
ভারতের আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আজ যে উচ্চতায় পৌঁছেছে, তার অন্যতম ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন এক মহান বিজ্ঞানী – ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা। তিনি শুধু একজন প্রতিভাবান পদার্থবিজ্ঞানীই নন, বরং ভারতের পারমাণবিক শক্তি কর্মসূচির জনক বলেও পরিচিত। তাঁর দূরদৃষ্টি, দেশপ্রেম ও গবেষণার প্রতি অগাধ নিষ্ঠাই ভারতের বিজ্ঞানচর্চাকে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে দিয়েছিল।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা জন্মগ্রহণ করেন ১৯০৯ সালের ৩০ অক্টোবর, মুম্বাইয়ের এক অভিজাত পারসি পরিবারে। তাঁর পিতা হোরমুসজি ভাবা ছিলেন এক সফল আইনজীবী। ছোটবেলা থেকেই ভাবার মধ্যে ছিল গণিত ও পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি প্রবল আগ্রহ।
তিনি মুম্বাইয়ের ক্যাথেড্রাল অ্যান্ড জন কনন স্কুল থেকে মাধ্যমিক পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য যান কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে। প্রথমে তিনি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়লেও, শীঘ্রই নিজের আগ্রহ অনুসারে পদার্থবিজ্ঞানে মনোনিবেশ করেন এবং তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানে অসাধারণ কৃতিত্ব অর্জন করেন। ১৯৩৪ সালে নিউক্লীয় পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও আন্তর্জাতিক খ্যাতি
কেমব্রিজে থাকাকালীন ভাবা কসমিক রে (Cosmic Ray) বা মহাজাগতিক রশ্মি ও ইলেকট্রন-পজিট্রন সংঘর্ষ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা করেন। এই গবেষণার ফলেই তিনি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হন। তাঁর এক গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার “Bhabha Scattering” – যা আজও আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানে একটি মৌলিক ধারণা হিসেবে পড়ানো হয়।
আরও পড়ুন – নিকোলা টেসলা: যাঁর আবিষ্কারগুলি ছাড়া আধুনিক সভ্যতা অকল্পনীয়
ভারতে প্রত্যাবর্তন ও বৈজ্ঞানিক প্রতিষ্ঠা
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে ভাবা ভারতে ফিরে আসেন এবং ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্স (IISc), বেঙ্গালুরু-তে স্যার সি.ভি. রমনের সঙ্গে গবেষণায় যুক্ত হন। পরবর্তীতে, টাটা ট্রাস্টের সহায়তায় তিনি ১৯৪৫ সালে টাটা ইনস্টিটিউট অফ ফান্ডামেন্টাল রিসার্চ (TIFR) প্রতিষ্ঠা করেন, যা আজও ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান।
ভারতের পারমাণবিক কর্মসূচির জনক
স্বাধীনতার পর প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহেরুর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন ভাবা। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, ভারতের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, বিশেষত পারমাণবিক শক্তি।
তাঁর উদ্যোগে ১৯৪৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় “Atomic Energy Commission of India”, যার প্রথম চেয়ারম্যান ছিলেন ভাবা নিজেই। পরবর্তীতে ১৯৫৪ সালে তিনি গড়ে তোলেন ভাবা অ্যাটমিক রিসার্চ সেন্টার (BARC) — যা আজও ভারতের পারমাণবিক গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু।
তিন-স্তরের পরমাণু কর্মসূচি: সীমিত ইউরেনিয়ামের মজুদ এবং প্রচুর থোরিয়াম মজুদের কথা মাথায় রেখে হোমি ভাবা ভারতের জন্য একটি সুদূরপ্রসারী তিন-স্তরের পরমাণু কর্মসূচি তৈরি করেন। এই কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল দেশের জ্বালানি চাহিদা মেটাতে থোরিয়ামকে কাজে লাগানো। এই অনন্য কৌশলই ভারতকে পরমাণু প্রযুক্তিতে স্বনির্ভর হতে সাহায্য করেছে।
শান্তিপূর্ণ ব্যবহার: তিনি বরাবরই পরমাণু শক্তিকে শান্তির কাজে, যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা ও কৃষি ক্ষেত্রে ব্যবহারের উপর জোর দিয়েছেন।
প্রথম পারমাণবিক চুল্লি: তাঁর নেতৃত্বে ১৯৫৬ সালে ভারতের প্রথম পারমাণবিক চুল্লি ‘অপ্সরা’ স্থাপিত হয়।
ভাবা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে, পারমাণবিক শক্তি শুধু অস্ত্র নয়, বরং শান্তিপূর্ণ কাজে ব্যবহার করে দেশের জ্বালানি, চিকিৎসা ও কৃষিক্ষেত্রে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। তাঁর এই চিন্তাধারাই আজকের ভারতের পারমাণবিক শক্তি নীতির ভিত্তি।
আরও পড়ুন – এ পি জে আব্দুল কালাম: মহান ভারতীয় বিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রপতি
ভাবার দূরদৃষ্টি ও উত্তরাধিকার
ভাবা শুধু পারমাণবিক বিজ্ঞানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; তিনি ভারতীয় মহাকাশ গবেষণারও ভিত্তি রচনা করেছিলেন। তাঁরই অনুপ্রেরণায় পরবর্তীতে ডঃ বিক্রম সারাভাই ভারতীয় মহাকাশ গবেষণা সংস্থা (ISRO) প্রতিষ্ঠা করেন।
ভাবা ভারতের তরুণ প্রজন্মকে বিজ্ঞানমনস্ক করে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর মতে, “বিজ্ঞান কেবল পেশা নয়, এটি একটি জাতির উন্নতির চালিকাশক্তি।”
মৃত্যু ও স্মরণ
দুঃখজনকভাবে ১৯৬৬ সালের ২৪ জানুয়ারি এক বিমান দুর্ঘটনায় ড. হোমি ভাবার মৃত্যু হয়। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান, গবেষণার ক্ষেত্র এবং দৃষ্টিভঙ্গি আজও ভারতের বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির মূল স্তম্ভ।
ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবার মৃত্যু নিয়ে দানা বেঁধেছিল নানা বিতর্ক। অনেকে মনে করেন, নিছক বিমান দুর্ঘটনা নয়, তাঁর মৃত্যুর নেপথ্যে ছিল পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র। তৎকালীন বিশ্ব রাজনীতির সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে তিনি ভারতকে সমৃদ্ধ করতে চেয়েছিলেন। তাঁর এই প্রয়াস নাকি তৎকালীন ক্ষমতাবান রাষ্ট্রগুলির চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সেই কারণেই তাঁকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করেন অনেকে।
ভাবার স্থায়ী অবদান আধুনিক ভারতে
- TIFR – দেশের মৌলিক গবেষণার কেন্দ্র।
- BARC – ভারতের পারমাণবিক প্রযুক্তি ও গবেষণার কেন্দ্র।
- Atomic Energy Commission – শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক কর্মসূচির রূপরেখা।
- Space and Nuclear Vision – ভারতকে আত্মনির্ভর বিজ্ঞানসমৃদ্ধ রাষ্ট্রে রূপান্তরের ভিত্তি।
উপসংহার
ড. হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা শুধু একজন বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন ভারতের ভবিষ্যৎ নির্মাতা। তাঁর চিন্তা, কর্ম ও প্রতিষ্ঠান আজও ভারতের প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। আধুনিক ভারতের বিজ্ঞান, শক্তি ও মহাকাশ গবেষণার প্রতিটি অধ্যায়ে ভাবার অবদান অম্লান হয়ে আছে।



