থাপত্যের মিশেলে তৈরি বর্ধমান রাজবাড়ি বা বিজয় মঞ্জিল এখন বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন। এর বিশাল থাম এবং কারুকার্যময় ফটক সেকালের আভিজাত্যের সাক্ষ্য দেয়।

গ) সর্বমঙ্গলা মন্দির

সর্বমঙ্গলা মন্দির

বর্ধমান রাজাদের কুলদেবী হলেন মা সর্বমঙ্গলা। জনশ্রুতি আছে, এই দেবীমূর্তি একসময় পুকুরের নিচে পাওয়া গিয়েছিল। রাজারা এই মন্দিরটি নির্মাণ করেন, যা আজও জেলার অন্যতম প্রধান তীর্থস্থান।

৫. সংস্কৃতি ও খাদ্যতালিকায় বর্ধমান রাজের প্রভাব

বর্ধমান মানেই বাঙালির প্রিয় মিষ্টি সীতাবোগ আর মিহিদানা। জানেন কি, এই দুই মিষ্টির উৎপত্তির পেছনেও রয়েছে রাজকীয় ইতিহাস?

১৯০৪ সালে বড়লাট লর্ড কার্জন বর্ধমানে এলে তাঁকে আপ্যায়ন করার জন্য মহারাজ বিজয় চাঁদ মহতাব ময়রা ভৈরবচন্দ্র নাগকে এক বিশেষ মিষ্টি তৈরির নির্দেশ দেন। ভৈরবচন্দ্র উদ্ভাবন করেন সীতাবোগ ও মিহিদানা। সেই থেকে এই দুই মিষ্টি বর্ধমানের সিগনেচার ডিশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বর্ধমানের রাজবাড়িতে উচ্চাঙ্গ সংগীত এবং ধ্রুপদী চর্চার যে ঐতিহ্য ছিল, তা বাংলার সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।

৬. শিক্ষার প্রসারে বর্ধমান রাজ

বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়
বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় – চিত্র সৌজন্যে

বর্তমান প্রজন্মের ছাত্রছাত্রীদের জানা উচিত যে, আজ তাঁরা যে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় (The University of Burdwan) পড়াশোনা করছেন, তার ভিত্তিভূমি কিন্তু এই রাজপরিবারই দান করেছিল।

১৯৬০ সালে পশ্চিমবঙ্গের তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ড. বিধানচন্দ্র রায়ের উদ্যোগে এবং শেষ মহারাজ উদয় চাঁদ মহতাব-এর বদান্যতায় রাজবাড়ির বিশাল অংশ এবং জমি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য দান করা হয়। বর্ধমান রাজ কলেজও এই পরিবারের পৃষ্ঠপোষকতায় গড়ে উঠেছিল। শিক্ষার প্রসারে এমন নিঃস্বার্থ অবদান ইতিহাসে বিরল।

৭. রাজবংশের শেষ অধ্যায়

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর এবং ১৯৫৫ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির ফলে বর্ধমান রাজের রাজনৈতিক ক্ষমতার অবসান ঘটে। শেষ মহারাজ উদয় চাঁদ মহতাব গণতান্ত্রিক ভারতের সাথে মানিয়ে নেন এবং তাঁর সম্পত্তি জনকল্যাণে উৎসর্গ করেন। বর্ধমান রাজবংশ আজ আর শাসকের আসনে নেই, কিন্তু তাঁদের তৈরি প্রতিষ্ঠান, মন্দির এবং স্থাপত্যের মধ্য দিয়ে তাঁরা বাঙালির হৃদয়ে অমর হয়ে আছেন।

উপসংহার: ছাত্রছাত্রীদের জন্য বর্ধমান রাজের গুরুত্ব

ইতিহাস কেবল সাল-তারিখ মুখস্থ করার বিষয় নয়, এটি আমাদের শিকড়কে চেনার উপায়। বর্ধমান রাজবংশের ইতিহাস আমাদের শেখায় কীভাবে ভিনদেশি থেকে ভূমিপুত্রে পরিণত হওয়া যায়, কীভাবে আভিজাত্যের সাথে জনকল্যাণকে মেলাতে হয়।

পড়ুয়াদের জন্য বর্ধমান কেবল একটি জেলা শহর নয়, এটি একটি জীবন্ত আর্কাইভ। এখানকার প্রতিটি গলি, প্রতিটি প্রাচীন মন্দির আর রাজবাড়ির ভাঙা ইঁট এক একটি গল্প বলে। আপনারা যখন কার্জন গেটের নিচ দিয়ে হাঁটবেন বা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে ক্লাস করবেন, একবার অন্তত ভাববেন সেই ইতিহাসের কথা, যা আজ থেকে ৩০০ বছর আগে শুরু হয়েছিল।

জিজ্ঞাস্য (FAQs)

বর্ধমান রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা কে ছিলেন?

মূলত সঙ্গম রাই এই পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করলেও, কৃষ্ণরাম রাই প্রথম মুঘলদের কাছ থেকে স্বীকৃত জমিদারি লাভ করেন।

কার্জন গেট কেন তৈরি করা হয়েছিল?

১৯০৩ সালে লর্ড কার্জনের বর্ধমান সফরকে স্মরণীয় করে রাখতে মহারাজ বিজয় চাঁদ মহতাব এটি নির্মাণ করেছিলেন।

বর্ধমান রাজবাড়ির বর্তমান অবস্থা কী?

বর্তমানে বর্ধমান রাজবাড়ির মূল অংশটি ‘বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়’-এর প্রশাসনিক কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

সীতাভোগ ও মিহিদানা কোন রাজার আমলে বিখ্যাত হয়?

মহারাজ বিজয় চাঁদ মহতাবের আমলে লর্ড কার্জনকে আপ্যায়নের মাধ্যমে এই মিষ্টি দুটি বিশ্বজুড়ে খ্যাতি পায়।


আপনি কি বর্ধমানের রাজবাড়ি বা ১০৮ শিব মন্দির ভ্রমণ করেছেন? আপনার অভিজ্ঞতা কমেন্টে আমাদের জানান! ইতিহাসের এমন আরও রোমাঞ্চকর গল্প পড়তে আমাদের ব্লগে সাবস্ক্রাইব করুন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top