পশ্চিম মেদিনীপুরের প্রাচীন জনপদ নাড়াজোল, তার ছয়শো বছরের রাজসিক ইতিহাস, বিপ্লবী আন্দোলন, নাড়াজোল রাজবংশ ও তাদের উত্থান-পতন আলোচিত হল।

পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসের কথা উঠলে আমরা সাধারণত মুর্শিদাবাদ, বিষ্ণুপুর বা বর্ধমানের নাম শুনি। কিন্তু মেদিনীপুরের মাটির গভীরে এমন এক রাজবংশের ইতিহাস লুকিয়ে আছে, যা শৌর্য, স্থাপত্য এবং বিশেষ করে ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের এক অনন্য দলিল। আজ আমরা কথা বলব নাড়াজোল (Narajole) নিয়ে।
পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার ঘাটাল মহকুমার এই ছোট্ট জনপদটি একসময় ছিল শিল্প, সংস্কৃতি এবং দেশপ্রেমের এক অন্যতম পীঠস্থান। তরুণ প্রজন্মের এবং ইতিহাস অনুসন্ধিৎসুদের জন্য নাড়াজোল রাজবংশের এই বিবর্তন জানা অত্যন্ত জরুরি।
১. নাড়াজোল রাজবংশের গোড়াপত্তন: ঘোষ থেকে খাঁ-উপাধি প্রাপ্তি
নাড়াজোল রাজবংশের ইতিহাস প্রায় ৪৫০-৫০০ বছরের পুরনো। এই বংশের আদি পুরুষ ছিলেন উদয় নারায়ণ ঘোষ। লোককথা অনুযায়ী, ষোড়শ শতাব্দীতে তিনি এই অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। তবে এই পরিবারের প্রতিপত্তি বাড়তে শুরু করে মুঘল আমলে।
তৎকালীন বাংলার নবাবের দরবারে এই পরিবারের সদস্যরা বিশেষ মর্যাদা লাভ করেন। জানা যায়, তাঁদের প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বীরত্বের পুরস্কার স্বরূপ নবাব তাঁদের ‘খাঁ’ উপাধিতে ভূষিত করেন। সেই থেকে এই রাজবংশ ‘নাড়াজোল রাজপরিবার’ বা ‘খাঁ পরিবার’ নামে পরিচিতি পায়। তাঁরা কেবল জমিদার ছিলেন না, বরং এই অঞ্চলের মানুষের কাছে রক্ষক এবং অভিভাবক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
২. স্থাপত্যের নন্দনকানন: নাড়াজোল রাজবাড়ি ও ‘জলহরি’
স্থাপত্যে আগ্রহ আছে এমন ছাত্রদের জন্য নাড়াজোল একটি খোলা জাদুঘর। নাড়াজোলের রাজকীয় স্থাপত্য কেবল বিলাসিতা নয়, বরং গভীর নান্দনিক বোধের পরিচয় দেয়।
ক) নাড়াজোল রাজপ্রাসাদ

এই রাজবাড়ির বিশালতা আজও দর্শকদের বিস্মিত করে। মূল প্রাসাদে প্রায় ৫০টিরও বেশি ঘর ছিল। বিশাল খিলানযুক্ত ফটক, নাটমন্দির এবং অন্দরমহলের নকশায় ইউরোপীয় ও ভারতীয় রীতির এক অপূর্ব মিশ্রণ দেখা যায়। যদিও সময়ের অবহেলায় অনেক অংশ আজ ভগ্নপ্রায়, তবুও এর দেওয়ালগুলো আজও রাজকীয় আভিজাত্যের সাক্ষ্য দেয়।
খ) অনন্য ‘জলহরি’ (Water Palace)
নাড়াজোলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হলো এর জলহরি। এটি মূলত একটি গ্রীষ্মকালীন আবাস বা প্রমোদ ভবন, যা একটি বিশাল পুকুরের মাঝখানে অবস্থিত। ভারতের খুব কম জায়গায় এমন ‘ওয়াটার প্যালেস’ দেখতে পাওয়া যায়। রাজপরিবারের সদস্যরা গরমের সময় এখানে সময় কাটাতেন। চারিদিকে জল থাকার কারণে ভবনটি প্রাকৃতিকভাবেই শীতল থাকত। স্থাপত্যের ছাত্রছাত্রীদের কাছে এই নির্মাণশৈলী গবেষণার বিষয় হতে পারে।
গ) মন্দির ও রাসমঞ্চ

নাড়াজোলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ছোট-বড় মন্দির। এখানকার রাসমঞ্চটি অত্যন্ত দৃষ্টিনন্দন। পোড়ামাটির বা টেরাকোটা কাজ না থাকলেও, এর কারুকার্যময় গম্বুজ এবং স্থাপত্যশৈলী ওড়িশি ও বঙ্গীয় রীতির সংমিশ্রণ। জয়দেব-কেশব মন্দিরের গায়ে খোদাই করা অলঙ্করণগুলো আজও সেই সময়ের শিল্পীদের নিপুণ হাতের পরিচয় বহন করে।
আরও পড়ুন – তমলুক বা তাম্রলিপ্ত: হাজার বছরের ইতিহাস ও ভ্রমণ গাইড
৩. স্বাধীনতা সংগ্রাম ও নাড়াজোল: বিপ্লবীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল
একজন আদর্শ ইতিহাসপ্রেমী ছাত্রের জন্য নাড়াজোলের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর অধ্যায় হলো ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে এই রাজবংশের ভূমিকা। অনেক রাজপরিবার যখন ব্রিটিশদের পদলেহন করতে ব্যস্ত ছিল, নাড়াজোলের রাজারা তখন বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে।

রাজা নরেন্দ্রলাল খাঁ: এক নির্ভীক দেশপ্রেমিক
নাড়াজোল রাজবংশের সবচেয়ে স্মরণীয় ব্যক্তিত্ব হলেন রাজা নরেন্দ্রলাল খাঁ। তিনি ছিলেন অরবিন্দ ঘোষ (শ্রী অরবিন্দ), বারীন ঘোষ এবং হেমচন্দ্র কানুনগোর মতো চরমপন্থী বিপ্লবীদের ঘনিষ্ঠ সহযোগী। মেদিনীপুরের বিপ্লবী আন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল এই নাড়াজোল রাজবাড়ি।
- বিপ্লবীদের প্রশিক্ষণ: লোকচক্ষুর আড়ালে রাজবাড়ির ভেতরে বিপ্লবীদের শরীরচর্চা এবং অস্ত্র চালনার প্রশিক্ষণ চলত।
- আর্থিক সহায়তা: তিনি কেবল আশ্রয়ই দেননি, বরং বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডে প্রচুর অর্থ সাহায্য করতেন।
- অস্ত্র ও বোমা তৈরির সংযোগ: বিখ্যাত বিপ্লবী হেমচন্দ্র কানুনগো যখন বোমা তৈরির কৌশল শিখতে প্যারিসে যান, তখন তাঁর যাত্রার পেছনেও এই রাজপরিবারের অবদান ছিল বলে মনে করা হয়।
মহাত্মা গান্ধীর পদার্পণ
১৯২৫ সালে স্বয়ং মহাত্মা গান্ধী নাড়াজোল ভ্রমণে এসেছিলেন। রাজা নরেন্দ্রলাল খাঁ তাঁকে বিপুল সংবর্ধনা দেন এবং স্বাধীনতা তহবিলে মুক্তহস্তে দান করেন। নাড়াজোলের রাজারা দেখিয়েছিলেন যে, রাজকীয় ঐশ্বর্যের চেয়েও দেশের মুক্তি অনেক বড়। ব্রিটিশ সরকার অনেকবার এই রাজপরিবারকে দমনের চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাঁদের দেশপ্রেম ছিল অটল।
৪. শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে অবদান
নাড়াজোল রাজপরিবার কেবল রাজনীতি বা স্থাপত্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। শিক্ষা বিস্তারে তাঁদের অবদান অনস্বীকার্য।
- শিক্ষা প্রতিষ্ঠান: মেদিনীপুর জেলায় আধুনিক শিক্ষা প্রসারের জন্য তাঁরা অনেক স্কুল ও পাঠাগার স্থাপন করেছিলেন। তৎকালীন সময়ে নারী শিক্ষার প্রসারেও তাঁরা অগ্রণী ভূমিকা নিয়েছিলেন।
- সঙ্গীত ও শিল্প: রাজবাড়িতে নিয়মিত শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের আসর বসত। দেশ-বিদেশের গুণী শিল্পীরা এখানে এসে সমাদৃত হতেন। নাড়াজোলের নিজস্ব একটি সাংস্কৃতিক ঘরানা তৈরি হয়েছিল যা দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাকে সমৃদ্ধ করেছে।
আরও পড়ুন – প্রাসাদ নগরী ধান্যকুড়িয়া: বাংলার বুকে এক টুকরো ইউরোপ এবং বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানে
৫. নাড়াজোল রাজবাড়ি: বর্তমান ও ভবিষ্যৎ
আজকের নাড়াজোল রাজবাড়ি আগের সেই জৌলুস হারিয়ে ফেলেছে। তবে পশ্চিমবঙ্গ হেরিটেজ কমিশন এটিকে প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বের কথা বিবেচনা করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নিয়েছে। রাজবাড়ির একটি অংশ বর্তমানে সরকারি কলেজের কাজে ব্যবহৃত হয়, যা ছাত্রছাত্রীদের ইতিহাসের খুব কাছাকাছি থাকার সুযোগ করে দেয়।
কেন আপনি নাড়াজোল ভ্রমণে যাবেন?
১. ইতিহাসের সান্নিধ্য: বইয়ের পাতায় পড়া স্বাধীনতা সংগ্রামের রোমাঞ্চ অনুভব করতে।
২. ফটোগ্রাফি ও স্থাপত্য: জলহরি এবং প্রাচীন মন্দিরের স্থাপত্য ফ্রেমবন্দি করার জন্য।
৩. অচেনা মেদিনীপুর: চেনা পর্যটন কেন্দ্রের বাইরে বাংলার মাটির আসল গন্ধ পেতে।
৬. ভ্রমণের পরিকল্পনা: কীভাবে যাবেন?
কলকাতা থেকে নাড়াজোল যাওয়া বেশ সহজ। এটি মেদিনীপুর জেলায় অবস্থিত।
- ট্রেনে: হাওড়া থেকে খড়গপুর বা মেদিনীপুরগামী ট্রেনে উঠে মেদিনীপুর স্টেশনে নামতে হবে। সেখান থেকে বাসে বা প্রাইভেট কারে নাড়াজোল পৌঁছানো যায়।
- সড়কপথে: কলকাতা থেকে জাতীয় সড়ক ধরে ঘাটাল হয়ে নরাজোল যাওয়া যায়। ঘাটাল থেকে এর দূরত্ব প্রায় ১৫-২০ কিমি।
উপসংহার
নাড়াজোল কেবল একটি ধ্বংসাবশেষের সমাহার নয়, এটি বাংলার এক গর্বিত উত্তরাধিকার। রাজা নরেন্দ্রলাল খাঁর দেশপ্রেম আর জলহরির নীল জল আজও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমাদের গ্রামবাংলার কোণায় কোণায় কত মণিমাণিক্য লুকিয়ে আছে।
আজকের তরুণ প্রজন্মের দায়িত্ব হলো এই ইতিহাসকে ভুলে না গিয়ে তাকে চর্চার মধ্যে রাখা। পরের বার যখন বন্ধুদের সাথে কোথাও ঘুরতে যাওয়ার কথা ভাববেন, নাড়াজোলকে আপনার তালিকার শীর্ষে রাখুন। কারণ, যে জাতি নিজের ইতিহাস জানে না, সে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ গড়তে পারে না।
আপনার মতামত জানান:
আপনি কি আগে কখনও নাড়াজোল বা মেদিনীপুরের কোনো রাজবাড়ি ঘুরে দেখেছেন? সেখানকার কোন স্মৃতিটি আপনার সবচেয়ে প্রিয়? কমেন্ট বক্সে আমাদের সাথে শেয়ার করুন। আর এই পোস্টটি ভালো লাগলে বন্ধুদের সাথে শেয়ার করতে ভুলবেন না!



