দীঘার ইতিহাস – দীঘার প্রাচীন নাম ‘বীরকুল’ থেকে আজকের আধুনিক পর্যটন কেন্দ্র হয়ে ওঠার রোমাঞ্চকর যাত্রাপথ তুলে ধরা হয়েছে।

বাঙালির ভ্রমণ তালিকায় সবার উপরে যে নামগুলো থাকে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ‘দীঘা’। দীপুদা (দীঘা, পুরী, দার্জিলিং)—এই শব্দবন্ধের অন্যতম অবিচ্ছেদ্য অংশ হলো দীঘা। সপ্তাহান্তের ছুটি হোক বা শীতের পিকনিক, বাঙালির প্রথম পছন্দ এই সমুদ্র সৈকত। কিন্তু আপনি কি জানেন, আপনার প্রিয় এই দীঘার বালিয়াড়ির নিচে চাপা পড়ে আছে প্রায় ৩০০ বছরের পুরনো এক রোমাঞ্চকর ইতিহাস? আজকের ঝলমলে নিউ দীঘা বা ওল্ড দীঘার ভিড়ের আড়ালে হারিয়ে গেছে একদা ব্রিটিশ সাহেবদের প্রিয় ‘বীরকুল’-এর স্মৃতি।
আজকের এই প্রবন্ধে আমরা দীঘার সেই অজানা ইতিহাসের পথ ধরে হাঁটব, যেখানে ওয়ারেন হেস্টিংস থেকে শুরু করে জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ—অনেকেরই পদচিহ্ন আজও অক্ষত। আসুন জেনে নেওয়া যাক দীঘার জন্ম, নামকরণ এবং বিবর্তনের সম্পূর্ণ ইতিহাস।
১. দীঘার আদি নাম: বীরকুল পরগনার উপকথা
আজ আমরা যে জায়গাটিকে দীঘা নামে চিনি, অষ্টাদশ শতাব্দীতে তার পরিচিতি ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন নামে। তখন এই অঞ্চলের নাম ছিল ‘বীরকুল’ (Beerkul)। মুঘল ও পরবর্তীকালে ব্রিটিশ নথিপত্রে এই নামটির উল্লেখ পাওয়া যায়। সেই সময় মেদিনীপুর চাকলার অন্তর্গত একটি ছোট্ট উপকূলীয় গ্রাম ছিল বীরকুল।
ঐতিহাসিক দলিল দস্তাবেজ ঘেঁটে জানা যায়, ১৭৬০ সালে মীরকাশিম যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে মেদিনীপুর, চট্টগ্রাম ও বর্ধমানের অধিকার প্রদান করেন, তখন থেকেই বীরকুল ইংরেজদের নজরে আসে। তবে তারও আগে পর্তুগিজ নাবিকদের মানচিত্রে এই উপকূলের অস্পষ্ট উল্লেখ পাওয়া যায়। ‘নরীকুল’ বা ‘বড়িকুল’ নামেও পুরোনো মানচিত্রে এর অস্তিত্ব দেখা গেছে, যা পরে ‘বীরকুল’-এ রূপান্তরিত হয়। সেই সময় এটি ছিল মূলত জেলেদের গ্রাম, যেখানে নোনা হাওয়া আর ঝাউবনের শনশন শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যেত না।
আরও পড়ুন – বাংলার বুকে এক টুকরো ইউরোপ, প্রাসাদ-নগরী ধান্যকুড়িয়ার বিস্মৃত ইতিহাসের সন্ধানে
২. ওয়ারেন হেস্টিংস এবং ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’
দীঘার ইতিহাসে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকা উচিত, তিনি হলেন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস (Warren Hastings)। তিনি ছিলেন দীঘার (তৎকালীন বীরকুল) প্রথম হাই-প্রোফাইল পর্যটক।
১৭৮০ সাল নাগাদ হেস্টিংস সাহেব সস্ত্রীক এই সমুদ্রতীরে আসেন। সেই সময় যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত দুর্গম, তবুও এখানকার নির্জনতা, স্বাস্থ্যকর বাতাস এবং শান্ত সমুদ্র তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। তিনি এতটাই মোহিত হয়েছিলেন যে, ইংল্যান্ডের বিখ্যাত সমুদ্র সৈকত ‘ব্রাইটন’-এর সাথে তুলনা করে তিনি বীরকুলকে আখ্যা দিয়েছিলেন “Brighton of the East” বা “প্রাচ্যের ব্রাইটন”।
হেস্টিংস তাঁর স্ত্রীকে লেখা চিঠিতে বীরকুলের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছিলেন। তিনি লিখেছিলেন, এখানকার সমুদ্র সৈকত হাঙর-মুক্ত এবং স্নানের জন্য অত্যন্ত নিরাপদ। তাঁর এই প্রশংসার পরেই ব্রিটিশ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের মধ্যে বীরকুল জনপ্রিয় হতে শুরু করে। শোনা যায়, হেস্টিংস এখানে একটি বাংলোও তৈরি করেছিলেন, যা কালের গর্ভে সমুদ্রের গ্রাসে হারিয়ে গেছে। সেই সময় কলকাতা থেকে বহু ব্রিটিশ অফিসার ‘চেঞ্জ’ বা বায়ু পরিবর্তনের জন্য বীরকুলে আসতেন।
৩. বিস্মৃতির অতলে বীরকুল
ওয়ারেন হেস্টিংসের বিদায়ের পর ধীরে ধীরে বীরকুলের জৌলুস কমতে থাকে। যাতায়াতের অসুবিধা এবং সঠিক রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উনিশ শতকের দিকে এই জায়গাটি প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে। জঙ্গল আর বন্যপ্রাণীর উপদ্রব বেড়ে যায়। ব্রিটিশরা নতুন নতুন হিল স্টেশন (যেমন সিমলা, দার্জিলিং) আবিষ্কার করায় সমুদ্রের প্রতি তাদের আগ্রহ কিছুটা কমে যায়। ফলে একসময়ের জমজমাট ‘প্রাচ্যের ব্রাইটন’ আবার জেলেদের ছোট্ট গ্রামে পরিণত হয় এবং ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমতে শুরু করে।
৪. জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ: দীঘার আধুনিক রূপকার

দীর্ঘ সময় অন্ধকারে থাকার পর, বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দীঘা আবার নতুন করে আবিষ্কৃত হয়। আর এই আবিষ্কারের পিছনে যার অবদান সবচেয়ে বেশি, তিনি হলেন জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ (John Frank Snaith)। তাঁকে বলা হয় ‘আধুনিক দীঘার জনক’ বা ‘ফার্স্ট রেসিডেন্ট অফ দীঘা’।
জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ ছিলেন কলকাতার বিখ্যাত জুয়েলারি শপ ‘হ্যামিল্টন অ্যান্ড কোম্পানি’-র মালিক। ১৯২৩ সাল নাগাদ তিনি দীঘার (তৎকালীন বীরকুল) এই সৈকতে আসেন এবং এর বন্য সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে যান। তিনি এতটাই প্রেমে পড়েছিলেন যে, সিদ্ধান্ত নেন এখানেই তিনি বসবাস করবেন।
রানসউইক হাউস (Runswick House)
স্নেথ সাহেব ১৯৩০-এর দশকে দীঘার সমুদ্রতীরে প্রায় ১১ একর জমি লিজ নিয়ে একটি চমৎকার বাংলো তৈরি করেন, যার নাম দেন ‘রানসউইক হাউস’। তিনি ছিলেন একজন শৌখিন ও রোমান্টিক মানুষ। শোনা যায়, তিনি তাঁর ব্যক্তিগত ছোট বিমান (টু-সিটার প্লেন) চালিয়ে কলকাতা থেকে সোজা দীঘার সমুদ্র সৈকতে ল্যান্ড করতেন! দীঘার শক্ত বালির বিচ ছিল তাঁর রানওয়ে।
তিনি স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলেন। তিনি কেবল নিজের থাকার জন্যই বাংলো বানাননি, বরং দীঘাকে একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই আবার নতুন করে দীঘা (তৎকালীন বীরকুল) প্রচারের আলোয় আসতে শুরু করে। তিনি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় দীঘার সৌন্দর্য নিয়ে লেখালেখি করতেন এবং বন্ধুদের এখানে আসার আমন্ত্রণ জানাতেন। আজও ওল্ড দীঘায় তাঁর স্মৃতিবিজড়িত রানসউইক হাউস (বর্তমানে বিদ্যুৎ পর্ষদের বাংলো) এবং তাঁর সমাধি অটুট রয়েছে।
আরও পড়ুন – পিঁপড়ে সম্পর্কে ৯৯টি মজার তথ্য যা আমাদের অবাক করে
৫. ডঃ বিধানচন্দ্র রায় এবং আজকের দীঘা

ভারত স্বাধীন হওয়ার পর, ১৯৪৭ সালের পরবর্তী সময়ে দীঘার ভাগ্যাকাশে নতুন সূর্যোদয় ঘটে। পশ্চিমবঙ্গের রূপকার এবং তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী ডঃ বিধানচন্দ্র রায়-এর হাত ধরে দীঘা পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ ব্যক্তিগতভাবে ডঃ বিধানচন্দ্র রায়কে অনুরোধ করেছিলেন এই জায়গাটির উন্নয়নের জন্য। বিধান রায় নিজেও দীঘার সম্ভাবনা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি চেয়েছিলেন দার্জিলিং-এর পাশাপাশি পশ্চিমবঙ্গের মানুষের জন্য একটি সস্তা ও সুন্দর ভ্রমণের জায়গা তৈরি করতে।
১৯৫০-এর দশকে ডঃ রায়ের উদ্যোগে দীঘায় বিদ্যুৎ সংযোগ, রাস্তাঘাট এবং সরকারি অতিথিশালা নির্মাণের কাজ শুরু হয়। তাঁর আমলেই দীঘাকে ‘পর্যটন কেন্দ্র’ হিসেবে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া হয়। বালিয়াড়ি রক্ষা করার জন্য ঝাউ গাছ লাগানোর পরিকল্পনাও সেই সময়েই নেওয়া হয়েছিল, যা আজ দীঘার অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। ডঃ বিধানচন্দ্র রায়ের দূরদর্শী পরিকল্পনার ফলেই বীরকুল নামটি পুরোপুরি মুছে গিয়ে ‘দীঘা’ নামটি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটি মধ্যবিত্ত বাঙালির প্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়।
৬. ওল্ড দীঘা থেকে নিউ দীঘা: এক বিবর্তন
সময়ের সাথে সাথে দীঘার ভৌগোলিক ও বাস্তবিক পরিবর্তনও ঘটেছে প্রচুর।
- ওল্ড দীঘা (Old Digha): বিধান রায়ের আমলে তৈরি মূল পর্যটন কেন্দ্রটিই আজকের ওল্ড দীঘা। কিন্তু অত্যধিক জনবসতি এবং সমুদ্রের ক্রমাগত ভাঙনের ফলে ওল্ড দীঘার সৈকত আজ অনেকটাই সঙ্কুচিত। পাথরের বাঁধ দিয়ে সমুদ্রকে আটকে রাখা হয়েছে। তবুও ওল্ড দীঘার বিশ্ব বাংলা পার্ক এবং পুরোনো স্মৃতিবিজড়িত রাস্তাগুলো আজও পর্যটকদের টানে।
- নিউ দীঘা (New Digha): পর্যটকদের চাপ সামলাতে এবং ওল্ড দীঘার ভাঙন সমস্যার বিকল্প হিসেবে ২ কিলোমিটার দূরে তৈরি করা হয়েছে ‘নিউ দীঘা’। এখানে সমুদ্রতট অনেক বেশি প্রশস্ত এবং বালুকাময়। ঝাউবনের ছায়া আর আধুনিক হোটেল-রিসর্টের সমাহার নিউ দীঘাকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে বেশি আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
৭. দীঘার নাম কেন ‘দীঘা’ হলো?
দীঘার নামকরণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে প্রচলিত কিছু মতবাদ নিচে দেওয়া হলো:
১. দীর্ঘ তটরেখা: সংস্কৃত শব্দ ‘দীর্ঘ’ থেকে দীঘা নামের উৎপত্তি হতে পারে। এখানকার সুদীর্ঘ সমুদ্র সৈকত দেখেই হয়তো স্থানীয়রা একে ‘দীর্ঘা’ বা কালক্রমে ‘দীঘা’ বলতে শুরু করেন।
২. স্থানীয় জনশ্রুতি: কারো কারো মতে, স্থানীয় কোনো বর্ধিষ্ণু পরিবারের বা মৌজার নামানুসারে এই জায়গার নাম দীঘা হয়েছে। তবে ‘বীরকুল’ নামটি যে প্রাচীন এবং ঐতিহাসিক, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
আরও পড়ুন – ভক্ত কবির : ভক্তি আন্দোলনের পুরোধা কবির দাসের জীবন ও দর্শন
৮. ইতিহাসের সাক্ষী: দীঘার দর্শনীয় স্থানসমূহ

একজন ইতিহাসপ্রেমী হিসেবে দীঘায় গেলে আপনি কেবল সমুদ্র দেখবেন না, দেখবেন ইতিহাসের চিহ্নগুলোও:
- রানসউইক হাউস: ওল্ড দীঘার কাছেই অবস্থিত জন ফ্রাঙ্ক স্নেথের সেই ঐতিহাসিক বাংলো। যদিও এখন এটি সরকারি সম্পত্তি এবং প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত, তবুও বাইরে থেকে এর স্থাপত্য দেখা যায়।
- স্নেথ সাহেবের সমাধি: রানসউইক হাউসের কাছেই একটি নির্জন জায়গায় শুয়ে আছেন দীঘার প্রথম বাসিন্দা জন ফ্রাঙ্ক স্নেথ।
- শঙ্করপুর ও মন্দারমণি: দীঘার আশেপাশের এই জায়গাগুলোও একসময় ব্রিটিশদের নজরে ছিল। মন্দারমণির কাছেই ‘দাদনপাত্রবাড়’ নামক স্থানটি ব্রিটিশ আমলের লবণ তৈরির ইতিহাসের সাক্ষী।
- জগন্নাথ মন্দির (নির্মীয়মান): বর্তমান সময়ে দীঘার মুকুটে নতুন পালক ওড়িশার আদলে তৈরি বিশাল জগন্নাথ মন্দির, যা ভবিষ্যতের ইতিহাসের অংশ হতে চলেছে।
৯. উপসংহার: স্মৃতির সরণিতে দীঘা
দীঘা কেবল বালুকাবেলা আর নোনা জলের গল্প নয়; এটি একটি রূপান্তরের গল্প। একসময়ের ম্যালেরিয়া-প্রবণ জঙ্গলাকীর্ণ ‘বীরকুল’ আজ পশ্চিমবঙ্গের পর্যটন মানচিত্রের হৃৎপিণ্ড। ওয়ারেন হেস্টিংসের শৌখিনতা, জন ফ্রাঙ্ক স্নেথের ভালোবাসা এবং বিধানচন্দ্র রায়ের দূরদর্শিতা—এই তিনের সংমিশ্রণেই গড়ে উঠেছে আজকের দীঘা।
পরেরবার যখন দীঘার সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্ত দেখবেন, তখন একবার মনে করবেন সেই সাহেবদের কথা, যারা হাতির পিঠে চড়ে বা ছোট প্লেন চালিয়ে এই সৈকতে আসতেন। মনে করবেন সেই ‘বীরকুল’-এর কথা, যা আজ হারিয়ে গেলেও ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে আছে। ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য দীঘা কেবল একটি ট্যুরিস্ট স্পট নয়, এটি একটি জীবন্ত টাইম মেশিন।



