গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডু: ভারতের এডিসন, যুব অনুপ্রেরণার আলোকবর্তিকা

গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডু বা জি ডি নাইডু যাঁকে ‘ভারতের এডিসন’ বলা হয়, সীমিত সংস্থানের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা খুঁজে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডু
চিত্র সৌজন্য

ভারতের ইতিহাসে এমন অনেক মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁরা সীমিত সংস্থানের মধ্যে অসীম সম্ভাবনা খুঁজে বের করে দেশকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডু, যাঁকে ‘ভারতের এডিসন’ বা ‘কয়ম্বাতুরের সম্পদসৃষ্টিকারী’ বলা হয়, তাঁর জীবনী যুবক ছাত্রদের জন্য এক অপরিসীম অনুপ্রেরণা। প্রাথমিক শিক্ষাই শেষ করে তিনি কীভাবে আবিষ্কারের জগতে রাজত্ব করলেন, তা জেনে তোমরা নিশ্চয়ই উদ্বুদ্ধ হবে।

প্রাথমিক জীবন এবং শুরুর সংগ্রাম

১৮৯৩ সালের ২৩শে মার্চ তামিলনাড়ুর কয়ম্বাতুর জেলার পোল্লাচি অঞ্চলে এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডু। ছোটবেলা থেকেই যন্ত্রপাতির প্রতি তাঁর অদ্ভুত আকর্ষণ ছিল। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দেন এবং মেকানিকের কাজ শুরু করেন। একটি মোটরসাইকেল মেরামত করার সময় তাঁর যান্ত্রিক প্রতিভা প্রকাশ পায়, যা তাঁর জীবনের টার্নিং পয়েন্ট হয়ে ওঠে।

কয়ম্বাতুরের রাস্তায় বাস চালানোর কাজ থেকে শুরু করে তিনি ১৯২০ সালে পোল্লাচি থেকে পালানি অঞ্চলে প্রথম বাস পরিচালনা করেন। প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে না পড়ে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইউনাইটেড মোটর সার্ভিসেস (ইউএমএস) প্রতিষ্ঠা করেন, যা শীঘ্রই ৭০টি বাসের এক বিশাল ফ্লিটে পরিণত হয়। এই উদ্যোগ তাঁকে ধনী করে তোলে এবং আবিষ্কারের পথ প্রশস্ত করে। যুবকদের জন্য এই শিক্ষা: স্বপ্ন দেখো, কিন্তু কাজ করো অথচ অধ্যবসায়ের সঙ্গে।

শিক্ষণীয়: তাঁর জীবনের এই পর্ব দেখায় যে, শিক্ষার ডিগ্রি ছাড়াই বুদ্ধি এবং পরিশ্রম কীভাবে সাফল্য এনে দেয়। আজকের যুবকরা, যারা চাকরির স্বপ্ন দেখে, তাঁদের থেকে শিখুন—নিজের ব্যবসা শুরু করার সাহস রাখুন।

আরও পড়ুন – ডঃ হোমি জেহাঙ্গীর ভাবা, আধুনিক ভারতের বিজ্ঞানযুগের নির্মাতা

আবিষ্কারের জগতে বিপ্লব: ভারতের এডিসন

জি.ডি. নাইডুকে ‘ভারতের এডিসন’ বলার কারণ তাঁর অসংখ্য আবিষ্কার। ১৯৩৭ সালে তিনি ভারতে প্রথম ইলেকট্রিক মোটর তৈরি করেন, যা শিল্প বিপ্লবের সূচনা করে। তাঁর উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে ফিল্ম ক্যামেরার ডিসট্যান্স অ্যাডজাস্টার, ছেড়ে যাওয়া ভোটিং মেশিন, ফলের রস নিষ্কাশনকারী যন্ত্র এবং সস্তা পাঁচ-ভালভ রেডিও সেট। একটি খেলনা গাড়ির মোটর থেকে তিনি ইলেকট্রিক রেজার তৈরি করেন—এটাই তাঁর প্রতিভার চরম উদাহরণ।

১৯৫২ সালে মাত্র ২০০০ টাকায় দুই-আসনের পেট্রোল ইঞ্জিনের গাড়ি তৈরি করেন তিনি, কিন্তু সরকারের লাইসেন্স না পাওয়ায় উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। তাঁর উদ্ভাবন শুধু যন্ত্রপাতিতে সীমাবদ্ধ ছিল না; তিনি তুলা, ভুট্টা এবং পেঁপের নতুন জাত গড়ে তোলেন। স্যার সি.ভি. রামান এবং বিশ্বেশ্বরাইয়া তাঁর খামার পরিদর্শন করেন। একবার ৬টা সকাল থেকে ৫টা সন্ধ্যা পর্যন্ত মাত্র ১১ ঘণ্টায় একটি বাড়ি তৈরি করেন তিনি—এটি তাঁর দক্ষতার প্রমাণ।

শিক্ষণীয়: যুব ছাত্রবৃন্দ, এই গল্প তোমাদের বলে যে, সমস্যাকে সুযোগে রূপান্তরিত করো। আজকের টেকনোলজি যুগে তুমি কী উদ্ভাবন করতে পারো? নাইডুর মতো চিন্তা করো, এবং ভারতকে বিশ্বগুরু বানাও।

শিক্ষা ও সমাজসেবায় অবদান

শিক্ষার প্রতি নাইডুর ভালোবাসা ছিল অপার। ১৯৪৫ সালে তিনি স্যার আর্থার হোপ টেকনোলজি কলেজ এবং পলিটেকনিক প্রতিষ্ঠা করেন, যা পরে গভর্নমেন্ট কলেজ অফ টেকনোলজি (জিসিটি) হয়ে ওঠে। চার বছরের কোর্সকে অব্যবহারিক মনে করে তিনি দুই বছরের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণের প্রস্তাব দেন, কিন্তু ব্রিটিশ সরকার প্রত্যাখ্যান করলে প্রিন্সিপাল পদ থেকে পদত্যাগ করেন।

১৯৪৬ সালে ইন্ডাস্ট্রিয়াল লেবার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন (আইএলডব্লিউএ) প্রতিষ্ঠা করে তিনি ব্যবহারিক শিক্ষার উপর জোর দেন, যা আজ জি.ডি. নাইডু চ্যারিটিজ নামে পরিচিত। ১৯৪৪ সালে ব্যবসা থেকে অবসর নেওয়ার পর তিনি স্কলারশিপ, কর্মচারী কল্যাণ এবং দরিদ্রদের জন্য কাজ করেন। কয়ম্বাতুরে সিরুবানি জল আনার জরিপে তাঁর অবদান অসাধারণ। জি.ডি. নাইডু ইন্ডাস্ট্রিয়াল এক্সিবিশন ১৯৬৭ সালে শুরু হয়।

শিক্ষণীয়: এই অবদান যুবকদের অনুপ্রাণিত করে যে, ধন অর্জনের পর তা সমাজের জন্য ব্যয় করো। আজকের ছাত্ররা, তোমাদের শিক্ষা শুধু চাকরির জন্য নয়, দেশের উন্নয়নের জন্য।

আরও পড়ুন – দীঘার ইতিহাস: অজানা ‘বীরকুল’ থেকে প্রাচ্যের ‘ব্রাইটন’ হয়ে ওঠার গল্প

আন্তর্জাতিক যাত্রা এবং ব্যক্তিগত জীবন

জার্মানিতে গিয়ে তিনি প্রযুক্তি শিখে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা গড়ে তোলেন। ছবি তোলার শখ ছিল তাঁর; মহাত্মা গান্ধী, জওহরলাল নেহরু এবং সুভাষচন্দ্র বসুর সঙ্গে তাঁর ছবি ঐতিহাসিক। ১৯৭৪ সালের ৪ জানুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর উত্তরাধিকারীদের মাধ্যমে জি.ডি. ম্যাট্রিকুলেশন স্কুল চলছে।

শিক্ষণীয়: তাঁর জীবন ছিল সংগ্রাম, উদ্ভাবন এবং দানের মিশ্রণ। যুবকরা, এই গল্প পড়ে নিজের জীবনের লক্ষ্য নির্ধারণ করো।

যুবক ছাত্রদের জন্য অনুপ্রেরণা: কী শিক্ষা?

গোপালস্বামী দোরাইস্বামী নাইডুর জীবন থেকে যুবকরা নিম্নলিখিত শিক্ষা নেবে:

  • অধ্যবসায়ের শক্তি: প্রাথমিক শিক্ষা সত্ত্বেও তিনি বিশ্বখ্যাত হলেন।
  • উদ্ভাবনের মন্ত্র: সাধারণ জিনিস থেকে অসাধারণ তৈরি করো।
  • সমাজসেবা: সাফল্যের পর দেশের জন্য ফিরিয়ে দাও।
  • ব্যবহারিক শিক্ষা: থিওরির চেয়ে হ্যান্ডস-অন শেখো।
  • স্বপ্ন বড় রাখো: ভারতকে প্রযুক্তির কেন্দ্র বানাও।

শিক্ষণীয়: আজকের যুবকরা, নাইডুর মতো হও। স্টার্টআপ শুরু করো, আবিষ্কার করো, এবং ভারতকে গর্বিত করো। তাঁর জীবনী তোমাদের পথ দেখাবে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top