
রূপনারায়ণ নদীর তীরে, সবুজ ফসলের মাঠের মাঝে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে তমলুক, পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদিনীপুর জেলার অন্যতম প্রাচীন শহর। আজকের তামলুক এক শান্ত, সাধারণ শহর মনে হলেও, ইতিহাস বলছে—এটাই ছিল ভারতবর্ষের সবচেয়ে পুরনো ও ব্যস্ততম প্রাচীন সমুদ্রবন্দর ‘তাম্রলিপ্ত’ (Tamralipta)।
এখানকার ইতিহাসের পরিধি ২,৫০০ বছরেরও বেশি—মৌর্য যুগ থেকে গুপ্ত যুগ, পাল–সেন যুগ, সুলতানি ও মুঘল আমল, ব্রিটিশ শাসন, এবং শেষ পর্যন্ত Quit India আন্দোলনের সময়ে গঠিত ‘তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার’—সবকিছুই এই শহরের অভূতপূর্ব বৈশিষ্ট্য।
প্রাচীন তাম্রলিপ্ত থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তমলুকের ইতিহাস সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করা হল যাতে ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটক উভয়েই শহরটিকে নতুন চোখে দেখতে পারেন।
১. তাম্রলিপ্ত: উপমহাদেশের প্রাচীনতম বন্দর শহর

কোলকাতা জন্মানোর বহু আগেই, নদী–নালা আর সাগরমুখের জটিল জলপথের পাশে গড়ে উঠেছিল তাম্রলিপ্ত, যা ভারত, দক্ষিণ–পূর্ব এশিয়া এবং রোমান সাম্রাজ্যের মধ্যে বাণিজ্যের প্রধান কেন্দ্র ছিল।
‘তাম্রলিপ্ত’ নামের উৎপত্তি
“তাম্র” মানে তামা
“লিপ্ত” মানে আবৃত
সম্ভবত এলাকায় তামার কাজ অথবা লালচে মাটির কারণে এ নামের উৎপত্তি।
ভৌগোলিক গুরুত্ব
- রূপনারায়ণ নদী
- সুবর্ণরেখার শাখা
- গঙ্গার বদ্বীপ
- প্রাচীন সমুদ্রের নিকটবর্তীতা
এসব মিলিয়ে তাম্রলিপ্ত ছিল সমুদ্রযাত্রার আদর্শ স্থান।
কোথায় কোথায় ‘তাম্রলিপ্ত’ উল্লেখ পাওয়া যায়
- মহাভারত
- জাতক কাহিনি
- প্লিনি ও টলেমির গ্রন্থ
- চীনা ভিক্ষু হিউয়েন সাং এর ভ্রমণবৃত্তান্ত
হিউয়েন সাং তাম্রলিপ্ত সম্পর্কে লিখেছিলেন—“দ্বীপদেশ থেকে আসা নাবিকদের ভিড়ে সকালের বন্দর জমজমাট হয়ে ওঠে।”
এটি প্রমাণ করে, তমলুক একসময় আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
আরও পড়ুন – পিঁপড়ে সম্পর্কে ৯৯টি মজার বিশেষত্ব যা আমাদের অবাক করে
২. মৌর্য ও গুপ্ত যুগ: তমলুকের সোনালি সময়

মৌর্য আমল (খ্রি.পূ. ৩য় শতক)
অশোকের শাসনকালে তমলুক ছিল বৌদ্ধ ধর্মপ্রচারের প্রধান ঘাঁটি। এখানকার সন্ন্যাসীরা সুমাত্রা, বার্মা ও শ্রীলঙ্কায় ধর্মপ্রচার করতেন।
গুপ্ত যুগ (খ্রি. ৪–৬ শতক)
তাম্রলিপ্তর অর্থনীতি ও সংস্কৃতির চূড়ান্ত বিকাশ ঘটে।
- চমৎকার টেরাকোটা শিল্প
- বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি
- উন্নত নগর পরিকল্পনা
- নাবিক, কারিগর ও ব্যবসায়ীদের বসতি
গুপ্ত আমলে তমলুক ছিল সত্যিকারের Golden Port City।
৩. সমুদ্রসীমার পরিবর্তন ও ধর্মীয় কেন্দ্র হিসেবে উত্থান
৮ম–১০ম শতকে নদীর গতিপথ বদলাতে থাকে। বালুকাময়তা বাড়ায় বন্দরটির গভীরতা কমে যায়, ফলে তাম্রলিপ্তর বাণিজ্য ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয়।
তবে শহরটি পরিণত হয় এক প্রধান ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র।
বর্গভীমা মন্দির
- প্রায় ১,১৫০ বছরের পুরনো
- ৫১ শক্তিপীঠের একটি
- ওড়িশার রঙ্গদেউল এবং বাংলার স্থাপত্যশৈলীর মিশ্র রূপ
- আজও তীর্থযাত্রীদের ভিড় লেগে থাকে
এই সময়ে তামলুকের পরিচিতি নতুন করে গড়ে ওঠে শক্তিপূজা ও মন্দিরসংস্কৃতিকে কেন্দ্র করে।
আরও পড়ুন – সাহসিকতার ওপর নাম বিয়ার গ্রিলস: একটি অনুপ্রেরণমূলক গল্প
৪. পাল, সেন ও সুলতানি আমলে তমলুক
পাল যুগে (৮ম–১২শ শতক)
বৌদ্ধ শিক্ষা, শিল্প ও স্থাপত্যের উন্নতি ঘটে। পাল বংশের পৃষ্ঠপোষকতায় তমলুকের আশপাশে শিক্ষাকেন্দ্র গড়ে ওঠে।
সেন যুগে (১২শ শতক)
হিন্দু রাজাদের শাসনে:
- কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি
- মন্দির নির্মাণ
- স্থানীয় শিল্পের বিকাশ
সুলতানি আমল (১৩শ–১৬শ শতক)
তখন তমলুক হয়ে ওঠে:
- লবণ, চাল ও পানের বাণিজ্য কেন্দ্র
- নদীবন্দর
- আঞ্চলিক প্রশাসনিক সদর
বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে একটি মিশ্র জনপদ তৈরি হয়।
৫. মুঘল শাসনে তমলুক

মুঘল আমলে তমলুক ছিল একটি রাজস্ব জেলা।
অর্থনৈতিক কার্যক্রম
- চাল, পাট, শাঁস, লবণ—উল্লেখযোগ্য রপ্তানি
- নদীর ঘাটে পণ্য ওঠানামার ব্যস্ততা
- স্থানীয় জমিদারদের উত্থান
ইউরোপীয় বণিকদের আগমন
পর্তুগিজ ও অন্যান্য নাবিকেরা তমলুক–হুগলি নদীপথ ব্যবহার করতেন। যদিও প্রধান ইউরোপীয় বাণিজ্য হুগলিতে গড়ে ওঠে, তমলুক রয়ে যায় অভ্যন্তরীণ নদীবাণিজ্যের কেন্দ্র হিসাবে।
৬. ব্রিটিশ শাসনে তমলুক
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধের পর তমলুক চলে আসে ব্রিটিশ শাসনে। কোলকাতা তখন ব্রিটিশদের রাজধানী হওয়ায় তমলুককে বড় বন্দর হিসেবে গড়ে তোলা হয়নি।
তবে তমলুক হয়ে ওঠে:
- উপমেদিনীপুরের প্রশাসনিক কেন্দ্র
- রাজস্ব ও আদালতের প্রধান শহর
- চাল–মাছ–লবণ–জুটের বাণিজ্য কেন্দ্র
১৯শ শতকে শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার মাধ্যমে তমলুক ব্রিটিশ বাংলার Rural Intellectual Centre হিসেবে পরিচিতি পায়।
৭. বাংলার নবজাগরণে তমলুকের ভূমিকা
বাংলার রেনেসাঁসের সময় তমলুকেও দেখা যায়:
- বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা
- সংস্কৃত পঠন-পাঠন
- সাহিত্যচর্চা
- জাতীয়তাবাদী চিন্তার বিকাশ
এই প্রস্তুতি পরবর্তী সময়ে তামলুককে স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম কেন্দ্র করে তোলে।
৮. স্বাধীনতা সংগ্রামে তমলুক : তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার

তমলুকের ইতিহাসে সবচেয়ে গৌরবময় অধ্যায় হলো ১৯৪২ সালের Quit India আন্দোলন।
তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকারের প্রতিষ্ঠা
ভারতের ইতিহাসে কয়েকটি অঞ্চলে গোপন বা সমান্তরাল সরকার গঠিত হয়েছিল; কিন্তু তমলুকের ১৭ ডিসেম্বর ১৯৪২ সালে Tamralipta Jatiya Sarkar ছিল সবচেয়ে সংগঠিত ও কার্যকর।
এর নেতৃত্বে ছিলেন
- সতীশচন্দ্র সামন্ত – সরকারের প্রধান
- অজয় মুখার্জি, সুশীল ধাড়া, মাতঙ্গিনী হাজরা – প্রধান সংগ্রামীরাও ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ অংশ
সরকারের বিভাগ
- স্বাস্থ্য
- শিক্ষা
- ন্যায়বিচার
- স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী
- প্রতিরক্ষা
- ত্রাণ ও পুনর্গঠন
তাদের কাজ
- কর সংগ্রহ
- বেসরকারি আদালত পরিচালনা
- গ্রামের নিরাপত্তা
- ব্রিটিশ বিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব
এটি ভারতবর্ষের স্বাধীনতা সংগ্রামে এক অনন্য উদাহরণ।
৯. তমলুকের নারী সংগ্রামী: মাতঙ্গিনী হাজরা
তমলুক subdivision-এর অন্যতম শ্রেষ্ঠ সন্তান মাতঙ্গিনী হাজরা ছিলেন ৭৪ বছরের এক সাহসী স্বাধীনতা সংগ্রামী।
১৯৪২ সালে টাউন হলের দিকে স্বাধীনতা পতাকা নিয়ে মিছিল করার সময় ব্রিটিশ পুলিশ গুলি চালায়। গুলি লাগার পরও তিনি পতাকা উঁচু রেখেছিলেন।
তাঁর শেষ কথা ছিল—
“বন্দে মাতরম্!”
তমলুকের আন্দোলনকে তিনি অমরত্ব দিয়েছেন।
১০. ১৯৪৩ সালের ঘূর্ণিঝড় ও ‘জাতীয় সরকারের’ মানবিক ভূমিকা
১৯৪৩ সালে ভয়াবহ ঝড় ও বন্যা তমলুক অঞ্চলকে বিপর্যস্ত করে। ব্রিটিশ প্রশাসন তেমন সাহায্য না করলেও তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার নিজের উদ্যোগে:
- ত্রাণ শিবির খোলে
- খাদ্য ও ওষুধ বিতরণ করে
- গৃহহারা মানুষদের পুনর্বাসন করে
জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা আরও বেড়ে যায়।
১১. স্বাধীনতার পূর্বমুহূর্তে তমলুক (১৯৪৪–১৯৪৭)
ব্রিটিশ দমননীতির মুখে ১৯৪৪ সালে তাম্রলিপ্ত জাতীয় সরকার ভেঙে দেয়া হয়।
তবুও তমলুকের মানুষ জাতীয়তাবাদী চেতনায় অটল থাকে।
২৩ বছর পর—১৯৪৭ সালে—ভারত স্বাধীন হয়, এবং তমলুক নিজের সংগ্রামের ইতিহাসকে বুকে নিয়ে গণতন্ত্রের পথে পা বাড়ায়।
১২. ইতিহাসপ্রেমী ও পর্যটকদের জন্য তমলুক কেন বিশেষ
ইতিহাসপ্রেমীদের জন্য
- প্রাচীন সমুদ্রবন্দর—তাম্রলিপ্তির নিদর্শন
- বৌদ্ধ, হিন্দু, ইসলামি ও ঔপনিবেশিক স্তরের মিশ্রণ
- স্বাধীনতা আন্দোলনের কেন্দ্র
- ভারতবর্ষের বিরল সমান্তরাল সরকারের উদাহরণ
পর্যটকদের জন্য কী দেখবেন
- বর্গভীমা মন্দির (শক্তিপীঠ)
- তমলুক রাজবাড়ির ধ্বংসাবশেষ
- তমলুক মিউজিয়াম (টেরাকোটা, মুদ্রা, ভাস্কর্য, সামুদ্রিক নিদর্শন)
- মাতঙ্গিনী হাজরা স্মৃতিসৌধ
- রূপনারায়ণ নদীর তীর
- ঘোরাঘাটা ও গেঁয়োখালি—নদীর মিলনস্থল
- পুরনো চার্চ ও ঔপনিবেশিক ভবন
ভ্রমণের অভিজ্ঞতা
- ইতিহাসভরা জনপদ
- শান্ত নদীতীর
- ঐতিহ্যবাহী বাজার
- গ্রামীণ বাংলার পরিবেশ
- স্থানীয় মিষ্টি ও মাছের স্বাদ
উপসংহার: নদীর মতোই বহমান ইতিহাস—তমলুক
তমলুক শুধু একটি শহর নয়, এটি একটি সময়ের প্রবাহ—
- প্রাচীন বন্দর
- মধ্যযুগের ধর্মকেন্দ্র
- মুঘল–ব্রিটিশ প্রশাসনের অংশ
- স্বাধীনতা সংগ্রামের বিস্ময়কর গণআন্দোলন
এই শহর আজও তার শান্ত পরিবেশে ইতিহাসের প্রতিটি স্তরকে ধারণ করে আছে।
ইতিহাসপ্রেমী এবং নতুন জায়গা ঘুরতে ভালোবাসা পর্যটকদের জন্য তমলুক নিশ্চিতভাবে একটি অবশ্য-দর্শনীয়।



